ফটিকছড়ির সমিতিরহাটের দরিদ্র কৃষক আলম পরিত্যক্ত জমিতে গরুর জন্য ঘাস কাটছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি পাগলা কুকুর তার হাত কামড়ে মাংস তুলে নেয়। গুরুতর আহত আলমকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে জলাতঙ্ক রোগের অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন দেন।
কৃষক আলমের মতো দেশে প্রতিনিয়ত কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়ে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। জলাতঙ্ক রোগ হলে মৃত্যু অবধারিত। তবে পূর্ণ ডোজ টিকা নিলে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে বাঁচা যায়। এমন পরিস্থিতিতে জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে সতেচনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক বা র্যাবিস দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার ১২টি দেশে দিবসটি পালন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্ক রোগের জন্য র্যাবিস ভাইরাস বহনকারী প্রাণী দায়ী। আমাদের দেশে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগ হয় কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের কারণে। বাকি ২ থেকে ৩ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগ হয় বিড়াল, শিয়াল কিংবা অন্যান্য বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে। সাধারণত জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ ৯ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। এছাড়া জীবনের যেকোনো সময়ে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। তাই কেউ যদি মনে করে ৩ মাস বা ৯০ দিন হয়ে গেছে, আর জলাতঙ্ক হবে না, এটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে জলাতঙ্কের র্যাবিস ভ্যাকসিন বা টিকার সংকট নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলাতঙ্ক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, এর প্রতিরোধের উপায়, পশুকে টিকা দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য সঠিক তথ্য অপরিহার্য। তথ্য ছাড়া এ রোগের গুরুতর প্রকৃতি সম্পর্কে জানা যাবে না। সেক্ষেত্রে অন্যকেও সচেতন করা সম্ভব হবে না। প্রতি বছর বিশ্বে হাজার হাজার মানুষ ও প্রাণী জলাতঙ্কে মারা যাচ্ছে। তাই সঠিক তথ্য ব্যবহার করে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ আজাদীকে বলেন, জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশেষ করে কুকুর, বিড়াল বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী থেকে দূরে থাকতে হবে। এছাড়া যারা ঘরে কুকুর–বিড়াল লালন পালন করেন ওইসব ক্ষেত্রে নিয়মিত টিকা দিতে হবে। অন্যদিকে কেউ যদি প্রাণী দ্বারা কামড় বা আচড়ে আক্রান্ত হন, তবে দ্রুত আক্রান্ত স্থানে ১৫ মিনিট ধরে সাবান পানিতে ধুতে হবে। এতে ৮০ শতাংশ জলাতঙ্কের ভাইরাস মরে যায়। পরবর্তীতে দ্রুত কোনো ধরনের পল্লী চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। ডাক্তার আক্রান্তের ধরন অনুযায়ী ক্যাটাগরি করে চিকিৎসা শুরু করবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মডার্ন টিকার পদ্ধতি চালু করেছে। এটিতে তিনটি ডোজ নিয়ে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে পূর্ণ ডোজ টিকা দিতে হবে। যেহেতু এই রোগে মৃত্যু নিশ্চিত, তাই এক ডোজ টিকা দেওয়াটা বিপদ বয়ে আনতে পারে।
তিনি বলেন, দুই ধরনের র্যাবিস বা জলাতঙ্ক রয়েছে। একটি হচ্ছে ফিউরিয়াস র্যাবিস, আরেকটি হচ্ছে প্যারালাইটিক র্যাবিস। ফিউরিয়াস র্যাবিস ভয়ঙ্কর। এটির ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্যারালাইটিক র্যাবিস অতটা ভয়ঙ্কর নয়। এতে লক্ষণ সবগুলো প্রকাশ পায় না। তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, কুকুর, বিড়াল কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ের পরে যদি সেই জায়গায় যদি চুলকায় তবে ধরে নিতে হবে এটি জলাতঙ্ক রোগ। জলাতঙ্ক রোগীরা পানি দেখলে ভয় পান। আলো কিংবা বাতাসের সংস্পর্শে এলে এ ভীতি আরো বেড়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিঃসৃত হয়। অস্বাভাবিক আচরণ করে এবং মানুষ দেখলে কামড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে কার্ডিয়াক হয়ে অ্যারেস্ট হয়ে মারা যায়। এটি এমন এর রোগ যার মৃত্যু অবধারিত।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ও কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. একরাম হোসেন আজাদীকে বলেন, জেনারেল হাসপতালে বর্তমানে র্যাবিস ভ্যাকসিনের কোনো সংকট নেই। প্রতিদিন রোগীরা সরকারিভাবে এখানে বিনামূল্যে টিকা নিতে পারছেন।













