তরুণরাই একটি দেশের উল্লেখযোগ্য শক্তি। বাংলা সাহিত্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও চিন্তায় তারুণ্যের চিন্তা চেতনা এবং পরিবর্তনের পক্ষে গুণগান করা হয়েছে। বিশ্ব সাহিত্য, গান ও বক্তৃতায় আমরা তরুণদের গুরুত্বের কথা প্রায় দেখি, পড়ি বা শুনি। অতীতে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিশোর–তরুণদের হাত ধরে হয়েছিল। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকার তারুণ্যের চিন্তার শক্তিকে বুঝতে পারেনি, বা ঔদ্ধত্যে ও দাম্ভিকতায় এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। অথচ স্কুলগামী বালক থেকে শুরু করে কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা অনড় ছিল এবং তাদের চিন্তা, ধীশক্তি ও রাষ্ট্রের কাঠামোয় পরিবর্তনের দাবি শেষতক সব শ্রেণিপেশার মানুষকে আকৃষ্ট করেছিলো বলেই একটি পরিবর্তন এসেছে। সে পরিবর্তন কতটা অর্থবহ হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা আজ তোলা থাক, তবে এটি অনস্বীকার্য যে তরুণদের হাতেই জাতির ভাগ্য। আজকের কিশোরটি কলেজের ক্যান্টিনে কি আলাপ করছে, ছাদের আড্ডায় বাঘ ভালুক মারার ফাঁকে কোন চোখে দেখছে যুদ্ধকে কিংবা ২৬ এর নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ গড়ে দেবে আগামী দশকের বা পরের দশকের বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনে এসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন তৈরির ফাঁকে তরুণদের আলাপের বিষয়টা কেমন তার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে দেশের গতিপথ। নেতা বা রাষ্ট্রনায়কদের সিদ্ধান্তে দেশ চলে এর বাইরে যাবার সুযোগ নেই। কিন্তু তরুণদের বাদ দিয়ে একটি সরকার বা দেশের কাজ এগিয়ে নেয়া যায় না। আজকের তরুণ নেতাটিই একসময় বড় চেয়ারের কর্ণধার হোন। তাতে তার তারুণ্যের দিনগুলোতে তৈরি হওয়া ভাবনা ও মানস তাকে পথ দেখায়।
মোটা দাগে বাংলাদেশের তরুণেরা কি হতাশ নাকি আশাবাদী? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই। কোন গবেষণা এ নিয়ে আছে কিনা তাও জানা নেই।
শিক্ষকতায় থাকার সুবাদে তাদের সাথেই বা তাদের ভাবনাতেই বিশাল একটি সময় কাটে। অতএব, এ বিষয়ে গুরুত্ব অনুধাবন করেই কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করছিলাম। তবে তরুণদের একটি বিরাট অংশ বিদেশগামী। অনেক আগে থেকেই বিদেশে পড়তে যাওয়া আমাদের সমাজের একটি চর্চা। দেশে অধিক জনসংখ্যার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার উপকরণ, কর্তৃপক্ষের চেষ্টা ও আন্তরিকতা যথেষ্ট নয়। সুতরাং, যাদের সামর্থ্য আছে এবং ইচ্ছা আছে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য উন্নত দেশে যাবে এটি খুবই স্বাভাবিক বিষয়। একসময় পাশের দেশ ভারত ছিল চেনা গন্তব্য। বিশ্বায়নের মাতাল হাওয়ায় এখন সুযোগ এসেছে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বপ্নের’ ভূমিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার। এসব দেশে প্রচুর সংখ্যক শিক্ষাবৃত্তি ও দেয়া হয়। অধুনা নেপাল ও মালয়েশিয়া হয়ে গেছে জনপ্রিয় গন্তব্য। অল্প খরচে বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত সুযোগ সুবিধা এবং দূরত্ব কম হওয়ায় বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের ভিড় লেগেছে। অনেক বিদেশি বিশ্বিবিদ্যালয়ের ‘স্টাডি সেন্টার’ খোলার কথাও শোনা গিয়েছিল। এসব দেশগুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ থাকে, উন্নত জীবনের হাতছানি থাকে এবং সর্বোপরি কিছু কিছু দেশে স্থায়ী হওয়া বা নাগরিকত্ব পাওয়ার ও সুযোগ তৈরি হয়। যদিও ৯/১১ এর পর এবং ২০০৮–০৯ এর বিশ্বমন্দার ধাক্কায় অনেক দেশে অভিবাসন কঠিন হতে হতে অসম্ভব হয়ে গেছে প্রায়। সেই সাথে তাদের জীবনমানের গ্রাফও নিম্নগামী। শিক্ষা, চিকিৎসা ও নানান নাগরিক সুবিধা নিয়ে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু এত কিছু তরুণদের চিন্তায় নেই। থাকবেই বা কেন? সে ভাবছে বিদেশের (যে কোন দেশের) জীবনই বাংলাদেশের চেয়ে ভালো হবে। এটা সঠিক হবার কারণ নেই। কিন্তু এটা ভাবার পেছনে দায়ী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও উচ্চ বেকারত্ব। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ঘুষ, সামাজিক অস্থিরতা, সংকুচিত অর্থনীতিসহ অন্যান্য অনেক কারণ থাকলেও এ দুটো মূল কারণ।
বিগত করোনাকালীন সময়ের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে শুরু হয়েছিলো লম্বা স্রোত। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের এবিং দক্ষ পেশাজীবী বিশেষ করে শিক্ষকদের অনেকেই থিতু হয়েছে বরফের দেশে। ২০২২–২৩ সালে সম্ভবত এ হার সবচাইতে বেশি ছিলো। অথচ তখন সরকারের বক্তব্য ছিল বাংলাদেশ নাকি ‘উন্নয়নের রোল মডেল’। অর্থনীতি ও সম্ভাবনার অনেক গল্প আমরা শুনেছিলাম এবং তাতে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছে অনেকেই। রাষ্ট্র স্বীকার করেনি যে মেধাবী তরুণদের বিরাট অংশ ‘পাচার’ হয়ে গেছে। শিশু শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত এদেশের মাটি, পানি ও বাতাসে গড়ে উঠা সন্তানটি চলে যাচ্ছে, সবার সামনে দিয়েই। আর ফিরে আসছে না। কি তার অভিমান? রাষ্ট্র তার কাছে জানতে চায় না। সরকার বাহাদুর তাকে পাঠিয়ে হয়তো ভাবছে সে রেমিট্যান্স পাঠাবে। আত্মীয় স্বজন তার কাছে প্রত্যাশা করে শ্যাম্পু, সানস্ক্রিন, কফি বা আইফোন। তাঁর মেধায়, যোগ্যতায় এবং চেষ্টায় সে উন্নত জীবন নিশ্চিত করছে। এতে অবশ্যই দোষের কিছু নেই। কিন্তু এতে সমাজ বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছে যে ‘এদেশে থেকে সে কী করবে?’ ফলে আরেকদিন আরও অনেকেই প্লেনে চড়ে বসছে। যোগ্যতার মূল্যায়ন না হতে হতে অযোগ্যদের ভিড় বাড়ছে, যারা দেশ ছাড়তে পারছে না তারা চুপসে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে।
বৃত্তি নিয়ে যারা পড়াশোনা করতে যান তাদের অনেকে দেশে ফিরতে চান এবং কিছু করতে চান। কিন্তু সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সুশাসন এবং অন্তত চাকুরির নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।
শুধু তাই নয়, ভূমধ্যসাগর হয়ে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়াদের মধ্যে বাংলাদেশিদের হার সবচেয়ে বেশি। এ পথে কোড নাম হচ্ছে ‘গেম’। দালানের মাধ্যমে বিশ জনের রাবারের নৌকায় চড়ে বসছে তিনশত। সেখানে আছে বাংলাদেশের মাস্টার্স পাশ করা তরুণটিও। শেষমেশ অনেকের লাশটাও দেশে আসে না। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানার জন্য আল–জাজিরার প্রামাণ্য চিত্র উবংঢ়বৎধঃব ঔড়ঁৎহবুং দ্রষ্টব্য। একই চিত্র পানামা–ব্রাজিল–পেরু–বলিভিয়া ও ‘ড্যারিয়ান গ্যাপ’ জঙ্গল হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ প্রবেশথে। পাঁচটা দেশ নৌকা, গাড়ি ও হেঁটে পার হয়ে আমেরিকা যাওয়ার এই অন্তিম যাত্রায় ও শামিল বাংলাদেশের তরুণেরা। অনেকে এতে লোভকে দায়ী করেন। একমত হয়ে বলা যায় এর শতকরা হার নগণ্য।
জাপানের গড় আয়ু আমাদের গড় আয়ুর চেয়ে অনেক বেশি। তাদের দেশে বয়স্ক লোকজন অবসর নেয়ার পর ও আরও ২০–৪০ বছর বাঁচে এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে না। অথচ উল্টো তাদের পেছনে রাষ্ট্রের অর্থ খরচ হয়। ২০২৪ এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৬৫ বা তার উর্ধ্ব বয়সীদের সংখ্যা ২৯.৪% যারা বিপরীতে ১১–২৫ বছর বয়সীদের সংখ্যার ১৫% এরও কম। এ চিত্র আমাদের দেশে সম্পূর্ণ বিপরীত। এক জরিপে দেখা যায় ১৫–৩৫ বছর বয়সীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ বা তার বেশি। এ বয়সে শরীরে শক্তি থাকে, ঝুঁকি নেবার সাহস থাকে, বদলে দেবার ইচ্ছে থাকে। শুধু দরকার তাকে পরিচালিত করতে জানা। ইংল্যান্ডে দেখেছি স্কুল পাশ করা কিশোরটি নিজের দায়িত্ব নিচ্ছে, পার্টটাইম কাজ করে গাড়ি কিনছে কিংবা ইয়ার গ্যাপ দিয়ে কাজ করে টাকা জমিয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য টিউশন ফি জমিয়ে ফেলছে। মা বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে সে সুপারমার্কেট, গ্রোসারি বা ক্লিনিং এর চাকরি করছে। তার পরিবার হয়তো অবস্থাপন্ন। কিন্তু সে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে চায়। টাকা আয়ের কষ্ট বুঝে সে জীবন অন্য দৃষ্টিতে দেখছে। পরে সে যখন সত্যিকারের গ্র্যাজুয়েট জবে ঢুকছে তখন তার মধ্যে ‘ইগো’ নেই, আছে বিনয় আর শেখার ইচ্ছা। অথবা সে যদি পড়া বন্ধ করে দেয় তবুও তার নিজস্ব ক্ষেত্রে সে দক্ষ হয়ে অর্থনীতির উন্নতিতে অবদান রাখছে, নিজেও স্বাবলম্বী হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে পার্ট–টাইম চাকরি অনেক দুর্লভ। যেখানে মাস্টার্স পাশ ও বেকার সেখানে অনার্সে প্রথম বর্ষের ছাত্রের চাকরি তো অসম্ভব। ইদানীং কিছু কিছু কোম্পানি কাস্টমার সার্ভিস বা এরকম ছোটখাট কাজে ছাত্রছাত্রীদের নিয়োগ দেয়। এ সুযোগ অনেক সীমিত এবং খুব কম বেতন দেয়া হয়। সরকার এমন নীতিমালা করতে পারে যাতে প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠান অন্তত ১০–১৫% ছাত্রছাত্রীদের কাজে নেয় এবং মানসম্মত বেতন দেয়। এতে করে ছাত্রছাত্রীরা পাশ করে বের হবার আগেই অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির সাথে পরিচিত হবে এবং ক্যারিয়ার পছন্দ করার ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করবে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। গাদা গাদা বিশ্বিবদ্যালয় এবং লক্ষ লক্ষ অনার্স–মাস্টার্স দিয়ে অর্থনীতির বা সমাজের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। কারিগরি ও বাস্তবমুখী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। নামকাওয়াস্তে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ফাঁপা শিক্ষাব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করবে। অন্তত স্কুল পাশ করে কিছু একটা শিখে যেন আয় করা যায় এমন ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। শিক্ষার সাথে অর্থনীতির সংযোগ ঘটিয়ে তরুণদের সুযোগ করে দিতে হবে যেন চেষ্টা করলেই তারা দাঁড়াতে পারে। ২৫ বছরের একজন স্নাতককে যদি কেবল টিউশনি করে চলতে হয় তাহলে দেশের জন্য তার দেয়ার সময় কখন ফুরিয়ে যাবে টের পাবে না। তারুণ্যের বাংলাদেশ বিনির্মিত হোক শিক্ষায় ও কর্মে, কথায় নয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি














