জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন খলিল

প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন জাতিসংঘকে মানুষের আস্থায় ফেরাতে চান খলিল

আজাদী ডেস্ক | বুধবার , ৩ জুন, ২০২৬ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ভোটে তিনি হারিয়েছেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূতকে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই ভোটগ্রহণ হয়। নির্বাচনে খলিলুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস।

১৯৩ দেশের প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে দুই প্রার্থীকে ভোট দেন। এই দুই প্রার্থীর বাইরে নতুন কাউকেও কাগজে লিখে ভোট দেওয়ার সুযোগ সেখানে ছিল। নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ১৯০টি। খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯ ভোট এবং সাইপ্রাসের কাকোরিস ৯১ ভোট পেয়েছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল নির্বাচনের ফল সামনে আসার পর ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজের অভিব্যক্তি জানান। তারেক রহমান লেখেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। এ অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি গর্বের সঙ্গে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা গড়ে তুলবেন। আমরা তার এই নতুন দায়িত্বের সাফল্য কামনা করি।

এদিকে নির্বাচিত হয়ে খলিলুর রহমান বলেছেন, তিনি জাতিসংঘকে মানুষের আস্থায় ফেরাতে চান। আর প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচিত হওয়ার পর এখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন কি না। তবে এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। খবর বিডিনিউজের।

নির্বাচিত হয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো বসতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি। ৪০ বছর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশি রাজনীতিক হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।

আঞ্চলিকভাবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে এবার এশিয়াপ্যাসিফিক অঞ্চল থেকে পরবর্তী সেশনের সভাপতি পেয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ নির্বাচনের জন্য তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। একই পদে ফিলিস্তিনের প্রার্থী থাকার কারণে বাংলাদেশ প্রার্থিতা স্থগিত রাখলেও প্রত্যাহার করেনি। এরপর ফিলিস্তিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশের প্রার্থিতা পুনরুজ্জীবিত হয়।

এর মধ্যে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বদলে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলকে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পদের পাশাপাশি বেশির ভাগ সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করেছেন তিনি।

চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। এরপর নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে খলিলুর রহমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া চমক তৈরি করে। নিজের কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন খলিলুর রহমান। জাতিসংঘে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মুখপাত্রের দায়িত্ব পালনের পর সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহযোগীর পদেও ছিলেন তিনি।

১৯৯১ সালে জেনিভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন খলিলুর রহমান। পরের ২৫ বছর নিউ ইয়র্ক ও জেনিভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি; ছিলেন জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রকাশনার প্রধান লেখক।

জাতিসংঘকে মানুষের আস্থায় ফেরাতে চান : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মর্যাদাপূর্ণ পদে জয়ের প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, বৈশ্বিক সংস্থাটির ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। গতকাল ওই নির্বাচনে বিজয়ের পর জাতিসংঘ সদরদপ্তরে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমি আপনাদের সবার সভাপতি হব। আমার কার্যক্রমে সব সদস্যের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হব।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের উপর আস্থা ফেরানোর জন্য ছয়টি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কাজ এগিয়ে নিতে চাই। এমন একটা সময়ে জাতিসংঘ তার নবম দশকে প্রবেশ করছে, যখন আমাদের সংস্থার প্রতি আস্থা বিভিন্ন দিক থেকে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সংঘাত আর যুদ্ধের অভিঘাত, যার হাত থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষাই ছিল আমাদের সংস্থার লক্ষ্য। কিন্তু এখনো যুদ্ধ ও সংঘাত অসংখ্য মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে ফেলছে। উন্নয়নের অর্জনগুলো ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত রয়ে যাচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও আমরা বিশ্বব্যাপী কিছু কিছু ক্ষেত্রে অধিকারের প্রশ্নে পিছু হটা এবং সংকুচিত হওয়া দেখতে পাচ্ছি।

খলিলুর রহমান বলেন, এমন এক সময়ে এসব ঘটছে, যখন বহুপাক্ষিকতা নানাবিধ চাপের মুখে রয়েছে। এবং আর্থিক চাপের মুখে পড়ায় আমাদের সংস্থাটি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে একাগ্র থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, আমার ব্যক্তিগত মতামত দিয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাজকে বাধাগ্রস্ত হতে দেব না। মতপার্থক্যকে অবজ্ঞা না করে সবার জন্য অভিন্ন ভিত্তি খুঁজব। ভৌগোলিক, লিঙ্গ এবং ভাষাগত ভারসাম্য রক্ষা করে আমি আমার দপ্তরকে গুছাব।

জাতিসংঘে যেসব দেশের প্রতিনিধিদল ছোট, তাদের জন্য একটি দল তৈরি করাকে নিজের অগ্রাধিকারে রাখার কথাও বলেন খলিল। তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদকে আমি কেবল একটা উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করি না, বরং এটা একটা প্রক্রিয়া। আস্থা তৈরিতে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, অব্যর্থভাবে জাতিসংঘ সনদকে সমুন্নত রাখব আমি এবং সভাপতির আচরণবিধি সম্পূর্ণ মেনে সভাপতির কাজ পরিচালনা করব। এক্ষেত্রে আমাকে জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি আমি।

খলিল কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন : জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি করার পাশাপাশি নিজ দেশের সরকারি দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার নজির যেমন রয়েছে, তেমনি সভাপতি পদে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালনের উদাহরণও আছে। তবে এই পদ পেলে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে দিয়ে রেখেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

ভোটের প্রচারের মধ্যে ১৩ মে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে আমি সবার সভাপতি এবং পূর্ণকালীন সভাপতি হব। আমি জাতিসংঘের সনদ সমুন্নত রাখব। আমি সব সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করব এবং বিশেষ করে ছোট প্রতিনিধিদলগুলোর প্রতি মনোযোগ দেব। আমি সভাপতির আচরণবিধি সম্পূর্ণরূপে মেনে সভাপতিত্ব করব। আমি আমার ব্যক্তিগত মতামতকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেব না এবং মতপার্থক্য উপেক্ষা না করে ঐক্যের পথ খুঁজব।

তবে পূর্ণকালীন সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে এক বছরের জন্য ছুটি নেওয়ার বিষয়েও ধারণা দেন খলিলুর রহমান। ওই মতবিনিময়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি কি পদত্যাগ করব? না। আমার প্রধানমন্ত্রী (তারেক রহমান) আমাকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, তিনি আমাকে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য এক বছর সময় দেবেন। পদত্যাগ একমাত্র বিকল্প নয়। আমি ছুটিও নিতে পারি।

জাতিসংঘের প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থা ফেরানোকে কেন্দ্রে রেখে ছয়টি স্তম্ভের উপর বৈশ্বিক সংস্থাটির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে তিনি বলেন, আমি প্রথম দিন থেকেই আপনাদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম, ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত। আমি আপনাদের আস্থা ও সমর্থন কামনা করছি।

নির্বাচিত হলে খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, সেই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই নেবেন। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে সোমবার তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন। এখানে কোনো নিয়ম নাই যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএনসিটিতে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড
পরবর্তী নিবন্ধ৫০ কোটি টাকার ভবন, উদ্বোধনের আগে অনেক স্থানে ফাটল