আবারও বন্ধ হলো হরমুজ প্রণালি

ভারতের পতাকাবাহীসহ একাধিক জাহাজে হামলা

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

হরমুজ প্রণালি আবারও কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌঅবরোধকে ‘যুদ্ধবিরতির সরাসরি লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তেহরান জানিয়েছে, এই অবরোধ অব্যাহত থাকলে প্রণালি খুলে দেওয়ার আগের সিদ্ধান্ত থেকেও তারা সরে আসবে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানায়, শত্রুপক্ষ যতক্ষণ জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করবে এবং নৌঅবরোধ বজায় রাখবে, ততক্ষণ ইরান একে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবেই গণ্য করবে। পরিষদটি আরও সতর্ক করে বলে, এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি শর্তসাপেক্ষে ও সীমিত আকারে খুলে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটিও স্থগিত করা হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন নতুন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে এবং তেহরান সেগুলো ‘পর্যালোচনা’ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। একইসঙ্গে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তাদের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশটির সামরিক বাহিনী পুনরায় হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরআইআরজিসি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমফারস নিউজ, ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি এবং রাষ্ট্রীয় সমপ্রচার সংস্থা আইআরআইবি এক বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, প্রণালিটি ‘আগের অবস্থায়’ ফিরে যাবে এবং এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে সশস্ত্র বাহিনীর হাতে। আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অভিযোগ এনে বলেছে, তথাকথিত নৌঅবরোধ আসলে ‘সমুদ্রপথে জবরদস্তি দখল’ এবং একধরনের জলদস্যুতা। এর আগে ইরান সতর্ক করেছিল, তাদের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করা হলে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেবর্তমান পরিস্থিতি সেই হুমকির বাস্তবায়ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে শিপিং খাতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানি নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রেডিও বার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই বার্তায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো জাহাজকে এই জলপথ দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। ইরান নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে গুলিবর্ষণের একাধিক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ এই ধরনের হামলার শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, একটি ট্যাংকারে ইরানি গানবোট থেকে গুলি চালানো হয়েছে। একই সময়ে আটটি ট্যাংকারের একটি বহর প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করছিলযা সামপ্রতিক সময়ের মধ্যে বিরল ঘটনা। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগ উঠেছে। ‘সানমার হেরাল্ড’ নামের ওই জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় আক্রমণের মুখে পড়ে বলে ভারতীয় একটি সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে জাহাজটির ক্রু ও জাহাজ বর্তমানে নিরাপদ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লি ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে, যা পরিস্থিতির কূটনৈতিক মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের ৭ দাবির সবগুলো মিথ্যা : তেহরানের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করা সামপ্রতিক মন্তব্যগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প যে সাতটি দাবি করেছেন তার সবগুলোই মিথ্যা। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলাপআলোচনা চলছে তা নিয়ে নিজের এঙ একাউন্টে সুনির্দিষ্ট বিবরণ তুলে ধরেছেন কলিবফ।

গত শনি ও রোববার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা ২১ ঘণ্টা ধরে চলা শান্তি আলোচনায় ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কলিবফ। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ও লেবানন ইসরায়েলের হামলা নিয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়। এঙ পোস্টে কলিবফ লিখেছেন, এক ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সাতটি দাবি করেছেন, এই সাতটির সবগুলোই মিথ্যা। এইসব মিথ্যা দিয়ে তারা যুদ্ধে জয়ী হয়নি আর এগুলো নিয়ে তারা নিশ্চিতভাবে আলোচনাতেও কোনো ফল পাবে না। অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে না। এই প্রণালি দিয়ে যেতে হলে ইরানের অনুমতি নিতে হবে এবং নির্ধারিত পথ ধরে পার হতে হবে। প্রণালিটি খোলা বা বন্ধ যাই থাকুক, এর নিয়মকানুন মাঠেই নির্ধারিত হবে, সামাজিক মাধ্যমে না। মিডিয়া ওয়ারফেয়ার আর জনমতকে প্রভাবিত করার কৌশল যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও ইরানি জাতি এই কৌশলে প্রভাবিত হবে না। আলাপআলোচনার প্রকৃত ও নির্ভুল সংবাদ জানতে (ইরানের) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের সামপ্রতিক সাক্ষাৎকার পড়ুন।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এমন দাবি করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, আমরা একসঙ্গে এটি (ইউরেনিয়াম) সংগ্রহ করতে যাচ্ছি। আমরা ইরানের সঙ্গে মিলে ধীরে ধীরে কাজটি করব। বড় যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে খনন শুরু করব এবং ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসব।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডসেন্টকম জানিয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌঅবরোধের ফলে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৩টি জাহাজকে মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজগুলো মার্কিন নির্দেশনা মেনে নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করে ইরানের দিকে ফিরে গেছে। গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি উপকূল ও বন্দরগুলোতে এই অবরোধ কার্যকর করা হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দেয়নি, তবে ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, সাময়িকভাবে কড়াকড়ি শিথিল করার সময় অন্তত ৯টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা সামগ্রিক পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সীমিত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে, তবে একইসঙ্গে দেশটির নেতাদের আচরণ নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান গত ৪৭ বছর ধরে যেমনটা করে আসছে, এখনও তারা কিছুটা চালাকি করছে। তিনি সতর্ক করে দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি না হলে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমিলেছে অর্থ, এবার খাল-নালা পরিষ্কারে মাঠে নামছে চসিক
পরবর্তী নিবন্ধএক্সপ্রেসওয়ের দুই সংকট