পরিবেশ সুরক্ষায় নাগরিক দায়িত্ব

রিনিক মুন

| বৃহস্পতিবার , ৪ জুন, ২০২৬ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ

এই শহরের মানুষ এখন খুব ব্যস্ত। এতটাই ব্যস্ত যে নিজের ফেলে দেওয়া ময়লাটার দিকেও দ্বিতীয়বার তাকানোর সময় নেই। সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া, দুপুরে যানজট, রাতে ক্লান্তি। এর মাঝেই খুব স্বাভাবিকভাবে একটি পানির বোতল গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হয়, বাসার ময়লা ড্রেনের পাশে রেখে দেওয়া হয়, দোকানের সামনে জমে থাকা আবর্জনা রাস্তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। তারপর একদিন বৃষ্টি নামে, শহর ডুবে যায়, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। আমরা জলাবদ্ধতা দেখি, কিন্তু ড্রেনের মুখে আটকে থাকা নিজের পলিথিনটা দেখি না।

বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ এখন শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি নাগরিক আচরণেরও সংকট। আমরা সাধারণত কারখানার ধোঁয়া, নদীদূষণ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু খুব কম সময়ই নিজেদের দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন করি। অথচ শহরের সবচেয়ে দৃশ্যমান দূষণ তৈরি হয় মানুষের ছোট ছোট দায়িত্বহীনতা থেকে। রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক, খালের মধ্যে জমে থাকা বর্জ্য, অকারণে বাজতে থাকা হর্ন কিংবা নির্মাণ কাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণে উদাসীনতা, সবকিছু মিলেই ধীরে ধীরে একটি শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা এখন নোংরার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছি। আগে ড্রেনের দুর্গন্ধে মানুষ নাক চেপে ধরত, এখন সেটিই শহরের স্বাভাবিক গন্ধ। আগে খেলার মাঠ হারিয়ে গেলে মানুষ প্রতিবাদ করত, এখন শিশুরা মোবাইলের পর্দার ভেতর বড় হচ্ছে। আগে গাছ কাটলে কষ্ট হতো, এখন মানুষ ছায়াহীন রাস্তাকেও উন্নয়ন বলে মেনে নেয়। পরিবেশ ধ্বংসের চেয়েও ভয়ংকর হলো, ধ্বংসকে স্বাভাবিক মনে করার এই অভ্যাস।

নাগরিক দায়িত্বের জায়গাটিই আসলে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক শুধু আইন মানেন না, নিজের কাজের প্রভাবও বোঝেন। তিনি জানেন, রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া একটি প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত খালে যায়, খাল থেকে নদীতে যায়, তারপর সেটিই জলাবদ্ধতা কিংবা দূষণের অংশ হয়ে ফিরে আসে। তিনি এটাও বোঝেন, অকারণে হর্ন বাজানো মানে শুধু শব্দ করা নয়, অন্য মানুষের ভেতরে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেওয়া।

বাংলাদেশে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাজারে গেলে এখনো প্রায় সব পণ্যই পলিথিনে দেওয়া হয়। ব্যবহারের পর সেগুলোর বড় অংশ ডাস্টবিনে নয়, রাস্তায় বা ড্রেনে পড়ে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ প্লাস্টিক বর্জ্য। কিন্তু আমরা খুব সহজেই সব দায় সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দিই। নাগরিক হিসেবে নিজের দায় স্বীকার করতে চাই না। যেন শহরটা শুধু ব্যবহারের জায়গা, রক্ষা করার নয়।

শব্দদূষণ নিয়েও একই চিত্র দেখা যায়। শহরের রাস্তায় অকারণে হর্ন বাজানো এখন অনেকের কাছে স্বাভাবিক আচরণ। হাসপাতালের সামনে, স্কুলের সামনে, এমনকি গভীর রাতেও শব্দ থামে না। অথচ এই শব্দ শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা নিয়ে খুব কম মানুষ ভাবেন। নাগরিক দায়িত্ব শুধু নিজের সুবিধা দেখা নয়, অন্য মানুষের স্বস্তির কথাও ভাবা।

আমাদের সমাজে পরিবেশ নিয়ে এক ধরনের অভিনয়ও আছে। সামাজিক মাধ্যমে মানুষ পরিবেশ দিবসের পোস্ট দেন, গাছ লাগানোর ছবি তোলেন, কিন্তু পরের মুহূর্তেই রাস্তার পাশে চায়ের কাপ ফেলে আসেন। সচেতনতার চেয়ে সচেতন দেখানোর প্রবণতাই যেন বেশি। ফলে পরিবেশ রক্ষার আলোচনা বাড়ছে, কিন্তু পরিবেশ রক্ষার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে না।

একটি শহর শুধু সরকারের কারণে নোংরা হয় না, নাগরিকের কারণেও হয়। আবার একটি শহর শুধু সরকারি উদ্যোগে সুন্দরও হয় না, সেটির জন্য দরকার দায়িত্বশীল মানুষ। কারণ রাষ্ট্র আইন তৈরি করতে পারে, কিন্তু নাগরিকের বিবেক তৈরি করতে পারে না। সেই কাজটি মানুষকেই করতে হয়।

হয়তো এই শহর একদিন আরও বড় হবে, আরও আধুনিক হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাসযোগ্য থাকবে কি? ভবিষ্যতের শিশুরা কি খোলা আকাশের নিচে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে? নাকি তারা বইয়ে পড়বে, একসময় শহরে নদী ছিল, গাছ ছিল, পাখি ছিল? তখন হয়তো আমাদের কাছে কোনো উত্তর থাকবে না। কারণ পরিবেশ একদিনে ধ্বংস হয় না, প্রতিদিন মানুষের ছোট ছোট দায়িত্বহীনতায় একটু একটু করে মরে যায়। আগামীকাল ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে আমাদের প্রত্যেককে অঙ্গীকার করতে হবে, যেন আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করি, যেন আমরা পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধমৌন দূরত্ব
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্ববাংলার সাংস্কৃতিক মিলনমঞ্চ