যে কোনো অর্থনীতিতে জীবনযাত্রার মান নির্ভর করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংজ্ঞায় বলা হয় যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো একটি বহুমুখী চলমান প্রক্রিয়া, যাহা দ্বারা জনগণের মাথাপিছু আয় এবং জীবনযাত্রার প্রকৃত মান বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্বারা একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বুঝানো হয়। অপরপক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া যা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সহায়তা করে। যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অংশ সেহেতু বলা যায়, অর্থনৈতিক শক্তিগুলো দ্বারা মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির চলমান প্রক্রিয়াকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো প্রসারমান উৎপাদন। তবে ইহা দ্বারা সামগ্রিক উন্নয়ন নির্দেশিত হয় না। আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্বারা একটি অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন নির্দেশিত হয়। দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে আর্থ–সামাজিক অগ্রগতি যদি ঘটে, মানবীয় উন্নয়নের সূচক যদি বাড়ে, তবে সেই ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে বলা যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নরে কতগুলো লক্ষণ আছে। যেমন– বার্ষিক মাথাপিছু প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি, জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির ন্যূনতম চাহিদা পূরণ, দেশের অবকাঠামোর ক্রমোন্নয়ন, ক্রমাগত দারিদ্র্য বিমোচন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে মূলধন গঠনের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া, কর্মসংস্থানের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া, রপ্তানি বাণিজ্যের ক্রমাগত প্রসারতা, পুঁজির বাজারের সমৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ, পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ, ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগসহ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সুপেয় পানির পর্যাপ্ত জোগান, শিশু মৃত্যুরহার হ্রাস, প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি ইত্যাদি।
আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে যদি সাধারণভাবে বিশ্লেষণ করি তবে বলা যায়, সমগ্র অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য পণ্য ও সেবার উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিই হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অর্থনৈতিক শক্তিগুলো দ্বারা মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধির চলমান প্রক্রিয়াকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলা যায়। একটি উদাহরণের সাহায্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নির্ণয় করা যায়। মনে করি ২০২৪ সালে একটি অর্থনীতির প্রকৃত এউচ ৫০০ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালে উক্ত অর্থনীতির প্রকৃত GDP ৫২৫ কোটি টাকা। এই অবস্থায় উক্ত অর্থনীতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে (৫২৫–৫০০)/৫০০ক্ম১০০= (২৫/৫০০)ক্ম ১০০= ০.০৫ক্ম১০০=৫%। অতএব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার পাঁচ শতাংশ। এভাবে সকল অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হারকে নির্ণয় করা হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে স্থির মূল্য বিবেচ্য।
নির্দিষ্ট সময়ে একটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার নির্ণয় করার সময় অর্থনীতিতে বিরাজমান সকল খাতকে বিবেচনা করতে হয়। একটি অর্থনীতিতে অনেকগুলো খাত আছে। যেমন– শিল্পখাত কৃষিখাত, সেবাখাত, আবাসন খাত ইত্যাদি। তবে এক এক দেশে খাতগুলোর পরিমাণ কম বেশি হয়। যেমন– বাংলাদেশে এসব খাতের পরিমাণ হয় ১৯ টি। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, মোট ১৯টি খাতের মধ্যে কৃষিখাত ১টি, সেবাখাত ১৩টি ও শিল্পখাত ৫টি। আবার ১৯টি খাতের মধ্যে ৬টি খাতে রয়েছে বিভিন্ন উপখাত। যেমন– কৃষিখাতে রয়েছে ৪টি উপখাত। শিল্পখাতের মধ্যে খনিজ ও খনন– দুইটি উপখাত রয়েছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ৩টি উপখাত, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দুইটি উপখাত, সেবাখাতের মধ্যে ৫টি উপখাত এবং আর্থিক ও বিমা খাতে ৩টি উপখাত রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হচ্ছে সেবা খাত। সেবা খাতের ৫টি উপখাত হয়– হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যাংক বিমা। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্ধেকের বেশি মূল্য সংযোজনই হচ্ছে এ খাত থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রকাশিত তথ্যানুসারে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতের অবদান ১৮ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫২ শতাংশ। গত ১০ বছরে জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান পৌনে চারগুণ বেড়েছে। একই সময়ে শিল্পখাতের অবদান সোয়া চারগুণ ও কৃষি খাতের অবদান প্রায় পৌনে ৩ গুণ বেড়েছে।
উপখাত ভিত্তিক হিসাবে জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান উৎপাদনমুখী শিল্পের। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ উপখাতে প্রায় ৮ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে। শিল্পখাতের মোট অবদানের প্রায় ৬৮ শতাংশ আসে এই উপখাত থেকে। উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ৪.৪০ গুণ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা উপখাতের। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখাতে স্থির মূল্যে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.২৯ গুণ। অবদানের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কৃষি। এ খাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয় শস্য ও ফসল চাষ থেকে। বাকি অংশ আসে মৎস্য, গবাদিপশু ও হাঁস–মুরগি পালন এবং বন ও সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে। সামগ্রিক কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ২.৮৪ গুণ। সামগ্রিক কৃষিখাত থেকে মূল্য সংযোজন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে নির্মাণ শিল্প। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ খাতে মূল্যসংযোজন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪.৬৯ গুণ। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে আবাসন বা রিয়েল ষ্টেট উপখাত। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ খাতে মূল্য সংযোজন হয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬০২ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপিতে অবদান প্রায় পৌনে ৮ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আবাসন বা রিয়েল ষ্টেট খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৬৪ গুণ।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আর ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা তখনই অর্জন করা সম্ভব হবে যদি অর্থনীতিতে সকল খাত ও উপখাত যথাযথভাবে কাজ করে। কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা যদি বজায় থাকে তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছর থেকেও প্রবৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা করে। আইএমএফ (ওগঋ) বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এই প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক বছর শুরুর পূর্বেই সংশ্লিষ্ট দেশকে ভবিষ্যৎ আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার সম্পর্কে পূর্বাভাস যেমন দিয়ে থাকে তেমনি প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বাড়ানোর উপায় সম্পর্কে জানিয়ে দেয়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, যদি দেশটি নির্দিষ্ট কিছু খাতকে সংস্কার বা পরিবর্তন না করে তবে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পাবে। তেমনি ২০২৬–২৭ আর্থিক বছর শুরুতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশকে জানিয়ে দিয়েছে যে, রাজস্ব আহরণ জোরদার, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর না করলে বা এসব খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার না করলে মধ্য মেয়াদে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ যা ২০২৫–২৬ আর্থিক বছরে অর্জিত হয়েছে এর তুলনায় আরো হ্রাস পেয়ে ৩ শতাংশের নীচে নেমে আসবে। যদি প্রবৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের নীচে নেমে যায়, তবে কর্মসংস্থান বাড়ানোর গতি যেমন হ্রাস পাবে তেমনি মানুষের আয় বাড়ানোর গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। ফলে দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিম্ন থেকে নিম্নস্তরে নেমে যেতে পারে। এই দারিদ্র্য পরিস্থিতি শহরাঞ্চলে তেমন অনুভূত হবে না। এই দারিদ্র্য পরিস্থিতি আঘাত আনবে শহরের নিম্ন আয়ের লোকদের ওপর এবং বিস্তীর্ণ বস্তি এলাকায়। আর গ্রামের বিশাল এলাকা জুড়ে ছায়া পড়বে এই নির্মম অবস্থার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণি লোক লজ্জার ভয়ে কাউকেও কোনো কথা বলবে না। তবে তাদের পরিবারের সদস্যরা আগে যে পরিমাণ বা যে কয়টি রুটি খেত তা দিন দিন ক্রমাগত পাতলা হয়ে যাবে। পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেবে সন্তান দেয়। সদ্যজাত সন্তানের মুখে পুষ্টিজাত খাবার আর তুলে দিতে পারবে না। সমাজের বৃহত্তর শ্রেণি আস্তে আস্তে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, যদি প্রবৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের নীচে নেমে যায়, তবে শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগের ভাটা পড়তে পারে। দ্রুতগতিতে বাড়তে পারে বেকারত্ব। শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির গতি আরো মন্থর হয়ে যেতে পারে। সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা যদি ভোগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় তবে উচ্চ বিত্তের ভোগ যথাযথ থাকলেও সামগ্রিক ভোগ কমে যাবে। সমাজে বাড়বে বৈষম্য। কিন্তু এই বৈষম্য বৃদ্ধি কারো কাম্য হতে পারে না।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ,
গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।












