আয় বৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে রেলওয়ে

এক বছরে বেড়েছে ১২ শতাংশ বড় ভূমিকা যাত্রী পরিবহন খাতের, মালামাল পরিবহন খাতে অগ্রগতি প্রত্যাশিত নয়

হাসান আকবর | সোমবার , ২০ জুলাই, ২০২৬ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

নানা সীমাবদ্ধতা ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আয় বৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিদায়ী অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২২১ কোটি টাকা বেশি। একই সঙ্গে রেলওয়ের আয়ব্যয়ের ব্যবধানও কমেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রী পরিবহন থেকে উল্লেখযোগ্য আয় বৃদ্ধি, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং অপটিক্যাল ফাইবার লিজ বাবদ আয় বৃদ্ধির কারণে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আয় ছিল ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। সেই তুলনায় ২০২৫২৬ অর্থবছরে আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।

আয় বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যাত্রী পরিবহন খাত। এই খাতে আগের অর্থবছরের তুলনায় অতিরিক্ত ২৫৬ কোটি টাকা আয় হয়েছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ, ট্রেন পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি, টিকিট বিক্রিতে ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। তবে মালামাল পরিবহন খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। পর্যাপ্ত ইঞ্জিনের অভাবে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা সীমিত থাকায় এই খাতে আয় কমেছে ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলেন, নতুন ইঞ্জিন সংযোজন এবং মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো গেলে এই খাত থেকেও উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আয় অর্জন সম্ভব হতো।

এছাড়া রেলওয়ের ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনা থেকে আয় বেড়েছে ৩ কোটি টাকা। অপটিক্যাল ফাইবার লিজ থেকে আয় বেড়েছে আরো ১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তবে পরিবহন ও বাণিজ্যিক খাত, বিশেষ করে ভেন্ডিং লাইসেন্স ও অন্যান্য বিবিধ উৎস থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। বেতনভাতা, পেনশন, রেলপথ ও রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণসহ মোট পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের অনুপাত বা অপারেটিং রেশিও দাঁড়িয়েছে ১.৯১। আগের অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল ২.০৯। অর্থাৎ প্রতি এক টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে মন্তব্য করে রেলওয়ে বলেছে, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতির ফলে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।

তবে রেলওয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, অপারেটিং রেশিও নির্ধারণে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বার্ষিক পেনশন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রকৃত পরিচালন দক্ষতার চিত্র আড়াল হয়ে যায়। তাদের যুক্তি, পেনশন ব্যয়কে পরিচালন ব্যয়ের অংশ হিসেবে না ধরলে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে আয়ব্যয়ের অনুপাত হয় ১.৪৩। অর্থাৎ পেনশন ব্যয় বাদ দিলে রেলওয়ের পরিচালন ব্যয় আয়ের তুলনায় মাত্র ৪৩ শতাংশ বেশি থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন সংস্থা হওয়ায় সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকিনির্ভর ও রেয়াতি ভাড়ায় সেবা দিয়ে আসছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে যাত্রী ভাড়া সমন্বয় করা হলেও গত এক দশকে আর কোনো ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। একই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য, কর্মচারীদের বেতনভাতা, পেনশন, রেললাইন ও রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়, বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিকভাবে রেলভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান আরো কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে ভাড়া বাড়ালে সাধারণ মানুষের উপর চাপ আসার কথাও স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবসার থেকে সেবার দিকে রেলওয়ের মনোভাব বেশি। নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ, মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক সম্পদের আরো কার্যকর ব্যবহার এবং অপ্রচলিত আয় উৎস সম্প্রসারণের মাধ্যমে রেলওয়ের আর্থিক সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন হিসেবে স্বল্প ভাড়ায় জনসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবদানের বিষয়টি রেলওয়ে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়।

রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান রেলের আয় বৃদ্ধিসহ প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলো নিশ্চিত করেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখাগড়াছড়িতে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা