চট্টগ্রামে এখনো হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন শিশুরা। সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে এসব শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তারও শেষ নেই। চিকিৎসকরা বলছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে আসছেন এরমধ্যে ৮৫ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। এরমধ্যে অনেকে নিয়েছেন এক ডোজ টিকা। আবার টিকার নেয়ার পরেও আক্রান্ত হচ্ছেন শিশু। এদিকে দেশে সরকারিভাবে হামের কিটের সংকটের কারণে হাম আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। কিট সংকটের কারণে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনিস্টিউটের পরীক্ষাগার। সারাদেশের নমুনা জমে আছে পরীক্ষাগারটিতে। অন্যদিকে গতকাল দুপুরে ইউনিসেফ ও গাভির (গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স) মাধ্যমে হামের ১৫ লাখ টিকা দেশে এসে পৌঁছেছে। ফলে আপাতত টিকার সংকট দূর হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে গতকাল উপসর্গ নিয়ে আরো ৩২ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৯৪০ জন ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে ৮৯৬ জন নগরীর এবং ৪৪ জন উপজেলার। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭০৯ জন। অপরদিকে গতকাল নতুন করে একজন হামে আক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট হাম আক্রান্ত হয়েছে ৯১ জন এবং মারা গেছে এক শিশু। ঢাকায় পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে ৭৬০ জনের। গতকাল কারো নমুনা পাঠানো হয়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি–হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হলে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণই এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। তবে হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খায় এবং ভিটামিন ‘এ‘ ঘাটতি নেই তাদের হাম হওয়ার সম্ভাবনা কম। হাম প্রতিরোধের জন্য শিশুদের অপুষ্টি রোধ করা জরুরি। হাম এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। যাদের ভিটামিনের ঘাটতি হয় এবং অপুষ্টিতে ভোগে তাদের হাম হলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। নিয়মিত চিকিৎসায় বেশিরভাগ শিশু ভালো হয়ে যায়। হাম ছোঁয়াছে হওয়ার কারণে রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে আসছে, তাদের চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। দেশে এখন হামের টিকা এসেছে। টিকার কোনো সংকট নাই। বর্তমানে হামের ক্যাম্পেইন চলছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, আমাদের হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ শিশু টিকা নেয়নি। আবার কিছু শিশুর টিকা নেয়ার বয়স হয়নি, আবার কিছু শিশু এক ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। আবার দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এমন শিশুও আছে। আসলে কোনো টিকার কার্যক্ষমতা ১০০ শতাংশ না। টিকা নেয়ার পরেও হয়তো টিকা কাজ করেনি। শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়নি। এটি স্বাভাবিক ঘটনা।
সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবিস্থত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, হাম রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে বর্তমান টিকাদান কর্মসূচি চলছে। হামের উপসর্গের দিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে যদি কোনো শিশুর জ্বরের সাথে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং র্যাশ আসে তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এই রোগে নিউমোনিয়াও হতে পারে। বাসায় নিয়ে বসে থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। হাম রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। সাধারণত ৫ বছরের নিচে শিশুরা হামের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। দ্বিতীয় সারির ঝুঁকিতে থাকে ৫ থেকে ১৪ বছরের শিশুরা। তাই হামের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না।














