ইতিহাসে যার যা সম্মান তা দিতে হবে এবং ইতিহাস পাল্টানো ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জিয়াউর রহমানের নাম আপনি বাদ দিতে পারবেন না। তাকে ওই জায়গায় আপনাকে সম্মান দিতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে তার জায়গায় সম্মান দিতে হবে। আমি মনে করি এই জায়গায় কোনো ধরনের ইতিহাস পাল্টানো কখনো সম্ভব নয়। ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা উচিত নয়। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলবে, এবং আমরা সেই সত্যকেই ধারণ করতে চাই। কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা দিয়ে সত্যকে আড়াল করা সম্ভব নয়।
তিনি গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা ও সাহিত্য সম্মাননা পদক–২০২৬ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। নগরের কাজীর দেউড়ি চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে ‘স্বাধীনতা বইমেলা’র শেষ দিনে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এবার পদক পেয়েছেন ১৩ গুণী ও ৩ প্রতিষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস. এম. নছরুল কদির এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি সাহাব উদ্দিন হাসান বাবু।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জাতির ভিত্তি। এই ইতিহাসকে কোনোভাবেই বিকৃত বা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা, সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদান, সবকিছুই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ সকল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে তাদের যথাযথ মর্যাদায় মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নির্বাচন করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তাদের অবদানই ছিল প্রধান বিবেচ্য। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা অবদানকে মূল্যায়ন করেছি।
মেয়র বলেন, এবারের মেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছে, যা পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পেরে সিটি করপোরেশন আনন্দিত। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, আজ এখানে যাদের সম্মাননা দেয়া হয়েছে প্রত্যেকেই আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাদের মাধ্যমে আমাদের দেশ আলোকিত হয়েছে, সেবা পেয়েছে। তাদের অনুসরণ করে আরো যাতে আলোকিত মানুষ সৃষ্টি হয়, চট্টগ্রামের অঙ্গণ যেন আরো আলোকিত হয় সেই প্রত্যাশা থাকবে আমাদের।
পুরস্কার পেলেন যারা : স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পেয়েছে তিন প্রতিষ্ঠান ও ৮ গুণীকে মনোননয়ন দেয়া হয়। এছাড়া ৫ সাহিত্যিককে সাহিত্য পদক দেয়া হয়। স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পেয়েছেন– স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের জন্য প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আলম নোমান (মরণোত্তর), মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মো. একরামুল করিম, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নূর আহমদ চেয়ারম্যান (মরণোত্তর), চিকিৎসায় অবদানের জন্য ডা. এম এ ফয়েজ, সাংবাদিকতায় দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরী, ক্রীড়ায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, সঙ্গীতে শিল্পী আবদুল মান্নান রানা এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদানের জন্য শিল্পী বুলবুল আকতার।
স্বাধীনতা স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পাওয়া ৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমাজসেবায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পেয়েছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)।
এদিকে সাহিত্য সম্মাননা পদক পেয়েছেন গীতিকবিতায় ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, শিশু সাহিত্যে সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, প্রবন্ধ ও গবেষণায় হারুন রশীদ, কবিতায় শাহিদ হাসান ও কথাসাহিত্যে দৈনিক আজাদীর সিনিয়র সহ–সম্পাদক জাহেদ মোতালেব।
এতিকে পদক পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমার নিজের শহর চট্টগ্রাম। এই শহরের রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আজ আমাকে মহান স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পদক দিচ্ছে। এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের বিষয়। আমি ও মেয়র চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছি। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় আমি এখন একজন গণমাধ্যম কর্মী। পদক পাবার জন্য কখনো কাজ করিনি। চেষ্টা করেছি চট্টগ্রামের কথা, এই অঞ্চলের প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের কথা পত্রিকায় তুলে ধরতে। সেই চেষ্টার স্বীকৃতি হিসাবে আজকে এ পদক পেয়েছি বলে মনে করছি। এই স্বীকৃতি আমাকে চট্টগ্রাম নিয়ে আরো বেশি কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগাবে।














