বাংলাদেশের দক্ষিণ–পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত উখিয়া–টেকনাফ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। বঙ্গোপসাগর, নাফ নদী এবং প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তঘেঁষা এই জনপদ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও বহু বছর ধরে অপহরণ, মাদক, ইয়াবা, চোরাচালান এবং মানবপাচারের মতো বহুমাত্রিক অপরাধের ভার বহন করছে। এই সংকট কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, মানবাধিকার, সামাজিক স্থিতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য উদ্বেগজনক। উখিয়া–টেকনাফে অপহরণের ঘটনা একের পর এক ঘটেছে; মুক্তিপণ আদায়ের জন্য সাধারণ কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী পর্যন্ত অপহরণের শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, আইস, হেরোইন এবং অন্যান্য মাদক দেশে প্রবেশ করছে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাচালানি পণ্য জব্দ হলেও অপরাধচক্র নতুন কৌশলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। মানবপাচারও একইভাবে উদ্বেগজনক; উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অসংখ্য মানুষকে সমুদ্রপথে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো–কেন উখিয়া–টেকনাফ বারবার এই অপরাধচক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে একাধিক বাস্তবতা সামনে আসে। প্রথমত, সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান। নাফ নদী, দুর্গম পাহাড়, বনাঞ্চল ও দীর্ঘ উপকূলরেখা অপরাধীদের জন্য সহজ চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের আর্থসামাজিক বৈষম্য। সীমান্তের বহু মানুষ আজও দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের মধ্যে বসবাস করেন। যখন বৈধ আয়ের পথ সংকুচিত হয়, তখন কিছু মানুষ অপরাধচক্রের প্রলোভনে পড়ে বাহক, দালাল বা সহযোগীতে পরিণত হন। এটি কোনোভাবেই অপরাধের বৈধতা দেয় না; বরং দারিদ্র্য ও অপরাধের পারস্পরিক সম্পর্ককে স্পষ্ট করে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের উপস্থিতি মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন যেমন তৈরি করেছে, তেমনি কিছু সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করেছে। তবে এ–ও মনে রাখতে হবে, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার দায় ব্যক্তিগত বা সংগঠিত অপরাধীদের; পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে তার জন্য দায়ী করা ন্যায়সঙ্গত নয়। অপরাধ দমনে প্রমাণভিত্তিক ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর।
উখিয়া–টেকনাফের মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো–তারা প্রতিদিন ভয়ের সঙ্গে বসবাস করেন। কৃষক জমিতে যেতে শঙ্কিত, জেলে সাগরে যেতে আতঙ্কিত, পাহাড়ে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করাও ঝুঁকিপূর্ণ, অনেক পরিবার সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পায় না। শিশুদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং নারীদের স্বাভাবিক চলাচল–সবকিছুতেই নিরাপত্তাহীনতার ছায়া পড়ে। এই দীর্ঘস্থায়ী ভয় সামাজিক আস্থা ক্ষয় করে এবং উন্নয়নের গতি মন্থর করে।
অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিজিবি, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য সংস্থা বহু অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করেছে, পাচারচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে এবং মানবপাচারের শিকার বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল অভিযাননির্ভর পদ্ধতিতে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধচক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক, অর্থপাচার, স্থানীয় সহযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ এবং আন্তঃসীমান্ত সংযোগ একসঙ্গে ভেঙে দিতে হবে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ডিজিটাল নজরদারি, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বাড়ানো অপরিহার্য।
সরকারের করণীয়ও বহুমাত্রিক। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি টেকনাফ ও উখিয়ায় কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা, পর্যটন, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা এবং যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে হবে। উন্নয়নের সুফল যখন মানুষের হাতে পৌঁছায়, তখন অপরাধচক্রের প্রলোভন তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কলেজ, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে মাদকবিরোধী ও মানবপাচারবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়মিত পরিচালনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া দরকার। জনপ্রতিনিধিরা যদি জনগণের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, অভিযোগ গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেন, তবে অনেক অপরাধ আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। একইভাবে সুশীল সমাজ, শিক্ষক, ইমাম, সাংবাদিক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে এত বড় সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
মানুষেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মাদক বহন, পাচার বা অপহরণচক্রের সহযোগী হওয়া থেকে বিরত থাকা, সন্দেহজনক কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশাসনকে দ্রুত জানানো, সন্তানের চলাফেরা ও অনলাইন যোগাযোগের প্রতি নজর রাখা, মানবপাচারের প্রলোভন সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন করা এবং সামাজিকভাবে অপরাধকে প্রত্যাখ্যান করা–এসবই নাগরিক দায়িত্বের অংশ। অপরাধীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যত কমবে, তাদের কার্যক্রম পরিচালনা তত কঠিন হবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার কোনো এক দেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা এবং বৈধ বাণিজ্য ও চলাচলের সুযোগ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নাগরিক অধিকার রক্ষাও এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উখিয়া–টেকনাফের সাধারণ মানুষ যেন কেবল সীমান্তে বসবাসের কারণে সন্দেহ বা অবহেলার শিকার না হন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিচারপ্রাপ্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সাংবিধানিক অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন ও নিরাপত্তা–এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বিত করেই সীমান্ত অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি, নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। উখিয়া–টেকনাফকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি বিশেষ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অঞ্চলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
উখিয়া–টেকনাফের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তারা চান নিরাপদে ঘুমাতে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে, সাগরে মাছ ধরতে, জমিতে চাষ করতে এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে। সীমান্তের এই মানুষগুলো রাষ্ট্রের প্রান্তিক নাগরিক নন; তারা বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা এবং অপরাধমুক্ত একটি জনপদ গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আজ যদি আমরা উখিয়া–টেকনাফকে মাদক, অপহরণ, চোরাচালান ও মানবপাচারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে না পারি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। আর যদি রাষ্ট্র, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণ সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসে, তবে টেকনাফ আবারও পর্যটন, সম্ভাবনা, শান্তি ও সীমান্ত–সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। সেই প্রত্যাশাই আজ সীমান্তের মানুষের সবচেয়ে বড় আশা।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।











