জাতীয় অর্থনীতির ৮০ শতাংশের বেশি আয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এ কারণেই চট্টগ্রামকে বলা হয় জাতীয় অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম। আমদানি–রফতানি বাণিজ্যে ৯০ শতাংশের বেশি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। এটি দেশের প্রধান বন্দর হওয়ায় এ বিভাগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বৃহত্তম উৎপাদনমুখী শিল্প–বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে প্রকাশ, অর্থনৈতিক সমপ্রসারণে ঢাকা বিভাগের প্রবৃদ্ধি যেখানে ২৪ শতাংশ, সেখানে চট্টগ্রামে এ হার ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। অথচ এ বিভাগের উৎপাদনমুখী শিল্পে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত, মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশে অর্থনৈতিক ইউনিটে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকায় দেশী–বিদেশী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে প্রায় ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪০টি, যা ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৬২৯টি। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে বিভাগটিতে অর্থনৈতিক সমপ্রসারণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শহরে ৪০ শতাংশ ইউনিট রয়েছে। তবে ঢাকা বিভাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে এর অর্ধেকেরও কম বা ২৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৩টি, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ২৮৪টিতে।
শুমারির তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৪ অর্থাৎ ১০ বছরে দেশের উৎপাদন খাতে অর্থনৈতিক ইউনিট গড়ে উঠেছে ১১ লাখ ২ হাজারটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে, যা প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৮টি বা ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে গড়ে উঠেছে ২ লাখ ইউনিট। এছাড়া রাজশাহীতে ১ লাখ ৪৫ হাজার ও বরিশালে ৫৮ হাজার ইউনিট রয়েছে। তবে এসব উৎপাদন কেন্দ্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত।
শুমারি অনুযায়ী, চট্টগ্রামে উৎপাদনমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ। দেশের কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশই পরিবাহিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তবুও বিভাগটিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কম থাকার পেছনে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আধিপত্যকে কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ঘাটতি কমানো না গেলে চট্টগ্রাম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার ফলে, আমরা কর্মসংস্থান থেকেও পিছিয়ে পড়ছি। বিশ্বে প্রযুক্তিভিত্তিক চাকরি সবচেয়ে বেশি তৈরি হচ্ছে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডাটা সায়েন্স, এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি খাতে। অথচ ভারতীয় তরুণরা আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল ভূমিকা রাখছে। সেখানে আমাদের তরুণরা মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মস্থলে প্রযুক্তি আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সমগ্র বিশ্ব যখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক হারে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে চলেছে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো খুব প্রাথমিক পর্যায়ের এইচআরআইএস (হিউম্যান রিসোর্স ইনফরমেশন সিস্টেম), অ্যাটেনড্যান্স ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকসেস কন্ট্রোল সিস্টেম কিংবা পেরোল ম্যানেজমেন্ট নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে চট্টগ্রাম পিছিয়ে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি দেখছেন তাঁরা।
দেশের সিংহভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো চট্টগ্রামনির্ভর। আমদানি–রফতানির প্রধান কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা মানে এখানকার উৎপাদন খাত বৈশ্বিক পর্যায়ের সঙ্গে সংযোগ করতে পারছে না। এর একটি কারণ চট্টগ্রামে উৎপাদন খাতের সঙ্গে জড়িত ইউনিটগুলোর ৬০ শতাংশই গ্রামীণ পর্যায়ের। এছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের। ফলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। অর্থনৈতিক সুযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন যদি সমভাবে বিস্তৃত না হয়, তাহলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুষম আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত সব খাতকে বদলে দিচ্ছে, সেখানে এ বাস্তবতায় প্রযুক্তি খাতে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প–সব জায়গায় প্রযুক্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তার পরিকল্পনা এখনই দরকার।









