প্রবাহ

হজের দিন আরাফাতে যোহর ও আছর পড়া নিয়ে বিতর্ক

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ২২ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

হজের তিন ফরজ। তৎমধ্যে ৯ যিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের অন্যতম ফরজ। বাকী দুই ফরজ হলহজের উদ্দেশ্যে এহরাম পরিধান করা এবং ১০১২ যিলহজের মধ্যে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করা।

বিগত ১০/১২ বছরের ব্যবধানে হজের দিন আরাফাতে যোহর ও আছরের জামাত পড়া নিয়ে আমাদের দেশের ধর্মীয়জনের কাছে মত পার্থক্য ব্যাপকতা লাভ করে। যা আগে তুলনামুলক মতপার্থক্য কম ছিল ।

আল্লাহর রাসূল (.) ৯ যিলহজ সকালে মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে আরাফাতের নিকটতম স্থানে অবস্থান করেন। অতঃপর আরাফাতে প্রবেশ করে খোতবা দেন। যাকে বিদায় হজের ভাষণ বলা হয়। এর পরপর এক আজান দুই একামতে দুই রাকাত করে যোহর ও আছরের কছর নামাজের ইমামতি করেন। এরপর জবলে রহমতে গিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৫/৬ ঘণ্টা মহান আল্লাহপাকের এবাদতে মশগুল থাকেন।

বাংলাদেশের হজের কোটা ১ লাখ ২৭ হাজার জনের। করোনা মহামারীর আগে কোটাপূর্ণ হয়ে অনেক হজযাত্রী অপক্ষেমাণ তালিকা থাকত হজে গমনের উদ্দেশ্যে।

২০২০ ও ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর পর সৌদি সরকার হজ ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজান। এতে হজের ব্যয় দ্বিগুণের মত বেড়ে যায়। এতে আমাদের বাংলাদেশে কোটাপূর্ণ হচ্ছে না। গত ২০২৪ ও ২০২৫ এবং চলতি ২০২৬ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা তিন ভাগের এক ভাগ কমে হজযাত্রীর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৮০ হাজার জন বা কম বেশি। এই ৮০ হাজার জন বাংলাদেশী হাজী আরাফাতের তাঁবুতে অবস্থান করে হজপালন করতেছেন এবং করবেন। মনে হয় না শতে ২/১ জন মসজিদে নমেরায় যাচ্ছেন। মসজিদে নমেরায় গিয়ে খোতবা শুনে এবং যোহর আছর জামাত পড়লে কোন মতভেদ নেই। সাওয়াবও বেশি। হজের সুন্দর পরিচ্ছন্ন হবে বলে মনে করি। কিন্তু হজযাত্রী অবস্থান করতেছেন আগেকার আমলে মোয়াল্লেম, বর্তমানকালে সার্ভিস সেন্টারের তাঁবুতে। একেক তাঁবুতে ৫/৭ শত জন বা কম বেশি হজযাত্রী অবস্থান করেন। এতে দেখা যায় কোন কোন তাঁবুতে এক আজান দুই একামতে মসজিদে নমেরার নিয়মে পড়তেছে পরপর কছর হিসেবে। আবার এও দেখা যাবে যোহরের টাইমে যোহর আছরের টাইমে আছর পড়তেছেন দুই রাকাত হিসেবে কছর হিসেবে। আবার কোন কোন তাঁবুতে এও দেখা যাবে যোহর টাইমে যোহর আছরের টাইমে আছর মুকিম হিসেবে চার রাকাত করে পড়তেছেন।

বিষয়টি স্পর্শকাতর। হজের তিন ফরজ হলেও আরাফাতে অবস্থানকে হজ বলা হয়। এর মূল সময় হল ৯ যিলহজ সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া থেকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান করা ওয়াজিব। আরাফাতে অবস্থানকালে সূর্য অস্ত যাবে। কিন্তু মাগরিব পড়া যাবে না। মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে মুজদালেফায় গিয়ে এশার টাইমে এক আজান দুই একামতে মাগরিব ও এশা পরপর। ৯ যিলহজ আরাফাতে এহরাম অবস্থায় অবস্থান করতে না পারলে তার হজ হল না।

৯ যিলহজ আরাফাতে অবস্থান করা এত বেশি গুরুত্ব যে সৌদি সরকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হজযাত্রীকে আরাফাতে নিয়ে আসে। শারীরিক প্রতিকূলতা বা অন্য কোন অজুহাতে ৬/৭ ঘণ্টা অবস্থান করতে না পারলেও ৯ যিলহজ এই সময়ের মধ্যে ১ মিনিটের জন্য হলেও ঘুরে আসতে হবে এহরাম অবস্থায়। ৯ যিলহজ আরাফাতে যাদেরকে এহরাম বিহীন দেখা যাবে বুঝতে হবে তারা হজ করতেছেন না। হজযাত্রীর সেবায় নিয়োজিত।

এখন প্রশ্ন হলএই রকম একটি হজের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের দেশের ধর্মীয় জগত আরাফাতে মাত্র দুই ওয়াক্ত ফরজ নামাজে বড় ধরনের ইখতেলাফ তথা মতপার্থক্য স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা বিগত ১০/১২ বছর থেকে ব্যাপকতা লাভ করে। জানি না আগামীতে আরও কি হয়। ইহা দুঃখের বিষয় আফসোসের বিষয়। প্রায় ৬/৭ লাখ বা কম বেশি টাকা খরচ করে হজ করতে যাওয়া হয়। ৪০ দিনের সফর, কষ্টের সফর। ফরজ এবাদতের সফর। অধিকাংশ হজযাত্রী ৯ যিলহজ জীবনে একবারই আরাফাতের ময়দানে যাবেন এবং জীবনে একবারই আরাফাতে যোহর ও আছরের নামাজ পড়বেন। এখন এই নামাজ নিয়ে বাংলাদেশী ৮০ হাজার হজযাত্রীর মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। ধর্মীয় একগ্রুপ বলে আমাদেরটা ঠিক সেই মতে নামাজ পড়বেন। ধর্মীয় আরেক গ্রুপ বলে এই মতে যোহর ও আছরের নামাজ পড়বেন। আমাদের মতই ঠিক।

সৌদি সরকার বিশ্বব্যাপী কাফেলা এজেন্সী প্রথা প্রবর্তন তথা হজপালনকে নিয়মতান্ত্রিকে এনেছে ২০০০ সাল থেকে। তার আগে হজপালন উন্মুক্ত ছিল। সৌদি আরবে বিশ্ব থেকে স্রোতের মত মানুষ ঢুকতে শুরু করে অনেকটা ১৯৮০ এর দশক থেকে। ফলে হজযাত্রী সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। যেহেতু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী মুসলিমেরা হজ করতে পবিত্র মক্কায় চলে আসেন। ১৯৯০ এর দশকে মনে হয় ৩০৪০ লাখ বা তারও বেশি নরনারী হজ করেন। ৫/৭ কি.মি দৈর্ঘ্যের মিনায় পায়ে হাঁটার উপরে সেডের নিচে ৬/৭ লাখ প্রবাসী নরনারী অবস্থান নেয়। প্রবাসীরা বিদেশ থেকে আগত মোয়াল্লেমের নিয়ন্ত্রণে মিনাআরাফাতের তাঁবুতে অবস্থান করে হজ করে না। প্রবাসীরা হজ করতেছেন পায়ে হেঁটে বা লোকাল গাড়ি নিয়ে নিজ উদ্যোগে। প্রবাসীদের লাখ লাখ নরনারী মিনা থেকে আরাফাত গমন করেছেন পায়ে হেঁটে। মসজিদের নমেরা বা আশেপাশে অবস্থান নিতেন।

প্রবাসীদের পাশাপাশি বাংলাদেশী হজযাত্রীর অনেকে মিনা থেকে আরাফাত পায়ে হেঁটে হজ করেন। মিনা থেকে আরাফাত ৬টি প্রশস্ত মসৃণ রাস্তা রয়েছে। তৎমধ্যে একটি হল প্রায় ১ শত ফুট প্রস্থ পায়ে হাঁটা হজযাত্রীর জন্য। এই রাস্তার দুইপাশে ১/২ শত মিটার অন্তর অন্তর বসার ব্যবস্থা রয়েছে, রয়েছে রাস্তার দু’ধারে পানি খাওয়ার ব্যবস্থা।

মিনা থেকে এই রাস্তা দিয়ে আরাফাতে রওনা হলে এই পায়ে হাঁটা রাস্তারধারে কয়েকতলা বিশিষ্ট উচ্চতায় প্রকান্ড এক দালান। এই দালানে লাখ লাখ খাবার প্যাকেট জমা করে রাখা হয়। ৯ যিলহজ সকাল থেকে এই দালানের নিচে কয়েকদিক দিয়ে হজযাত্রীগণের মধ্যে খাবার প্যাকেট বিলি করা হয়। জানি না এই ব্যবস্থা এখন আছে কিনা। পায়ে হাঁটা রাস্তাটি গিয়ে পৌঁছেছে আরাফাতের মসজিদে নমেরার পূর্ব সংলগ্ন। মসজিদে নমেরায় পৌঁছার আগে ট্যাপের পানি দিয়ে গোসলও করা যায় যা সুন্নত। মসজিদে নমেরার অভ্যন্তরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে ফ্লোরে কার্পেটের উপর আরামে অবস্থান করা হয়।

আল্লাহর রসূল (.)’র অনুকরণে অনুসরণে এখানে খোতবা শুনা এক আজান দুই একামতে কছর হিসেবে যোহর ও আছর জামাত পড়া হয়। এতে কোন মতপার্থক্য নেই সব মতাদর্শ একমত। পায়ে হেঁটে আরাফাতে পৌঁছে কোটি কোটি সাওয়াবও কামানো গেল। মসজিদে নমেরার অভ্যন্তরে আরামে অবস্থানও করা গেল, সূর্যাস্তের পর হজযাত্রী নরনারী স্রোতের সাথে সুন্নত মতে মুজদালেফায় পৌঁছা গেল। আরও কোটি কোটি সাওয়াব যোগ হল। মনের ভিতর প্রশান্তিও লাভ করা গেল। মহান আল্লাহপাক এভাবে বহুবার পায়ে হেঁটে হজ করার তাওফীক দিয়েছেন। ঐ সময় দেখতে পেয়েছিলাম বৃদ্ধ মহিলা অনেক পঙ্গু বৃদ্ধ মানুষ গণস্রোতের সাথে পায়ে হেঁটে হজ করেছেন।

ইচ্ছা থাকলে সক্ষম যে কোন ব্যক্তির জন্য পায়ে হেঁটে হজ করা সহজ। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশীগণের মধ্যে পায়ে হেঁটে হজ করার প্রবণতা মনে হয় একদমই কমে গেছে।

৯ যিলহজ মসজিদে নমেরায় গিয়ে যোহর আছর নামাজ পড়তে পারাটা অতীব উত্তম। যে কোন সক্ষম ব্যক্তির জন্য কঠিন কোন বিষয় নয়। সচেতন হলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বস্তুতঃ এহরাম অবস্থায় ৯ যিলহজ সূর্য হেলার পর আরাফাতে অবস্থান হজের প্রধান ফরজ। এখানে যোহর ও আছর দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়া হয়। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আমরা যোহর ও আছরের নামাজ পড়া নিয়ে ধর্মীয় জগতে মতপার্থক্য মতানৈক্যর সম্মুখীন। জানি না আগামীতে আমাদের ধর্মীয় জগৎ এক হতে পারবে কিনা!

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের তারুণ্য : আশা ও হতাশা