তরুণ প্রজন্ম ও ‘ভেপিং’ মহামারি: প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি

স্বরূপ বিকাশ বড়ুয়া | শুক্রবার , ২৬ জুন, ২০২৬ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরকিশোরীদের মধ্যে ইলেকট্রিক সিগারেট বা ভেপিংয়ের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। প্রচলিত সিগারেটের বিকল্প এবং তুলনামূলক ‘কম ক্ষতিকর’এমন চটকদার ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের আড়ালে এটি এখন এক নতুন আসক্তিতে পরিণত হয়েছে।

ভেপিং নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ও বাস্তব চিত্র : ‘কম ক্ষতিকর’ ধারণার আড়ালে বড় ফাঁদ : অনেকেই মনে করেন ভেপিংয়ে তামাক পুড়ে ধোঁয়া তৈরি হয় না বলে এটি নিরাপদ। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ভেপের তরলে উচ্চমাত্রার নিকোটিন, প্রোপিলিন গ্লাইকল এবং বিভিন্ন কৃত্রিম সুগন্ধি থাকে, যা গরম হয়ে অ্যারোসল বা বাষ্প তৈরি করে। এই বাষ্প ফুসফুসের গভীর কোষে প্রবেশ করে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

আকর্ষণীয় ফ্লেভার এবং তরুণদের টার্গেট : ভেপিং কোম্পানিগুলো পুদিনা, আম, স্ট্রবেরি বা চকলেটের মতো আকর্ষণীয় ফ্লেভার ব্যবহার করে মূলত স্কুলকলেজের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে। ট্রেন্ড বা ফ্যাশন মনে করে কিশোরকিশোরীরা এতে জড়িয়ে পড়ছে, যা পরবর্তীতে তাদের মারাত্মক নিকোটিন আসক্তির ও সিবিডিএর পূর্ণরূপ হলো ক্যানাবিডিওল। এটি গাঁজা বা ক্যানাবিসযা লিকুইড নিকোটিনের সাথে মিশিয়ে কিছু তরুণ প্রজন্ম মাদকাসক্ত দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

নতুন রোগ ঊঠঅখওএবং স্বাস্থ্যঝুঁকি : চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইতোমধ্যে EVALI (E-cigarette or Vaping Product Use-Associated Lung Injury) নামক নতুন ফুসফুসের রোগ শনাক্ত হয়েছে, যা সরাসরি ভেপিংয়ের সাথে জড়িত। এছাড়া এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

ভেপিং প্রতিরোধে কিছু জরুরি ও কার্যকর ব্যবস্থা : এই নীরব মহামারি থেকে সমাজ এবং আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখনই বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন: আইনগত কঠোরতা ও নিষেধাজ্ঞা

আমদানি ও বিক্রি বন্ধ: বাংলাদেশে ইসিগারেট বা ভেপিং পণ্যের আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা জরুরি।

বয়স যাচাই ও নজরদারি: যেখানে এখনও এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, সেখানে কঠোর বয়স যাচাই নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে এর বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইন

সিগারেট যে সাধারণ সিগারেটের মতোই ক্ষতিকর, তা সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং পত্রিকায় প্রচার করতে হবে। তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটের মতো ভেপিং ডিভাইসের গায়েও এর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির ছবিসহ সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ভূমিকা :

পারিবারিক নজরদারি: সন্তানদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, বা তারা পকেট মানি কোথায় খরচ করছেসেদিকে অভিভাবকদের সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে।

স্কুলকলেজে কাউন্সিলিং: প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদক ও ভেপিং বিরোধী সেমিনার এবং কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এর কুফল সম্পর্কে জানতে পারে।

ধূমপান ছাড়ার সঠিক বিকল্প সহজলভ্য করা

যারা ধূমপান ছাড়ার জন্য ইসিগারেট বেছে নিচ্ছেন, তাদের বোঝাতে হবে যে এটি আসক্তি পরিবর্তনের কোনো সঠিক সমাধান নয়। ধূমপান ছাড়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ, নিকোটিন প্যাচ বা চুইংগামের মতো বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।

উপসংহার : ইলেকট্রিক সিগারেট বা ভেপ কোনো ফ্যাশন বা নিরাপদ বিকল্প নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করার একটি আধুনিক হাতিয়ার। এখনই যদি পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়বে। সুস্থ ও তামাকমুক্ত সমাজ গড়তে ‘ভেপ’কে এখনই ‘না’ বলুন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুশিক্ষার অভাবে স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নিয়েছে
পরবর্তী নিবন্ধআশুরার তাৎপর্য ও ইমাম হোসাইনের (র.) শাহাদাতের দর্শন