এক.
রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যত বিষয়ে আতংকিত মানুষেরা এই লেখাটি পাঠ করতে পারেন। আমি যখন সিডনি আসি তখন হাতেগোণা বাংলাদেশী অল্প কিছু বাঙালি এ দেশে।
অন্ন বস্ত্র বাসস্থান গাড়ি ইত্যাদি যোগাড় করা নিয়ে ব্যস্ত বাঙালির হাতে সময় কোথায় যে শিল্প চর্চা করবে? তারপর ও বাঙালির রক্তে ধমনীতে যে গান যে কবিতা যে দর্শন তা কি চাইলেই সে ছুঁড়ে ফেলতে পারে? পারে না। পারে না বলেই কন্ঠশিল্পী সিরাজুস সালেকিনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল প্রতীতি। ভাবা যায় আজ থেকে তিরিশ বছর আগে হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলার শুরু এই সংগঠনের। একেবারে গোড়ার দিকে যখন আমরা সুধা নিঝর নামে আমাদের শিল্প চর্চার দল গঠন করি নি তখন আমি মাঝে মাঝে প্রতীতিতে কবিতা পাঠ করতাম। তারপর অনেক কাল পর এই মাত্র কিছুদিন আগে তাদের এবারের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অনেক বছর পর যাওয়া।
বই মেলার প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধার নেহাল বারী আর আমি কয়েক মিনিটের বিলম্বে শুরুর পর্দা উন্মোচন দেখতে পাই নি। এটা আমাদের দৈন্য প্রতীতির বিজয়। তারা কাউকে বসিয়ে রাখতে পছন্দ করে না। সালেকিন ভাই ঘড়ির কাঁটা ধরে অনুষ্ঠান শুরু করার জন্য বিখ্যাত মানুষ। সে যাই হোক পৌঁছানোর পর শুরুতেই তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্য শুনে চমকে উঠেছিলাম। রাজনীতিও যা এমন ভাবে তুলে ধরে নি সেটাই তিনি তুলে ধরেছিলেন । কেন শিল্প সংস্কৃতির ওপর আক্রোশ কেন ছায়ানট উদীচী আক্রান্ত কেন বাউলেরা গান গাইতে পারেন না কেন সুফিবাস ভয়ে আছে তার সুনিপুণ ব্যাখ্যা এবং যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
এর সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কোথায়? আছে। ভালো ভাবেই আছে। প্রতীতি মূলত: রবীন্দ্রনাথের ওপর নির্ভরশীল বাংলা গান বাজনার দল। যে অনুষ্ঠানটির কথা বলছি তার শিরোনাম ছিল : অয়ি ভুবন মনমোহিনী। মা দেশ জননীকে এভাবে ডাকতে পারেন কেবল ই রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গানে তাঁর কবিতায় তাঁর চর্চায় পুষ্ট প্রতীতি সিডনিতে একটি রবীন্দ্র মহীরুহ। এই দলে সুমি মুন্নি ফারুক তনুজা হাবিব শুভ এরা এখন পোক্ত শিল্পী। গ্রন্থনা বর্ণনা আর কবিতা গানে প্রতীতি ফি বছর রবীন্দ্রনাথ কে স্মরণ করে। করতে করতে এখন এটা সুধি সমাজের অভ্যাসের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আমি জানি না দেশের বাইরে দুনিয়ার আর কোন কোন শহরে এমন ধারাবাহিক রবীন্দ্রচর্চা হয়? যে খানে যাই হোক সিরাজুস সালেকিন সিডনিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে তাঁর নাড়ির টানে ধরে আছেন। ঐ যে বললাম রবীন্দ্রনাথ কী থাকবেন? তার উত্তর প্রতীতির অনুষ্ঠানেই থাকে। তারা জানিয়ে দেয়, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কে আছেন এমন আপন আমাদের?
দুই.
বেশ ক‘ বছর আগের কথা। সিডনির বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের বৈশাখি মেলাটি তখন হতো অলিম্পিক ময়দানে। গুরুত্বপূর্ণ এই ভেন্যুতে গিয়ে সেবার দেখলাম আলো ঝলমলে মূল মঞ্চে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তারুণ্যের ঝলকানিতে পুনর্বার গীত হ ওয়া আধুনিক ধারায় নির্মিত রবীন্দ্রনাথের ‘ যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” বেজে চলেছে। যে যেখানে দাঁড়িয়ে খোলা গলায় মৃদূ কন্ঠে গলা মিলাচ্ছেন। সেই কুয়াশা ধূসরিত সন্ধ্যাটি আমার অনেকদিন মনে থাকবে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠিক এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাঠের এক কোণায়। জীবনে যে দেশে তিনি কখনো আসেন নি , অথচ তাঁর প্রাত:রাশে থাকতো যে দেশের মধু সে দেশে বসবাসরত বাঙালির তারুণ্য তাঁর কাছ থেকে সাহস নিয়ে বলছে… একলা চলো রে। প্রয়াত ড. আবদুর রাজ্জাক পরবর্তীতে শেখ শামীমুল হকের নেতৃত্বে চলমান এই মেলাটির সাথে বাংলা বাঙালি এবং রবীন্দ্রনাথের যোগ আছে । সে যোগটি কবি‘র গানের কথার মতো :
বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো / সেই খানে যোগ তোমার সাথে আমারো।
তিন.
খুব বেশী দিনের কথা না। শীতার্ত এক সন্ধ্যায় অগ্রজ গামা আবদুল কাদির আর আমি ছুটতে ছুটতে পৌঁছেছিলাম ক্যাম্বেলটাউনে। সে দিন সহৃদয় শফিকুল আলম ভাই না থাকলে অনুষ্ঠানে আমার কথা বলাই হতো না। অনুষ্ঠানটি ছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনকে ঘিরে চমৎকার এক আয়োজন। শফিক ভাই গাড়িতে তুলে নিয়ে গেলেও একটু বিলম্বেই পৌঁছেছিলাম আমরা। আমি কী বলেছিলাম সেটা মূখ্য বিষয় না মূক্য বিষয় ছিল পূরবী পারমিতা বোস, মনজুশ্রী ও অন্যান্য নারীরা মিলে সে দিন রবীন্দ্রনাথকে ডেকে এনেছিল প্রশান্তের তীর ঘেঁষা এই শহরে। গানে নাচে এবং রাবীন্দ্রিক কায়দায় রাতের খাবারে ঠাকুর বাড়ির কবি রবি ও তাঁর জীবন ফিরে পেয়েছিল সিডনির বাঙালি।
অমন গোছানো সুন্দর আর কেবল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠান খুব কম ই দেখেছি। সে অনুষ্ঠানে সদ্য গোঁফ গজানো এক তরুণের কন্ঠে গীত রবীন্দ্রনাথের গান শুনে চমকে গেছিলেন সবাই। নির্ভুল উচ্চারণ নিখুঁত সুর আর গায়কিতে আসর বাজিমাত করা তরুণকে মনে আছে কিন্তু তার নামটি মনে নাই। সে মনে থাক বা না থাক এটা নিশ্চিত তার মতো তরুণ তরুণীরাই বিদেশের মাটিতে কবিগুরুর আশ্রয় ও ভরসা।
চার.
বাংলাদেশে এখন রবীন্দ্রনাথের সময় ভালো যাচ্ছে না। কথায় কথায় তাঁকে অপমান করা তাঁর নাম বিকৃত করে ডাকাডাকি এসব চলছেই। নামী দাঞ্চি কথিত বুদ্ধিজীবী ছলিম কলিমরাও সুযোগ পেলেই দু কথা শুনিয়ে দেয়। অথচ এদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত রবীন্দ্রনাথের লেখা পাঠ করে প্রমিত বাংলা শেখা।
এবারের পঁচিশে বৈশাখের ঠিক আগে আগে দেশের এক সাংসদ বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ না কি ইংরেজদের তুষ্ট করে নোবেল বাগিয়েছিলেন। কিছু বলার দরকার দেখি না। শুধু প্রশ্ন জাগে আইনষ্টাইন বুঝলেন না, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বুঝলেন না, ইংরেজ কবিরা জানলেন না অথচ এই মূর্খ জেনে গেছে? রবীন্দ্রনাথ মোটামুটি সব বিষয়েই অবগত ছিলেন। তা না হলে এতো আগে কেন লিখে রাখবেন : যাহার তোমার বিষাইছে বায়ু নিভাইছে তব আলো /তুমি কী তাদের ক্ষমা করিয়াছ তুমি কী বেসেছো ভালো? এটা এখন প্রমানিত যতকাল বাংলা বাঙালি ও তার সংস্কৃতি প্রবহমান ততদিন রবীন্দ্রনাথও আছেন এবং থাকবেন।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট













