হযরত লোকমান (আঃ) নবী ছিলেন কিনা এ ব্যাপারে সালাফগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে, তিনি নবী ছিলেন না বরং তিনি একজন পরহেজগার ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন। হযরত সুফিয়ান শাউরী (রহঃ) আশ’আস (রহঃ) থেকে, তিনি হযরত ইকরামা (রহঃ) থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি একজন ইথিওপীয় ক্রীতদাস ও ছুতার ছিলেন। তাঁকে জ্ঞান দান করা হয়েছিল কিন্তু নবুয়্যাত দেওয়া হয়নি। হযরত লোকমান সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রহঃ) কর্তৃক হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তিনি ছিলেন বেঁটে ও চ্যাপ্টা নাক বিশিষ্ট একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। হযরত ইয়াহিয়া ইবনে সাইয়্যেদ আল আনসারী (রহঃ), হযরত সাইয়্যেদ ইবনুল মুসায়েব (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত লোকমান ছিলেন দক্ষিণ মিশরের কৃষ্ণ বর্ণের লোকদের অন্তর্ভূক্ত। তার ঠোঁট দুটি ছিল পুরো। আল্লাহতায়ালা তাঁকে অগাধ জ্ঞান দান করেছিলেন কিন্তু তাঁকে নবী মনোনিত করেননি (তাবারী ২০/১৩৫)। তাঁর পুরো নাম ছিল লোকমান ইবনে আনকা ইবনে সা’দুন। তাঁর ছেলের নাম ছিল সা’রান। স্বীয় পুত্রের প্রতি তাঁর নসিহাগুলো আল্লাহতায়ালার এমন পছন্দ হয়েছিল যে, আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কালামে পাকে একটি সূরাই অবতীর্ণ করেছেন। হযরত সাইয়্যেদ ইবনে মুসায়িব (রহঃ) এক কৃষ্ণ বর্ণের হাবশী ক্রীতদাসকে বলেন, তোমার দেহের রং কালো বলে তুমি নিজেকে ঘৃণ্য মনে কর না। তিনজন লোক, যারা সমস্ত লোক অপেক্ষা উত্তম ছিলেন, তারা সবাই কালো বর্ণের ছিলেন। তাঁরা হলেন, হযরত বিলাল (রাঃ), হযরত মাহজা (রাঃ)- যিনি ছিলেন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর গোলাম, হযরত লোকমান হাকিম যিনি ছিলেন মোটা ঠোঁট বিশিষ্ট এক ইথিওপীয় সাধারণ অধিবাসী। একদা তাঁর মনিব তাঁকে বলেন, তুমি একটি বকরী জবেহ কর এবং ওর গোশতের উৎকৃষ্ট দু’টি টুকরো আমার কাছে নিয়ে আস। তিনি হৃদপিন্ড ও জিহ্বা নিয়ে গেলেন। কিছুদিন পর তাঁর মনিব তাঁকে একই আদেশ করলেন এবং বকরীর গোশতের নিকৃষ্ট দু’টি খন্ড আনতে বললেন। তিনি তখনও উক্ত দু’টি জিনিসই নিয়ে গেলেন। তাঁর মনিব তখন বললেন, ব্যাপার কি? এটা কি ধরনের কাজ হল? আমি যখন দু’টি উৎকৃষ্ট টুকরা আমার কাছে নিয়ে আসতে বললাম তখন যা নিয়ে এলে, আবার দু’টি নিকৃষ্ট টুকরা নিয়ে আসতে বললে ঐ একই জিনিস নিয়ে এলে। উত্তরে তিনি বললেন, এ দু’টি যখন ভালো থাকে তখন দেহের কোন অঙ্গই এ দু’টির চেয়ে ভালো নয়। আবার এ দু’টি জিনিস যখন খারাপ হয়ে যায় তখন সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস এ দু’টি হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনের ৩১ তম সূরা লোকমান– যেটি মক্কায় অবতীর্ণ, এই সূরাতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই লোকমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’। এখানে হিকমত দ্বারা বোধশক্তি, জ্ঞান ও শিক্ষাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমার সমসাময়িক লোকদের মধ্যে থেকে তোমার প্রতি যিনি অনুগ্রহ করেছেন এবং প্রজ্ঞা দান করেছেন সেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। জেনে রেখো, যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে নিজের মঙ্গলের জন্যেই করে। এতে আল্লাহর লাভ–লোকসান কিছুই নেই। আল্লাহতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, ‘যারা সৎ কাজ করে তারা নিজেদের জন্য রচনা করে শান্তির আবাস’– সূরা– রোম–৪৪। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে অকৃতজ্ঞ হয় তার জানা উচিৎ যে, এতে আল্লাহর কোন ক্ষতি নেই। আল্লাহ তো অভাবমুক্ত প্রশংসিত, তিনি বান্দাদের কাজের ব্যাপারে বেপরোয়া। বান্দাদের সবাই আল্লাহতায়ালার মুখাপেক্ষী কিন্তু আল্লাহতায়ালা কারো মুখাপেক্ষী নয়। সমস্ত বিশ্ববাসী যদি কাফের হয়ে যায় তাহলে তাঁর কিছুই আসে যায় না। সূরা লোকমান এমন একটি সূরা–যেখানে রয়েছে মুমিন বান্দার জন্য এক পথ নির্দেশক নসিহা।
যারা নামাজ পড়ে, যাকাত দেয় এবং পরলোকে বিশ্বাস করে তাদের জন্য এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও উপদেশমূলক সূরা। এই সূরাতে হযরত লোকমান স্বীয় পুত্রের প্রতি আল্লাহতায়ালার একত্ববাদ কিংবা তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার, মা–বাবার সেবা, নামাজ আদায়, যাকাত প্রদান ও বিপদে ধৈর্যধারণ সম্পর্কে যে সব উপদেশ দিয়েছিলেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। অহংকার না করা, সংযতভাবে চলাফেরা করা এবং নম্রভাবে কথা বলার জন্য উপদেশ দিয়ে বলা হয়েছে, গলার আওয়াজের মধ্যে গর্দভের গলা সবচেয়ে শ্রুতিকটু। এই উপদেশগুলো মুমিন বান্দার জীবনে চলার পথ আমুল পরিবর্তন করে দিতে পারে। পুত্র অপেক্ষা প্রিয় মানুষের কাছে আর কিছুই নেই। মানুষ তার ছেলেকে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ও মূল্যবান সামগ্রী দিতে চায়। তাই হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে সর্বপ্রথম যে নসিহত করলেন তা হচ্ছে, ‘হে আমার প্রিয় বৎস, ‘একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক কর না, জেনে রাখো যে, এর চেয়ে বড় নির্লজ্জতাপূর্ণ ও জঘন্যতম কাজ আর কিছুই নেই। দ্বিতীয় উপদেশ: মাতা–পিতার প্রতি ইহসান ও তাঁদের সাথে সৎ ব্যবহার করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ আমি মানুষকে পিতা–মাতার সাথে ভালো ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দিয়েছি, তাঁর মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দুই বছর পর সেই সন্তান বুকের দুধ খাওয়া ছেড়েছে, তুমি (তোমার নিজের সৃষ্টির জন্য) আমার শোকর আদায় কর এবং তোমার (লালন–পালনের জন্য) পিতা–মাতার ও কৃতজ্ঞতা আদায় কর। (পরিশেষে তোমাদের) আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে’। হযরত মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, গর্ভের সন্তান ধারণ করা মায়ের জন্য একটি কষ্টকর ব্যাপার। হযরত কাতাদাহ (রহঃ) বলেন, এটি হল পরিশ্রান্তির উপর আরো পরিশ্রান্তি– তাবারি (২০/১৩৭)। হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে আরও উপদেশ দিলেন, হে বৎস–যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণ ছোটও হয় এবং তা যদি কোন শিলাখন্ডের ভেতর কিংবা আসমানসমূহে লুকিয়ে থাকে অথবা যদি তা থাকে জমিনের ভেতর তাও আল্লাহতায়ালা এনে হাজির করবেন, অবশ্যই আল্লাহতায়ালা সুক্ষদর্শী, সকল বিষয়ে সম্যক অবগত। আমলসমূহ কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা অবশ্যই উপস্থিত করাবেন। মিযানে তা ওজন করা হবে এবং তার প্রতিফল দেওয়া হবে। যদি তা উত্তম আমল হয় তাহলে উত্তম পুরষ্কার দেওয়া হবে এবং খারাপ আমলের জন্য দেওয়া হবে শাস্তি।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কেয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করবো ন্যায় বিচারের মানদন্ড। কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না’– সূরা আম্বিয়া–৪৭। হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে আরও বলেন, ‘হে বৎস–তুমি নামাজ প্রতিষ্ঠা কর, মানুষদের ভালো কাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখ, তোমার উপর কোন বিপদ–মসিবত এলে তাঁর উপর ধৈর্য ধারণ কর’। যেহেতু ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ–এমন একটি বিষয় যা প্রত্যেকের কাছে তিক্ত লাগে, সত্যবাদী লোকদের সাথে সবাই শত্রুতা রাখে, সেহেতু আল্লাহতায়ালা তাদের দেওয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত লোকমান স্বীয় পুত্রকে বলেন, ‘কখনো অহংকারবশে তুমি মানুষদের জন্যে তোমার গাল ফুলিয়ে রেখে তাদের অবজ্ঞা কর না এবং যমিনে কখনো ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিচরণ কর না। অবশ্যই আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক উদ্ধত অহংকারীদের অপছন্দ করেন’। সর্বশেষ উপদেশ হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে দিয়েছেন এভাবে, ‘হে বৎস (জমিনে চলার সময়) তুমি মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর, তোমার কন্ঠস্বর নিচু কর’। এই উপদেশগুলো যেন প্রত্যেক মুমিন বান্দার চলার পথে পাথেয় হয় সেই আর্জিটুকু মহান রবের কাছে পেশ করি, আমিন।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, অধ্যাপক (ইএনটি)-অবসরপ্রাপ্ত, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ












