মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২৬-এর ফলাফল : কিছু কথা

আলমগীর মোহাম্মদ | বৃহস্পতিবার , ১৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

২০০৭ সালের মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের স্মৃতি যাদের মনে আছে, ২০২৬ সালের এই সদ্য প্রকাশিত ফলাফলের দিকে তাকালে তারা এক গভীর ও অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন। দুই দশকের ব্যবধানে এসে এই দুই পরীক্ষার ফলাফলের আত্মিক মিল কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের এক রুগ্‌ণ ও ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতাকে আবারও আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের এই ফলাফল দীর্ঘদিনের জমে থাকা মেকি অর্জনের পলেস্তারা খসিয়ে দিয়েছে।

মাঝখানের দীর্ঘ সময়টিতে আমরা যা দেখেছি, তা এককথায় এক ভয়াবহ স্তরের রেজাল্ট ম্যানিপুলেশন এবং গ্র্যাডুয়াল ইনফ্লেশন। জিপিএ৫ আর পাসের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ানোর এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। এই অশুভ প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চালানো হলেও শিক্ষার আসল মান কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তা বিবেচনা করা হয়নি। আমরা এমন এক অবাস্তব পরিসংখ্যান তৈরি পেয়েছিলাম, যেখানে ভালো ফলের সুনামি বইলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিংবা কর্মক্ষেত্রের প্রাথমিক ধাপেই আমাদের শিক্ষার্থীরা খাবি খেয়েছে। ২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল যেন এক সশব্দ চড় মেরে আমাদের সেই মেকি স্বপ্নের ঘুম ভাঙিয়ে দিল। এই ফল আমাদের মুখের ওপর সত্যিটা তুলে ধরে স্পষ্ট করে দিল যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনুন্নতস্ট্যাটাস পার হতে পারেনি।

এই অন্ধকার আর দৈন্য কাটিয়ে আলো আনতে হলে (লেট দেয়ার বি লাইট) প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে যে, গোড়ায় চরম গলদ রয়েছে। কেবল একটি পরীক্ষা বা নির্দিষ্ট বছরের ফলাফলকে খণ্ডিতভাবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থার এই সামগ্রিক ভঙ্গুরতা কাটাতে হলে সবচেয়ে আগে যাদের আন্তরিক হতে হবে, তাঁরা হলেন শিক্ষক ও অভিভাবক। আমাদের ভুললে চলবে না, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রায় সত্তর শতাংশই এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো যাই থাক না কেন, স্থানীয় পর্যায়ে এই বিশাল সংখ্যক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অভিভাবকদের সক্রিয়, আন্তরিক ও সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া একেবারে অসম্ভব। অভিভাবকরা যদি কেবল সন্তানের রেজাল্ট কার্ডের জিপিএ৫ খোঁজার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেন, তবে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কখনোই বদলাবে না।

শিক্ষা পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পেছনের আরেকটি বড় কারণ হলো পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা কমিটির অনাকাঙ্ক্ষিত অবক্ষয়। আমাদের দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যে নগ্ন ও কুরুচিপূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনা লালন করা হয়, তা এই ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। শিক্ষা বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, স্থানীয় ক্ষমতার দাপট দেখানো ব্যক্তিবর্গকে যখন স্কুলের সভাপতি বা সদস্য বানিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন শিক্ষার পরিবেশ আর টিকে থাকে না। এই চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নগ্ন রাজনৈতিক বিবেচনা পুরোপুরি বাদ দিয়ে শিক্ষা অনুরাগী, বিদ্যানুরাগী, সৎ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে। যোগ্য ও শিক্ষিত মানুষদের ডেকে এনে সম্মান দিয়ে এই দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে, যেন তাঁরা প্রশাসনিক ও শিক্ষাদানের পরিবেশে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন।

একই সাথে শিক্ষকদের ভূমিকার দিকেও আমাদের কঠোর ও গঠনমূলক দৃষ্টি দিতে হবে। শিক্ষকেরা হলেন শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি সময়ের সাথে নিজেকে হালনাগাদ না করে, তবে পুরো জাতি পঙ্গু হয়ে পড়ে। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি বিনীত আহ্বান থাকবে আপনারা নিজেদের একটু আপগ্রেড করুন। প্রযুক্তির অসামান্য প্রসারের ফলে বর্তমান বিশ্বে শিক্ষাদানের নানামুখী কৌশল, বৈচিত্র্যময় মেটেরিয়ালস এবং আধুনিক এপ্রোচের সন্ধান পাওয়া অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। এক দশক আগের প্রথাগত ও একঘেয়ে পদ্ধতিতে আজকের শিক্ষার্থীদের আর বেঁধে রাখা যাবে না। শিক্ষকেরা যদি মন থেকে নিজেদের বদলাতে চান, তবে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সামান্য পরিশ্রমে এবং খুব অল্প সময়েই নিজেদের শিক্ষাদান পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আমাদের ক্লাসরুমের মানসিকতাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। গাইডবুক, নোটবই কিংবা কোচিং শিটের ওপর যে চরম নির্ভরশীলতা গড়ে উঠেছে, তা শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু বানিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ গাইডবুক ছেড়ে মূল টেক্সটবুকটি নিজেরা আগে ভালোমতো রপ্ত করার চেষ্টা করুন। পাঠ্যবইয়ের ভেতরের জ্ঞানকে যদি চমৎকার ও সহজ বোধগম্য উপায়ে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা যায়, তবে কোনো কৃত্রিম গাইডবুকের প্রয়োজন পড়ে না। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পাঠদানকে আনন্দময় করে তোলা। শ্রেণিকক্ষ হবে জ্ঞানের এক উন্মুক্ত আনন্দের জায়গা, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয়ে বা বাধ্য হয়ে নয়, বরং কৌতূহল থেকে শিখবে। যে ক্লাসরুমে আনন্দ নেই, যেখানে শিক্ষকের বক্তৃতা একঘেয়ে এবং যান্ত্রিক, সেই নিরানন্দ ক্লাসরুমের চেয়ে বড় জাহান্নাম শিক্ষার্থীদের জন্য আর কিছুই হতে পারে না। এই নিরানন্দ পরিবেশই শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহকে শৈশবেই হত্যা করে।

আমাদের সার্বিক টিচিং, লার্নিং, এসেসমেন্ট এবং ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়াকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে পুনর্গঠন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এতদিন ধরে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি কেবল পাসের হার বাড়াতে পেরেছে, প্রকৃত মেধা ও দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারেনি। আশার কথা হলো, এই অন্ধকার পরিস্থিতির মধ্যেও কিছুটা আলোর ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে একটি আধুনিক, পারস্পরিক সহযোগিতামনোভাবাপন্ন এবং আউটকাম বেইজড (ফলাফল বা দক্ষতাভিত্তিক) কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, কেবল একটি চমৎকার নতুন কারিকুলাম কাগজেকলমে তৈরি করলেই রাতারাতি শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে না। যদি নীতিনির্ধারকদের এই আধুনিক উদ্যোগকে বাস্তবায়ন করার মতো যোগ্য, আপগ্রেডেড ও মানসিকভাবে প্রস্তুত শিক্ষক আমরা ক্লাসরুমে সরবরাহ করতে না পারি, এবং যদি অভিভাবক ও রাজনীতিমুক্ত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে পরিবেশ তৈরি না করা হয়, তবে এই নতুন কারিকুলামও ব্যর্থ হতে বাধ্য।

২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফলের মাধ্যমে যে সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তা যেন আমাদের জন্য একটি শেষ সতর্কবার্তা বা ওয়েকআপ কল হয়। রেজাল্ট ম্যানিপুলেশন ও কৃত্রিম পাসইনফ্লেশনের বুদবুদ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিক্ষার প্রতিটি ধাপে সংস্কার আনতে হবে। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজ সব পক্ষকে একসাথে দায়িত্ব নিতে হবে। তবেই কেবল একটি নিরানন্দ, মুখস্থনির্ভর ও রুগ্‌ণ শিক্ষাব্যবস্থা কাটিয়ে আমরা এমন এক আলোকোজ্জ্বল শিক্ষাঙ্গন রচনা করতে পারব, যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কেবল জিপিএ৫ নয়, বরং সত্যিকারের জ্ঞান ও যোগ্যতায় সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কলামিস্ট ও অনুবাদক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউখিয়া-টেকনাফের আর্তনাদ : সীমান্তের মানুষ কবে ফিরে পাবে নিরাপত্তা
পরবর্তী নিবন্ধঅর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ