বাংলাদেশে মাছ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী–নালা, হাওর–বিল, খাল, পুকুর–দীঘি, ঘের ও বঙ্গোপসাগর মিলিয়ে দেশে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে পুকুর, দীঘি ও খামারভিত্তিক মাছ চাষ থেকে। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই এখন আসছে বদ্ধ জলাশয়ভিত্তিক চাষাবাদ থেকে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ৩০ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি এসেছে পুকুর, দীঘি, ঘের ও অন্যান্য বদ্ধ জলাশয় থেকে। মোট উৎপাদনে এ খাতের অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে নদী, হাওর, বিল, খাল, বন্যাপ্রবাহ এলাকা ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাশয় থেকে উৎপাদিত হয়েছে ১৫ লাখ টনের বেশি মাছ, যা মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ ৭ লাখ টনের বেশি। মোট উৎপাদনে সামুদ্রিক মাছের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় বাংলাদেশের মাছের প্রধান উৎস ছিল নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দখল–দূষণ এবং প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের ওপর বাড়তি চাপের কারণে বর্তমানে চাষভিত্তিক উৎপাদনই দেশের মৎস্য খাতের প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ৮৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ আসে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে। এর মধ্যে উন্মুক্ত ও বদ্ধ উভয় ধরনের জলাশয় রয়েছে। অবশিষ্ট ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ আসে বঙ্গোপসাগর থেকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে মাছ চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের পোনা, খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সরকারি প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে মাছ এখন দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতেও পরিণত হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনকারী দেশ। দেশে প্রায় ২৬০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ এবং ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের অস্তিত্ব নথিভুক্ত রয়েছে। সামপ্রতিক সামুদ্রিক গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে আরও ৬৫টি নতুন সামুদ্রিক প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি বাংলাদেশের জলসীমায় প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে।
দেশের অর্থনীতি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানে মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের জীবিকা এ খাতের সঙ্গে জড়িত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে মাছ চাষ এখন অন্যতম লাভজনক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। বাংলাদেশ এই খাত থেকে প্রতিবছর ৫ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মাছ বিদেশে রপ্তানিও করে।
দেশের মোট জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সাথে যুক্ত বলেও মৎস্য অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইলিশ উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। গতবছরও দেশে সাড়ে ৫ লাখ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে নদ–নদী ও মোহনা থেকে আহরিত হয়েছে আড়াই লাখ টনের বেশি এবং বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় তিন লাখ টন ইলিশ ধরা হয়েছে।
মৎস্য খাতের সাফল্যের পাশাপাশি নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। পরিবেশবিদরা জলাশয় দূষণ, শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতুর উপস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত আহরণকে ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের নিরাপত্তা, গুণগত মান এবং জলজ পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, টেকসই ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করা গেলে বাংলাদেশের মৎস্য খাত সামনের দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতেও এই খাত দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।












