চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের গণশুনানি অসহায়দের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে। প্রতি সপ্তাহের বুধবার যেন একটু বেশিই প্রাণচাঞ্চল্য হয়ে উঠে জেলা প্রশাসকের কক্ষটি। নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জেলা প্রশাসকের কাছে নির্ধিদ্বায় বলছেন ছোট–বড় সব বয়সীরাই। জেলা প্রশাসকও তাদের সব কথা শোনেন। জানতে চান পরিবার, আয়–রোজগার, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও বসবাসের অবস্থা সম্পর্কে। প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিচনায় তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তাও তুলে দিচ্ছেন। গতকাল বুধাবরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নানা সমস্যা নিয়ে জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে হাজির হয়েছেন তিন মেয়েকে নিয়ে মাথা গোঁজার স্থায়ী কোন ঠাঁই না থাকা বিধবা সারাবান তাহুরা। হাজির হয়েছিলেন সন্তানের হার্নিয়া অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে হিমশিমে পড়া রাজীব দাশ। বাবা–মাকে হারানো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মিজান মিয়া অর্থাভাবে তার উচ্চশিক্ষা থমকে যাওয়ার শঙ্কা’র কথা বলেছেন। আবার কেউ প্যারালাইসিস, হৃদ্রোগ কিংবা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে না পরার কথা গণশুনানিতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা’র কাছে তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসনসূত্র জানায়, ভিন্ন ভিন্ন সংকট নিয়ে গণশুনানিতে হাজির হওয়া লোকজনের অসহায়ত্বের আবেদন গ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। একে একে আবেদনকারীদের কথা শোনেন তিনি। জানতে চান তাদের পরিবার, আয়–রোজগার, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও বসবাসের বর্তমান অবস্থা। পরে প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
গণশুনানিতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে রয়েছেন বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের সারাবান তাহুরা। প্রায় দুই বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন মেয়েকে নিয়ে তার জীবন বদলে যায়। তার মেয়েদের বয়স ১০, ৮ ও ৪ বছর। স্বামী পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। সেখানে নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় তিন মেয়েকে নিয়ে দেশে ফেরেন সারাবান। দেশে ফিরে প্রথমে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের সহযোগিতায় প্রায় এক বছর আশ্রয় পান। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পূর্ব চাম্বল আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে সাময়িকভাবে থাকার সুযোগ হয়। কিন্তু ঘরটি অন্য একজনের নামে বরাদ্দ থাকায় সেটিও ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে তাকে। নিজের কোনো জমি বা বসতভিটা নেই সারাবানের। সেলাইয়ের কাজ করে তিন মেয়ের ভরণপোষণ চালান। সন্তানদের নিয়ে আবারও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় নিজ এলাকা বাহারছড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারি খাস জমিতে একটি ঘর নির্মাণ বা পুনর্বাসনের আবেদন নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে যান তিনি। গণশুনানিতে সন্তানের চিকিৎসার আবেদন নিয়ে এসেছিলেন চন্দনাইশের রাজীব দাশ। তার শিশুসন্তান জন্মগত হার্নিয়ায় আক্রান্ত। অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সন্তানের চিকিৎসা যেন অর্থের অভাবে আটকে না থাকে, সে জন্য জেলা প্রশাসকের সহায়তা চান তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মিজান মিয়ার লড়াইটা আবার ভিন্ন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাবা–মা দুজনই মারা গেছেন। পরিবারে তার পড়াশোনার ব্যয় বহনের মতো উপার্জনক্ষম কেউ নেই। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার কারণে পাঠ্যবই অডিও আকারে রেকর্ড করে পড়তে হয় মিজানকে। পরীক্ষায় প্রয়োজন হয় শ্রুতিলেখকের। এসব কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীর তুলনায় তার পড়াশোনার খরচও বেশি। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় এককালীন অনুদানের আবেদন করেন তিনি। চিকিৎসার অর্থ চেয়ে গণশুনানিতে এসেছিলেন পটিয়ার রাজমিস্ত্রি আজিজুল হকও। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না তিনি। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলের সংসারের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ফটিকছড়ির হাফেজ মো. আবু তাহের ২০২২ সালে স্ট্রোক করার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি, কথা বলতেও পারেন না। নিজের জায়গা–জমি নেই, উন্নত চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই। সেই অসহায়ত্বের কথা জানাতেই জেলা প্রশাসকের কাছে এসেছিলেন তিনি। হৃদ্রোগে আক্রান্ত পিয়া আকতারের নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি রয়েছে অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের ভরণপোষণের চিন্তা। দুর্ঘটনায় ডান পা পুড়ে যাওয়া উম্মে সানিয়া পুষ্প তিন মাস ধরে অসুস্থ। ছেলে সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে তার। আর্থিক সংকটে থাকা লুবনা আকতার ও হাজেরাও সহায়তার আশায় আবেদন নিয়ে গণশুনানিতে উপস্থিত হন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতি বুধবারের ন্যায় আজকেও (গতকাল) প্রত্যেকের কথা আলাদাভাবে শোনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শুধু আবেদনপত্রে লেখা তথ্য নয়, তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও সরাসরি জানতে চান তিনি। কারও চিকিৎসা, কারও পড়াশোনা, আবার কারও পরিবার চালানোর সংকট বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আমাদের সাপ্তাহিক গণশুনানিগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন জীবনসংগ্রামের গল্প উঠে আসে। কারও চাওয়া একটি নিরাপদ ঘর, কারও সন্তানের চিকিৎসা, কারও আবার উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। তিনি বলেন, সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। তবে অসহায় মানুষগুলোকে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া, তাদের সংকটের কথা শোনা এবং সেই সাথে জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তার ব্যবস্থা করছি আমরা।












