বঙ্গবন্ধুর রবীন্দ্রপ্রেম

রাশেদ রউফ | শনিবার , ৬ আগস্ট, ২০২২ at ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ হয়েও বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে যে ভাবনা তিনি পোষণ করেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য এবং বাঙালি সংস্কৃতিই ছিল বঙ্গবন্ধুর ধ্যান-জ্ঞান। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর গান তাঁকে লড়াইয়ের পথে উজ্জীবিত করেছে। তিনি রাজনৈতিক লড়াই ও সংগ্রামে সঙ্গী করেছেন কবিগুরুর গান ও কবিতা। বঙ্গবন্ধু যেমন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন তেমনি ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একজন পরিপূর্ণ মানুষ।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ থাকে। ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীত প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বললেন, ‘রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ নয়’। এর প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। সে-সময় বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, ‘ক্ষমতাবলে হয়তো সাময়িকভাবে রেডিও ও টেলিভিশন হইতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার বন্ধ করা যাইতে পারে। কিন্তু গণচিত্ত হইতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুমধুর আবেদনকে কোনো কালেই মুছিয়া ফেলা যাইবে না।’
বাংলা সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে নানা বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথের কবিতা অবলীলায় উচ্চারণ করতেন। এমনকি ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার পর, পরদিন (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার সোহরাওয়ার্দী ময়দানে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয় বাঙালির সর্বোচ্চ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেদিনের সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপিয়র, এরিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সেতুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখিয়া যিনি বিশ্বকবি হইয়াছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানি না- আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়িবই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাহিবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এই দেশে গীত হইবেই।’ (‘ইত্তেফাক’, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)।
স্বাধীনতার পর, রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটিকে বঙ্গবন্ধু নির্বাচন করেন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে। ‘আমার সোনার বাংলা’কে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করার ক্ষেত্রে কবিগুরুর প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর বিমানে লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরেন বাঙালির অবিসংবাদিত মহানায়ক। ভারতীয় দূতাবাসের নির্দেশে কূটনৈতিক অফিসার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণে জানা যায়, বিমানে বসে বঙ্গবন্ধু ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাইতে শুরু করেন। এ সময় তাঁর চোখে জল দেখেন ভারতীয় কূটনৈতিক। গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করা উচিত বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মিস্টার ব্যানার্জিকে গানটি গাওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁর ভাবনায় ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন আর নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতও তিনি অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। অধ্যাপক সন্‌জীদা খাতুনের স্মৃতিচারণও এ সত্যকে আরো প্রতিষ্ঠা করবে। সন্‌জীদা খাতুন তাঁর ‘সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’ প্রবন্ধে লিখেছেন : “ছাপ্পান্ন সালের কথা। ঢাকাতে কোনো সরকারী বৈঠকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কিছু প্রতিনিধি এসেছিলেন। তাদের জন্যে কার্জন হলে আয়োজিত সংস্কৃতি সন্ধ্যায় আমি গান গাইবার জন্যে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। হঠাৎ একজন এসে খবর দিল, ‘আমার সোনার বাংলা গাইতে হবে, শেখ মুজিবুর রহমান এই গান খানি পশ্চিম পাকিস্তানের ডেলিগেটদের শোনাতে চান।’ …কোনোমতে গানখানি গাওয়া হয়েছিল। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি এটি কোনো বিছিন্ন ঘটনা ছিল না। সুপরিকল্পিতভাবেই এই গানখানি গাওয়ানো হয় সেদিন।”
ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু জেনেছেন যে, স্বরবিতানের ছাপানো সুরের সঙ্গে আমাদের শিল্পীদের গাওয়া সুরের মিল নেই। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যে সুর গেয়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে সুরেই আমাদের জাতীয় সংগীত গাওয়া হবে, সেটিই জাতীয় সংগীতের সুর।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কেবিনেট সচিব এইচ টি ইমাম জাতীয় সংগীতের স্বরলিপি সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। দায়িত্ব দেন শান্তিনিকেতনের প্রথম মুসলমান ছাত্র রবীন্দ্র স্নেহধন্য শিল্পী আবদুল আহাদকে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সুখ-দুঃখের সাথি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যতবার জেলে গেছেন ততবারই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকতো সঞ্চয়িতা। বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর সংযোগ ছিল। বাসায় থাকলে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা ছিল তাঁর সঙ্গী। তিনি বিশ্বাস করতেন রবীন্দ্রনাথের সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েই শান্তির পথ অন্বেষণ করা সম্ভব। একইসঙ্গে পরাধীন জাতির সম্মুখে মুক্তির আলোকবর্তিকা জ্বালানো যাবে। এ বিষয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মমিনুল হক খোকার স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, ‘আজ কানে বাজে সেগুনবাগিচার বাসাতে মিঞাভাইর গুনগুনিয়ে সুর ভাঁজা- ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলরে’, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা’, ‘সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান’, ‘আমার সোনার বাংলা’ ও আরো নানা রবীন্দ্রসংগীতের পঙ্‌ক্তি।’
বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব বলেছেন, ‘প্রতিবারই জেলে যাবার সময় বঙ্গবন্ধু সঞ্চয়িতাটা হাতে তুলে নিতেন। কারাগারের নিঃসঙ্গতায় বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র সঙ্গী ছিল সঞ্চয়িতা। বইটির গায়ে পড়েছিল জেলের সেন্সরের অনেকগুলো সিল। অনেক যত্নে রাখা সত্ত্বেও সঞ্চয়িতার কপিটা বহু ব্যবহারে পুরাতন হয়ে গিয়েছিল।’
বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবনেও রবীন্দ্রনাথ যে কতদূর প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। বেগম মুজিবের মতে, “কবিগুরুর আসন বঙ্গবন্ধুর অন্তরের অন্তস্তলে। রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন দুঃখ-দৈন্য সর্বমুহূর্তে তাকে দেখতাম বিশ্বকবির বাণী আবৃত্তি করতে। ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে যেনো না করি আমি ভয়,’ অথবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ প্রভৃতি গানের টুকরো তিনি আবৃত্তি করে যেতেন দুঃখ-দৈন্য-হতাশায় ভরা অতীতের সেই দিনগুলোয়।”
রবীন্দ্রনাথকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন তাঁর জীবন ও কর্মে। ড. তানভীর আহমেদ সিডনীর এক লেখায় উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর রবীন্দ্রপ্রেমের চমৎকার দৃষ্টান্ত। তিনি লিখলেন, স্বাধীনতার পরপরই ওপার বাংলার প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ছড়াসাহিত্যিক অমিতাভ চৌধুরী বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এখানে বাঙালি জাতির জনক বলেছিলেন, ‘আমার রবীন্দ্র-প্রীতি ছোটবেলা থেকেই। মনে আছে, আমি তখন স্কুলের নিচু ক্লাসে পড়ি। হঠাৎ একটি সাধারণ কবিতার অতি সাধারণ দুটি লাইন আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!’ গ্রামের ছেলে আমি, সাদামাটা লোক। মনে হলো, এত সাদামাটা কথায় বাস্তুহারা এক দুঃখী মানুষের কথা তো আর কেউ লেখেননি। আমি সেই প্রথম মানুষকে ভালোবাসতে শিখলাম। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের ওই যে লেখা ‘নমঃ নমঃ নমঃ সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি/গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি’ পড়ার পরই আমি দেশকে ভালোবাসতে শিখলাম। রবীন্দ্রনাথকে আমি ভালোবাসি তাঁর মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমের জন্য। তারপর বড় হয়ে পড়লাম ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ।’ আমাদের দেশের দুর্ভাগা মানুষের প্রতি এত দরদ আর কার আছে?’
সিলেটে জন্ম অমিতাভ চৌধুরীর। বাঙালির নেতার জন্য তিনি নিয়ে গেছেন রবীন্দ্র গ্রন্থাবলি- অখণ্ড গীতবিতান, সঞ্চয়িতা এবং সমগ্র রচনাবলি। উপহার পেয়ে মুগ্ধ নেতা বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের এই চোখ দুটিতে কী আছে বলুন তো? দেখুন, দেখুন চেয়ে দেখুন, চোখ দুটিতে জ্বলজ্বল করছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এ জন্যই তো তাঁকে আমি এত ভালোবাসি। আর এই ‘সঞ্চয়িতা’ সঙ্গে থাকলে আমি আর কিছুই চাই না। নাটক নয়, উপন্যাস নয়, কবিগুরুর কবিতাই আমার সব সময়ের সঙ্গী ছিল। কবিতার পর কবিতা পড়তাম আর মুখস্থ করতাম। এখনও ভুলে যাইনি। এই প্রথম মিয়াঁওয়ালি জেলের ক’মাস ‘সঞ্চয়িতা’ সঙ্গে ছিল না। বড় কষ্ট পেয়েছি। জানেন তো, আমার একটি প্রিয় গানকেই ‘আমার সোনার বাংলা’ আমি স্বাধীন দেশের জাতীয় সঙ্গীত করেছি। আর হ্যাঁ, আমার আর একটি প্রিয় গান ডিএল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা।’ দুটো গানই আমি গুনগুন করে গেয়ে থাকি।’
একই সময় বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা বললেন, ‘আব্বা, মনে আছে তোমার, একটা বই- রবীন্দ্রনাথের- তাতে সব জেলের ছাপ ছিল?’
‘সঞ্চয়িতা’র পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মুখ না তুলেই মুজিব তাঁর কন্যাকে বললেন, ‘মনে থাকবে না, ও বইখানা তো ওরা পোড়ায় দিছে।’
ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব এতটাই বেশি ছিল, আর তাই তো কথায়, বক্তৃতায় উপমা দিতেন কবিগুরুর রচনাবলি থেকে। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর আহ্বানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রীরূপে শপথ গ্রহণের কিছুক্ষণ পরেই জনৈক সাংবাদিক যখন বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন, ‘স্যার, আজকের দিনে জাতির প্রতি আপনার বাণী কী?’
জবাবে চিরাচরিত হাস্যমুখে তিনি বলেন : ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ভয় নাই ওরে ভয় নাই/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’
সাহসে, সংগ্রামে, প্রতিবাদে, আনন্দ প্রকাশে বঙ্গবন্ধু আশ্রয় নিতেন রবীন্দ্রনাথের। চৈতন্যের নৈকট্যের জন্য তাঁদের ভাবনা ও কল্যাণবোধ প্রায় অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা’, আর বঙ্গবন্ধু তাকে জাতীয় সংগীত করে প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁর অন্তরের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী