আপনি যদি দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যান ও নিজের জন্য অথবা কারো ঘরে নেয়ার জন্য বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ফল কিনতে চান, আশা করি পাবেন। ফলের মধ্যে আপেল, কমলা, নাসপতি, মোছাম্বি, আঙ্গুর এই ৫/৬ প্রকারের ফল মনে হয় বেশি আমদানী হয়। ৫/৬ প্রকারের ফল না পেলেও অন্তত দুয়েক প্রকারের ফল পাওয়া যায়।
যদি আজ থেকে ৪০/৫০ বছর বা ৬০ বছর আগে দৃষ্টি দেয়া যায় তবে আমরা দেশের ভিন্ন চিত্র দেখতে পাব। ঐ সময় আন্দরকিল্লা টেরী বাজার প্রবেশ মুখের উত্তর দিকে রাস্তার পশ্চিমপাশে ২/৪ টি দোকান ছিল। জানি না এই দোকানগুলি এখন আছে কিনা। এই দোকানগুলোকে জনগণ মেওয়ার দোকান বলত। এখানে এমন কিছু ফল পাওয়া যেত যা মনে হয় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হত। যেমন–আঙ্গুর, আপেল, আনার, কমলা এই জাতীয়। আমাদের দেশে এই ফলগুলো রোগীদের খাবার হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।
গ্রামের মানুষ সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের দিকে গেলে হাত বাড়ালেই ফল খেতে পারে। অনেক স্থানে গাছের নিচে ফল পড়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে হয়ত সচ্ছল পরিবার, পিতা–মাতা অসুস্থ, এমন কোন ব্যক্তি অতি প্রয়োজনের তাগিদে চট্টগ্রাম শহরে আসতেন। তাকে অতি বিনয়ের সাথে আবদার করা হত। তার বৃদ্ধ পিতা–মাতা অসুস্থ। যাতে আন্দরকিল্লা মেওয়ার দোকান থেকে এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) অথবা আধা কেজি ফল কিনে আনেন।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাগের পর চট্টগ্রাম–করাচি জাহাজ সার্ভিস চালু হয়। সর্বশেষ ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রাম–করাচি জাহাজের নাম ছিল শামস। এই জাহাজ চট্টগ্রাম–করাচি যাত্রী পরিবহন করত। কলম্বোতে যাত্রাবিরতি দিত। ডেক শ্রেণীতে জাহাজে অবস্থান এবং খাওয়াসহ ভাড়া ৯৩ টাকা। সময় লাগত ৬/৭ দিন। পরবর্তীতে ঢাকা–করাচি, ঢাকা–লাহোর আকাশপথও চালু হয়, ভাড়া ছিল ২২০/২৫০ টাকা মত। কাজেই পশ্চিম পাকিস্তানের যে কোন দ্রব্য আমাদের এই অঞ্চলে কম বেশি পাওয়া যাবে স্বাভাবিক। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ এখানে উৎপাদিত মৌসুমী ফল খেতে অভ্যস্ত। বিদেশী ফল আমদানিও ছিল না, পাওয়াও যেত না। অতএব বিদেশী ফল খাওয়ার অভ্যস্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। দেশীয় ফল ছিল অনেকটা সস্তা। জনসংখ্যা অনুপাতে ফলের কমতি ছিল না। গ্রামাঞ্চলের মানুষ পাহাড়ের দিকে গেলে মনে হয় না ফল খেতে মালিকের অনুমতির তেমন প্রয়োজন হত। যেহেতু বাগানে মালিকেরও কেউ নেই, বাগান থেকে ফল খেলে গায়ে লাগতেছে না। ভরা মৌসুমে এত বেশি ফল পাওয়া যেত, বিক্রি করার লোক পাওয়া যেত না।
১৯৭০ এর দশকের শেষের দিকে একটি কাঁঠাল ২ আনা/৩ আনায় বিক্রি হত। কিন্তু দেশ দ্রুততার সাথে অনেক কিছুতে আমদানি নির্ভর হয়ে গেছে, তৎমধ্যে ফল অন্যতম। বিভিন্ন দেশ থেকে এত বেশি ফল আমদানি হচ্ছে তা ভাববার বিষয়। জেলা সদর থেকে উপজেলা সদর পেরিয়ে গ্রামেগঞ্জে হাঁটে বাজারে বিদেশ থেকে আমদানি ফলে সয়লাভ বলা যাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাগান থেকে এই ফল সংগ্রহ করা হচ্ছে, করা হচ্ছে বিভিন্ন কার্টনে প্যাকেট, কোল্ড স্টোরেজ তথা হিমাগারে রাখা হচ্ছে। ওখান থেকে জাহাজে তোলা হচ্ছে। জাহাজের ভিতরও কোল্ড স্টোরেজ রাখা হচ্ছে। এই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছলে আমদানিকারকেরা নষ্ট না হয় মত আবারও কোল্ড স্টোরেজ বা অন্যখানে সংরক্ষণ করছে। অতঃপর এই ফল জেলা উপজেলায় পাইকারদের মাধ্যমে বিক্রি করছে। পাইকাররা জেলা সদরে উপজেলা সদরে খুচরা ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি করছে। খুচরা দোকানদের কাছ থেকে আমরা কিনে এ ফল খাচ্ছি।
বিগত প্রায় ৩০/৪০ বছর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশ এমন অবস্থায় এসে দাড়িয়েছে যে, ফলের মধ্যে অধিকাংশই আমরা আমদানি ফল কিনে খাচ্ছি। হয়ত কাঁঠাল, আম, লিচু কয়েকটি ফল মৌসুমী ফল কিনে খাচ্ছি। তারপরও সারা বছর আমাদের দেশের জনগণ বিদেশী ফলের উপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে গেছে বলা যাবে। নিজের বাসা বাড়ির জন্য কিনে আনছে। কারও ঘরে যাওয়ার সময় হাতে করে এ বিদেশী ফল নিয়ে যাচ্ছে।
মেওয়া ফারসি শব্দ মিওয়াহ থেকে আগত যার অর্থ ফল। মেওয়া মূলত শুকনো বা সুমিষ্ট পুষ্টিকর ফলকে বোঝায়। এটি বেদানা, ডালিম, আঙ্গুর, আখরোট, পেস্তা বা বাদামের মত সুস্বাদু ফল সমষ্টিকে নির্দেশ করে। এছাড়া আঞ্চলিকভাবে আতা জাতীয় ফলকেও মেওয়া বলা হয়। আতা বা শরিফা জাতীয় ফলকে অনেক ক্ষেত্রে মেওয়া ফল বলা হয় আঞ্চলিক ব্যবহারে। ঐ সময় জনগণের নিকট মেওয়া শব্দটি মেমা হিসেবে উচ্চারণগত পার্থক্য হয়ে যায়। অর্থাৎ জনগণ মেওয়া না বলে মেমার দোকান বলতে থাকেন।
এই ফলগুলো কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা হচ্ছে। আমাদের মানসিকতা ঐ দিকে গেল কেন! কর্তৃপক্ষ কেন এর মধ্যে এক প্রকার উৎসাহ যোগাচ্ছে। এখনও দেশে পাহাড়ে–পর্বতে নদী–খালের পাড়ে শত বর্গ কি.মি পরিত্যক্ত ভূমি রয়েছে। এখনও দেশে ফল উৎপাদনের জন্য ব্যাপক জমি রয়েছে। আমরা ফল উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছি না। সরকারও ফল আমদানিতে নিরোৎসাহিত করতেছেন না। এতে আমরা আমদানিকৃত ফল খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত এই ফল শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত কিনা!
অপরদিকে আমাদের দেশে এমন কিছু ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। যা সারা বছরই পাওয়া যায়। যেমন–বরই, আনারস, পেয়ারা অন্যতম। মৌসুম অনুপাতে স্বাভাবিক উৎপাদন আর নানানভাবে প্রক্রিয়া করে উৎপাদন এক কথা হয়।
আন্দরকিল্লা কয়েকটি মেমার (মেওয়া) দোকান চট্টগ্রাম অঞ্চলে খুব প্রসিদ্ধ। এইসব দোকানে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েক প্রকারের ফল থাকত। তাও স্বল্প পরিমাণে। রাখতও কম, মানুষ ক্রয়ও করত অল্প অল্প। এইসব মেমার দোকানে সাথে আরও থাকত কেক বানানোর জন্য নানান সরঞ্জামাদি। যথা–কিসমিস, বাদাম, কুমড়ার মুরব্বা ইত্যাদি। পশ্চিম–পাকিস্তান পূর্ব–পাকিস্তান এক দেশ হলেও জনগণের রুচি আর উৎপাদনে ভিন্নতা রয়েছে। আমাদের দেশে যেহেতু ব্যাপক ফল উৎপাদিত হয় বিধায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফল আনার প্রয়োজন পড়ত না। তবে যে কোন জিনিস কম পাওয়া গেলে সেই জিনিসটার মূল্যায়নটা বেশি থাকে। যেমন–আমাদের দেশে ইরান তুরস্ক থেকে ব্যাপক বাদাম আমদানি হয়। যে সব বাদাম আমাদের দেশে তেমন উৎপাদন হয় না। বিশেষ করে আখরোট, কাঠ বাদাম, পেস্তা বাদাম, কাজু বাদাম ইত্যাদি। অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু কিছু কাজু বাদাম উৎপাদন হচ্ছে। এই সব বাদাম আমাদের কাছে অতীব দামী হিসেবে বিবেচিত। তেমনিভাবে আমাদের উৎপাদিত লিচু, ডাব, নারিকেল এইসবও বিশ্বের অনেক দেশে লোভনীয়।
এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, একাধিকবার ইরান যাওয়া হয়েছিল। অবশ্য জুনের শুরুতে ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অতিথি হয়ে। সহযাত্রী নরসিংদীর সাখাওয়াত হোসেন ইরানের সাথে বড় ব্যবসায়ী। তাঁর ব্যবসায়িক পার্টনারদের জন্য যাওয়ার সময় এক কার্টন লিচু নিয়ে যান। ঐ সময় লিচুর ভরা মৌসুম। ইরানীরা আমাদের লিচু খেয়ে অভিভূত হয়ে যান। তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, এত রসালু ফল খেয়ে উপভোগ করেন এবং আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। তেহরান মহানগরীতে বিশাল বিশাল বাদামের দোকান রয়েছে। যেহেতু ইরান বাদামের জন্য বিখ্যাত। তেমনি ইরানে মসলা উৎপাদন হয় বেশি। খায় কম, রপ্তানি করে বেশি।
বলছিলাম বিদেশ থেকে ফল আমদানি করা নিয়ে। আমরা পর্যায়ক্রমে বিদেশ থেকে আমদানি করা ফল খাওয়া কমিয়ে দিই। দেশে উৎপাদিত ফল খেতে অভ্যস্ত হই। সাথে সাথে দেশে শত হাজার কি.মি পাহাড় নদীর তীরে চর রয়েছে। এখানে আমরা উৎপাদন বাড়াই। এই বিষয়ে পাহাড়–পর্বতের বন বিভাগ সাথে সাথে কৃষি বিভাগও বলিষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। বন বিভাগ শুধু বন কাঠ উৎপাদন করবে তা নয় তারা ফলদ বাগান করলে অসুবিধা কি। এমন অনেক ফলদ গাছ রয়েছে যা ফলও পাওয়া যায় পরবর্তীতে কাঠও ব্যবহার করা যায়। যেমন–কাঁঠাল গাছ, আম–গাছ, জাম গাছ ইত্যাদি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।











