
‘এটি শুধু একটি সেলফ–হেল্প গাইড নয়, বরং সাফল্যের অন্তর্নিহিত মানসিক কাঠামোর একটি গভীর বিশ্লেষণ। তাই এ বই আপনাকে আপনার পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচন করার জন্য একটি বাস্তবসম্মত এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ পথনির্দেশনা দেয় এবং একটি ইতিবাচক ও উৎপাদনশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখার অনুপ্রেরণা দেয়’….. (পৃ: ২৪০, উপসংহার)
এই কথাগুলো লেখা হয়েছে আলোচিত বই ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট’ –এর উপসংহারে। সমসাময়িক কালে যারা নিজের কর্মজীবন, চাকরি কিংবা পেশাগত উন্নতির জন্য উপায় কিংবা পরামর্শ খুঁজছেন, তাদের জন্য এই বইটি দিকনির্দেশনা হিসেবে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তাই এই বইটির আলোচনার শুরুতেই উপসংহারে বর্ণিত কথাগুলো উল্লেখ করা হলো যাতে বইটির সম্পর্কে পাঠক ধারণা পান।
আসিফ ইকবাল। একজন গীতিকবি। একজন কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। সুদীর্ঘ কর্মজীবন তার। বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও বহুমুখী প্রতিভায় ঋদ্ধ আসিফ। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, তার দর্শন। এটি হলো: ‘Give Before You Take… আগে দাও, পরে নাও।’
২৪০ পৃষ্ঠার এই বইয়ে আছে ১৬টি অধ্যায়। এগুলো হচ্ছে: মানসিকতাই আপনার পরিচয়, যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বোধের মূল্য দিতে শিখুন, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা চর্চা করুন, উন্নতির আকাঙ্ক্ষা তীব্র করুন, নিজের প্রতিষ্ঠানকে বুঝুন, ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগান, ভবিষ্যতকে হাতের মুঠোয় নিন, কৌশলে প্রভাব খাটান, নিজেকেসহ সবাইকে শাণিত করুন, নিজেকে এবং অন্যকে দায়বদ্ধ করুন, সকলকে ক্ষমতায়িত করুন, হয়ে উঠুন পরিবর্তনের কারিগর, টিমের নেতৃত্ব দিন, টিমের প্রতি দায়বদ্ধ থাকুন, উপসংহার।
আমাদের কর্মজীবন কতোই না বিচিত্র। জীবনের শুরুতে ভাবনায় থাকে একরকম। সময়ের স্রোতে হয়ে যায় আরেকরকম। কারণ, ছোট্টবেলার স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকে না। এর কারণ কী হতে পারে? সুনির্দিষ্ট ভাবে কোন উত্তর নেই। তবে স্বপ্ন পূরণের জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন বিখ্যাতজনেরা। এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আবদুল কালাম–এর উক্তি। তিনি বলেছিলেন: ‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে; স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ তাঁর এই কথার সূত্র ধরেই গ্রন্থকার লিখেছেন: ‘তাই গোলস বা লক্ষ্য আপনাকে সারাক্ষণ ভেতর থেকে তাড়িয়ে বেড়াবে। জীবন নিয়ে আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়াটাকে একেবারে সহজ থেকে সহজতর করে দেবে। এটি হবে আপনার নিজস্ব ড্রাইভিং ফোর্স। এই গোলস আপনাকে যদি ড্রাইভ না করে, গোলসের জন্য যদি আপনি তৃষ্ণার্ত না থাকেন, তাহলে আপনি জীবনে কোথাও পৌঁছাতে পারবেন না।’ (পৃ:৪৭) এবং তারই সূত্র ধরে লক্ষ্য ঠিক করে আমাদের এগিয়ে চলা। এই অধ্যায়ে একটি চমৎকার ইনফোগ্রাফিকে দেখানো হয়েছে: আপনার লক্ষ্যগুলোকে আপনি তিন ভাগে ভাগ করতে পারেন –
এক. লং–টার্ম দুই. মিড–টার্ম তিন. শর্ট–টার্ম (পৃ:৪৯)। আশাকরি পাঠক অনুধাবন করতে পারবেন, আমাদের স্বপ্ন–লক্ষ্য পূরণের ধাপগুলি সম্পর্কে। গ্রন্থকার কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়কে আঁকার চেষ্টা করেছেন। এটি তার কর্ম অভিজ্ঞতার আলোকেই করেছেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় এই বিষয়টি।
‘ক্যারিয়ার গোলস: ক্যারিয়ারে একটা জিনিস সত্য। If you are not advancing in your career, যদি আপনার প্রমোশন না হয় কিংবা আপনি দেখছেন যে সামনে এগোচ্ছেন না, তাহলে আপনাকে ধরে নিতে হবে there is something wrong, you have to rework on your capabilities and you have to rework on your goals.’( পৃ:৫৪)। আমরা তো সকলেই চাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করি। কিন্তু হচ্ছে না। বা ঠিকমতো হয়ে উঠছে না। গ্রন্থকার আসিফ ইকবাল এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়টি লিখেছেন : উন্নতির আকাঙ্ক্ষা তীব্র করুন। আসলেই তাই। উন্নতির আকাঙ্ক্ষাটি আসবে মনের গভীর থেকে। ১১৩নং পৃষ্ঠায় ইনফোগ্রাফিকে দেখানো হয়েছে উন্নতির তীব্র আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধির উপায়গুলো : ‘চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করুন, সমালোচনা থেকে শিখুন, সারাক্ষণই অনুসন্ধিৎসু থাকুন, নতুন আগ্রহ অন্বেষণ করুন, প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখুন, উন্নত মানুষদের সাথে মিশুন, মেন্টরের সাথে পরামর্শ করুন, ছোট ছোট অর্জন উদযাপন করে আত্ম – মূল্যায়ন করুন, হাল না ছাড়া জেদে এগিয়ে যান।’
দেখুন পাঠক, আমাদের মনের ভাবনার সাথে মিলিয়ে দেখুন, ঠিক এমনটিই চাইছি কিনা। আপনি যদি উন্নতির শিখরে উঠতে চান, অবশ্যই এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে আরও উপায় বের হবে। তবে গ্রন্থকার সার্বিক বিবেচনায় এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছেন।
‘নিজেকেসহ সবাইকে শাণিত করুন’ দশম অধ্যায়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবসময়ই নিজেকে শাণিত করার করার কিংবা দক্ষতা অর্জনে এগিয়ে যাওয়া। এটাও কিন্তু নিজেকেসহ অন্যকে উন্নত করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দক্ষতা। এই অধ্যায়ে ইনফোগ্রাফিকে দেখানো হয়েছে সাতটি আত্মোন্নয়নের পরামর্শ। এগুলো হচ্ছে: সঠিক অভ্যাস গড়ে তুলুন, ব্যর্থতাকে গ্রহণ করতে শিখুন, পরিপূর্ণতার চেয়ে ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিন, কৌতুহলী থাকুন, নিজের যত্ন নিন, পরিষ্কার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, বিকাশমান মানসিকতাকে গড়ে তুলুন। সময়ের বিবেচনায় এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিজ লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এই অধ্যায়ে বেশ কয়েকজন মনীষীর জীবনী উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লক্ষ্য পূরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো – ‘টিমের নেতৃত্ব দিন।’ এই বিষয়ে গ্রন্থকার লিখেছেন: ‘দলীয় নেতৃত্ব একটি অপরিহার্য মানসিক দক্ষতা। দলীয় নেতৃত্ব একটি দলকে কমন গোলস বা লক্ষ্য অর্জনের পথে পরিচালিত করার পাশাপাশি পুরো দলের মধ্যে বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং উৎসাহ তৈরি করার ক্ষেত্র তৈরি করে। ইফিয়ানি ওনুহা নাইজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলের একজন thought leader, human capacity developer, লেখক এবং transformational leader, যিনি যুবসমাজ, মানবতা, তথা সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য কাজ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘The leadership is the secret that makes common people achieve uncommon results. (দলীয় নেতৃত্বই হলো সেই গোপন রহস্য, যা সাধারণ মানুষকে অসাধারণ ফল অর্জন করতে সহায়তা করে ’(পৃ:২১৯)। এই অধ্যায়ে বেশ কয়েকটি ইনফোগ্রাফিকে সহজতর করে দেখানো বিভিন্ন পর্যায়। জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে হবে। তবেই সাফল্যের চাবিকাঠি আপনার হাতে আসবে। সেটা হতে পরিবারে, এলাকায়, সংগঠনে, বিপদ–আপদ মোকাবিলায়, চাকরিতে কিংবা স্ব স্ব কর্ম প্রতিষ্ঠানে। এই বিষয়ে গ্রন্থকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট জন কুইন্স এডামসের উক্তি উল্লেখ করেন। মি. এডামস বলেছিলেন: ‘আপনার কাজ যদি অন্যদের আরও স্বপ্ন দেখতে, আরও শিখতে, আরও কাজ করতে এবং আরও উন্নত হতে অনুপ্রাণিত করে, তবে আপনি একজন নেতা।’ মি. এডামসের এই উক্তির আলোকে গ্রন্থাকার লিখেছেন: ‘তাঁর এই উক্তিটি টিম লিডারশিপের এসেন্সকে ধারণ করে, অন্যদের তাদের ফুল পটেনশিয়াল বা পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনের জন্য ইন্সপায়ার করে।’(পৃ:২২৩)
একটি গান :
যদি লক্ষ্য থাকে অটুট
বিশ্বাস হৃদয়ে
হবেই হবেই দেখা
দেখা হবে বিজয়ে।
এই গানটির রচয়িতা আসিফ ইকবাল। তুমুল জনপ্রিয় এই গানটি আজও মাতিয়ে রেখেছে তারুণ্যকে। এবার আরেকটি দায়িত্ব পালন করতে উদ্যোগী হয়েছেন আসিফ। পেশাগত জীবনের নানান দক্ষতা অর্জনের জন্য অনুপ্রেরণা দিতে সহায়তা করতে ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট – সাফল্যের খোলা কৌশল’ বইটি লিখেছেন। এমন সব বিষয় নিয়ে লিখেছেন, যা পড়ে একজন মানুষ নিজেকে গড়ে নেয়ার জন্য অনুপ্রাণিত হবেন। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ছাড়াও সকলের জন্য বইটি সংগ্রহে রাখলে নিজেরই উপকার হবে। চট করে মিলিয়ে নিতে পারবেন নিজেকে, কোথায় ঘাটতি, কোথায় বিফল, উত্তরণের উপায় কীভাবে চিহ্নিত করবেন – একটি পরামর্শক বই হিসেবে ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট’ পাঠ্য হয়ে উঠুক – এই প্রত্যাশা করি।
[ যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, আসিফ ইকবাল। প্রচ্ছদ : আনিসুজ্জামান সোহেল। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ, ঢাকা। মূল্য : ৬০০ টাকা]
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী।











