বাংলাদেশের অন্যতম বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ বেঁচে থাকতেই প্রথাবিরোধী অভিধা পেয়েছিলেন। কারণ তিনি সমাজের প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় মৌলবাদ, রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা এবং গতানুগতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। নারী নিপীড়নের ঘোর বিরোধিতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপসহীন এবং সত্য প্রকাশে অবিচল।
আশির দশকের শেষভাগ থেকে সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন তিনি। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে মূলত এই লেখালেখির সূত্রপাত। সে সময়ে সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখতে থাকেন হুমায়ুন আজাদ। ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থটি মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারাবাহিক সমালোচনা। নির্মম সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য আশির দশক থেকে পাঠকসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। কবিতা, উপন্যাস ও রচনা সর্বত্রই গতানুগতিক চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রচনায় এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন,সর্বদা থেকেছেন সমালোচনায় মুখর।
কিশোর–কিশোরী ও তরুণ–তরুণীদের জন্য হুমায়ুন আজাদ রচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের জীবনী ‘লাল নীল দীপাবলী’। স্বপ্ননীল নবীনদের চোখের সামনে বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরকে আলোকমালার মতো জ্বেলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কাহ্নপাদ থেকে শুরু করে বড়ু চন্ডীদাস, মুকুন্দরাম, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, বিদ্যাসাগর, মধুসুদন, বিহারীলাল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথসহ অসংখ্য কবি–সাহিত্যিকের সোনালী অধ্যায়কে তুলে ধরেছেন একটি দীর্ঘ কবিতার মতো করে। লেখকের সুনিপুণ ব্যঞ্জনায় বইটি হয়ে উঠেছে সাহিত্যের অনন্য সৃষ্টিকর্ম।
তিনি সাহিত্যকে বলেছেন আলোর পৃথিবী, যেখানে তিনি চর্যাপদকে বলেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রদীপ। কাহ্নপাদ, লুইপাদ, সরহপাদ,চাটিপাদ, ডোম্বিপাদসহ ২৪ জন বৌদ্ধ বাউল কবি চর্যাপদের কবিতাগুলো রচনা করেছেন। এরপরের দেড়শ বছরকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ। এই ১৫০ বছর নিয়ে নানা সময় নানা আলোচনা হয়েছে। খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় প্রকৃত কারণ। অন্ধকার যুগের অবসানের পর আবির্ভূত হয় বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ, যেটি মূলত চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে। এই যুগের শুরুতে রচিত কাব্য হচ্ছে বড়ু চন্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। তবে মধ্যযুগ মূলত যে কাব্যগুলোর জন্য বিখ্যাত, সেগুলোকে বলা হয় ‘মঙ্গলকাব্য’। প্রায় ৫০০ বছর ধরে রচিত হয়েছে মঙ্গলকাব্য। মধ্যযুগের শেষ ভাগে অর্থাৎ চতুদর্শ শতকের শেষভাগে রচিত হয় বৈষ্ণব পদাবলী। আকারে ছোট তবে তুলনাহীন আবেগ পাঠককে আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, আলাওল, লোকসাহিত্যসহ বাংলা সাহিত্যের সকল সৃষ্টিকর্মে ফুটে ওঠে সে সময়ের সাধারণ মানুষের জীবনের নিপীড়ন ও নানা বঞ্চনার কথা। রবীন্দ্রনাথকে হুমায়ুন আজাদ বলেছেন প্রতিদিনের সূর্য। রবিঠাকুরের নানা সৃষ্টি নিয়ে যেমন করেছেন কড়া সমালোচনা, তেমনি তিনি অকপটে উল্লেখ করেছেন বাংলা সাহিত্যে রবিন্দ্রনাথের অনিবার্যতা।
মূলত ভাষা নিয়ে বেশি কাজ করেছেন এই কালজয়ী লেখক। বাংলা ভাষা–সাহিত্যের পুরনো প্রথা ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন সমাজ। তাই তাঁর কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধে বারবার উঠে এসেছে পুরাতন প্রথা ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার সাহসী আহ্বান। কিশোর ও তরুণদের জন্য লেখা হুমায়ুন আজাদের আরেক অনন্য সৃষ্টি বাংলা ভাষার জীবনী ‘কতো নদী সরোবর’। বাংলা ভাষার উদ্ভব, বয়স এবং এর বৈচিত্রময় নানা দিক নিয়ে এই বইয়ে কথা বলেছেন তিনি। রূপক শব্দ রূপের ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে এখানে। পেশাগত জীবনে বাংলাভাষার শিক্ষক হওয়ার কারণেই হয়তো বাংলাভাষার রূপ, শোভা আর সৌন্দর্যের মুগ্ধতা যেন তাঁর জ্ঞানের সকল ঐশ্বর্য এই বইটিতে লুটিয়ে দিয়েছেন । জাতীর হাতে তুলে দিয়েছেন এক অমূল্য রত্ন।
তিনি তাঁর লেখায় সময়কে ধরতে চেয়েছেন। তবে বরাবরই তিনি সময় থেকে অনেকখনিই এগিয়ে ছিলেন। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি বইমেলা থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরার পথে জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ–এর কিলিং স্কোয়াডের সদস্যদের চাপাতির আঘাতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। ৯০ দশকে প্রকাশিত ‘আমি কি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন ‘এখন তো আমি বেঁচে আছি ঘাতকদের সময়ে’। সে বছরই জার্মানির লেখকদের সংগঠন জার্মান পেন ক্লাব বা ডয়চে পেন সেনট্রুমের আমন্ত্রণে গবেষণার কাজে জার্মানি গিয়েছিলেন তিনি। মিউনিখে পা রাখার মাত্র চার দিনের মধ্যেই থেমে যায় তাঁর জীবন।










