আন্তর্জাতিক শিশু ক্যান্সার দিবস

ডা. ইন্দিরা চৌধুরী | বুধবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ

রোকসানা (রূপক নাম) ১ বছর ৩ মাস বয়স, এসেছে কক্সবাজার থেকে। গত ২০২৫ দিন আগে তার মা খেয়াল করে কোমরের পিছন দিকে একটা শক্ত চাকার মতন। কিন্তু কোনো ব্যথা নেই। প্রথম দিকে পাত্তা না দিলেও মনের অগোচরে ভয় থেকেই শিশু সার্জারি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং সিটি স্ক্যান পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারেন তাঁর একমাত্র কন্যার শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণঘাতী ক্যান্সার রোগ। কয়েক দিনের মধ্যেই চাকাটি এতটাই বেড়ে উঠে যে উপরের চামড়া চকচকে হয়ে উঠে তার উঠে বসার সক্ষমতা হারিয়ে যায়। যতক্ষণে কেমোথেরাপি শুরু হয় অনেক দেরী হয়ে গেছে; শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়িয়ে গেছে ক্যান্সারের জীবাণু। আজকের আলোচ্য বিষয় শিশু ক্যান্সার।

ক্যান্সারশুদ্ধ বাংলায় আমরা বলা হয় কর্কট রোগ। আমরা সাধারণ মানুষজন একে মরণঘাতী রোগ বলি।

প্রতিবছর সারা বিশ্বে ক্যান্সার এ প্রাণ হারাচ্ছে লাখো মানুষ। ক্যান্সার যে শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের হচ্ছে তা নয়; শিশুরাও নিস্তার পাচ্ছে না এই ঘাতক ব্যাধি থেকে। WHO রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৪,০০,০০০ শিশুকিশোর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু সুস্থতার হার আশানুরূপ নয় মধ্যম বা নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে। WHO মোতাবেক সুস্থতার হার বিশ শতাংশেরও কম।

তাই WHO টার্গেট গোল আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ন্যুনতম ৬০% সারাবিশ্বে শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত রুগীদের ব্যথা ও দুর্ভোগ লাঘব করবে।

আর সেই লক্ষেই শিশু ক্যান্সার রোগের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে ২০০২ সালে childhood cancer international (CCI) ১৫ই ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক শিশু ক্যান্সার দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছে। আর তাঁরই ধারাবাহিকতায় সারা বিশ্বে প্রতিবছর এই দিনে শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত খুদে যোদ্ধা এবং এই যুদ্ধ জয়ী বীর (survivor) ও তাদের পরিবারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিশু ক্যান্সার দিবস পালিত হয়ে আসছে। CCI ১৭০ টিরও বেশি organization, ক্যান্সার সাপোর্ট গ্রুপ এবং ক্যান্সার সারভাইভারদের association ভিত্তিক নেটওয়ার্ক যা বিশ্বের ৯৩ টি দেশে ছড়িয়ে আছে। CCI এর উদ্দেশ্য যে, সকল ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুই যেন সর্বোচ্চ মানসিক সমর্থন ও চিকিৎসা পায় সে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন বা যাই অর্থনৈতিক অবস্থা হোক বা যেই সামাজিক অবস্থাই হোক বা কোন বর্ণভেদ যেন সর্বোচ্চ প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়। কারণ এই ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন সকল যোদ্ধার প্রয়োজন মেডিকেল, অর্থনৈতিক ও মানসিক সমর্থন।

এবারের ICCD২০২৩’র থিম Better Survival is Achievable throughtheirhandsi ক্যান্সার চিকিৎসা একটি টিম ওয়ার্ক। এই টিম এ শুধু যে একজন শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ থাকবেন তা নয়; এই টীম এ থাকবেন পিডিয়াট্রিক সার্জন, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, পুষ্টিবিদ সর্বোপরি পারিবারিক সাপোর্ট।

ICCD এর মুখ্য উদ্দেশ্য হল শিশু ক্যান্সারের সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরিষেবার মান উন্নয়ন, মৃত্যুপথযাত্রী রুগীদের ব্যথা কমানো, ক্যান্সার রোগ আক্রান্ত রুগী ও পরিবারের সার্বিক সমর্থন দেয়া।

বাংলাদেশেও শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত রুগীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়; দেশের কোন ক্যান্সার রেজিষ্ট্রি নেটওয়ার্ক বা কোন পরিসংখ্যান নেই যাতে প্রতিবছর কত নতুন শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত হচ্ছে বা কতো শিশু মৃত্যুবরণ করছে এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে। সার্বিকভাবে ক্যান্সারকে দুইভাগে ভাগ করতে পারি সলিড টিউমার আর ব্লাড ক্যান্সার। শিশুদের ব্লাড ক্যান্সার এবং ব্রেইন টিউমারের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও রয়েছে লসিকা গ্রন্থিরটিউমার, লিভার টিউমার, কিডনি টিউমার, হাড়ের টিউমার, চোখের টিউমার, এছাড়াও রয়েছে নিউরব্লাস্টোমা, জার্মসেল টিউমার (ভ্রূণ কোষের টিউমার) সহ আরও অনেক বিরল টিউমার।

শিশু ক্যান্সারের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য, চিকিৎসা এবং চিকিৎসা পরবর্তী পরিণতি প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ ভাবেই আলাদা। তাই শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত হলে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থ্যা সম্পন্ন হাসপাতালেই চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন। দেশে প্রধান কিছু সরকারি এবং গুটিকয়েক বেসরকারি হাসপাতালে এই বাবস্থ্যা রয়েছে।

আমাদের চট্টগ্রামও পিছিয়ে নেই ক্যান্সার চিকিৎসাতে; এই শহরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে শিশু ক্যান্সারের চিকিৎসা হচ্ছে। এই হাসপাতালে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ ক্যান্সার হাসপাতাল ও তৈরি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আন্তর্জাতিকমান সম্পন্ন true Beam রেডিয়েশন মেশিন ও স্থাপন করা হবে। এই বছর জুলাই মাসে এই ক্যান্সার হাসপাতাল চালু হলে সুবিধা বঞ্চিত এই শহরের মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে এই দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা। আর ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে রোগীর পরিবারকে দেশের বাইরে ছুটে যেতে হবে না এটাই আশা রাখি আমরা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শিশু ক্যান্সার ও রক্ত রোগ বিভাগ,

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজ, আগ্রাবাদ চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে