গ্যাসের সংকটের মাঝে দুই মাস পর কাফকো চালু

সার উৎপাদনে গুরুত্ব সিইউএফএল নিয়ে অনিশ্চয়তা ডিএপি সার কারখানা অচিরেই চালুর আশা

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ

দেশে গ্যাসের সংকট থাকলেও সার উৎপাদনের গুরুত্ব মাথায় রেখে প্রায় দুই মাস পর চালু করা হয়েছে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। তবে গ্যাসের অভাবে একইসাথে বন্ধ হওয়া সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) কবে চালু করা সম্ভব হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কাফকো চালু হওয়ায় অ্যামোনিয়া উৎপাদন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডাইঅ্যামোনিয়া ফসফেট (ডিএপি) ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড অচিরেই চালু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের গ্যাস সেক্টরের স্বস্তি বহুলাংশে নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত এলএনজির উপর। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে দেশে গ্যাসের যোগান কমতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আমদানি সংকটে পড়ে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দামও বেড়ে যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১৫ ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের শেষে তা ২৪ ডলারে গিয়ে ঠেকে। তবে যুদ্ধবিরতিসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দাম কিছুটা কমে বর্তমানে ১৬ থেকে ১৮ ডলারে ওঠানামা করছে।

এলএনজির যোগান কমে যাওয়ায় দেশের ৫৯টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্তত ১৮টিই ধুঁকছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর মধ্যে হরিপুর জিটিপিপি, ঘোড়াশাল (ইউনিট ৪ ও ৫), মেঘনাঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট এবং আশুগঞ্জের তিনটি ইউনিটসহ ১৪টি কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৭,৮৫৩ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে এগুলো থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ধারেকাছে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশে দৈনিক ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি আমদানি সংকটে থাকায় সরকার দেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের প্রয়োজনীয় গ্যাস দিতে পারছে না। চাহিদার ১২শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের স্থলে মাত্র ৯১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র বলেছে, সরকার স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এবং বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। দেশে প্রতিদিন এলএনজির যোগান দেওয়া হতো প্রায় ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট, যা গতকাল দেওয়া হয়েছে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাসের অভাবে দেশের সার কারখানাগুলোও ধুঁকছে। বিশেষ করে যুদ্ধ শুরুর পর গত ৪ মার্চ গ্যাসের অভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রামের কাফকো এবং সিইউএফএল সার কারখানা। দুটি কারখানা দৈনিক ১৭শ টন করে ইউরিয়া উৎপাদন করে। এই দুই কারখানায় সারের পাশাপাশি অ্যামোনিয়াও উৎপাদন করে, যা দিয়ে চলে ডিএপি সার কারখানা। কিন্তু কাফকো এবং সিইউএফএল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকটে পড়ে ডিএপি। মজুতে থাকা অ্যামোনিয়া দিয়ে মাসখানেক চালানোর পর ১৮ এপ্রিল ডিএপি সার কারখানাও বন্ধ হয়ে যায়।

দেশের কৃষিতে সারের মৌসুম চলছে। এখন ইউরিয়া সারের প্রচুর চাহিদা। এ অবস্থায় কারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকলে সারের মজুতে প্রভাব পড়বে। বিষয়টি চিন্তা করে সরকার সংকটে থাকলেও কাফকোকে দৈনিক ৪৮ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে প্রায় দুই মাস পর গতকাল থেকে চালু হয়েছে বহুজাতিক সার কারখানা কাফকো। গতকাল সীমিত পরিসরে গ্যাস নিলেও দিনদুয়েকের মধ্যে এটি পুরোদমে উৎপাদনে যাবে এবং পূর্ণমাত্রায় গ্যাস ব্যবহার করবে। কাফকো ঠিকভাবে উৎপাদন শুরু করলে এখান থেকে পাওয়া অ্যামোনিয়া দিয়ে ডিএপি সার কারখানাও উৎপাদন শুরু করবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

তবে দেশীয় সার কারখানা সিইউএফএল ঠিক কবে নাগাদ উৎপাদন শুরু করতে পারবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ না আসা পর্যন্ত সিইউএফএলকে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হবে না বলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানান। গতকাল চট্টগ্রামে ২০২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে। যা দিয়ে চট্টগ্রামের চাহিদার মোটামুটি যোগান দেওয়া হচ্ছে। কাফকো পুরোদমে উৎপাদন শুরু করলে চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা হবে বলে কর্ণফুলী গ্যাসের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে এলএনজি আমদানিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা কার্যক্রম ৬ মে থেকে শুরু হচ্ছে
পরবর্তী নিবন্ধবৈরী আবহাওয়ায় কয়েকটি ফ্লাইট ডাইভার্ট ও বাতিল