(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সিডনি অপেরা হাউসের ভিতরে–বাইরে ছড়িয়ে থাকা মুগ্ধতায় মন ভরিয়ে আমি যেনো স্বপ্নের দেশে ঘুরছিলাম। কী যে ভালো লাগছিলো! অপেরা হাউজের ভিতরের মতো বাইরেও নানা আয়োজন। চোখ ধাঁধানো ডিজাইন, বসার জায়গা, সাগর দেখে দেখে হাঁটার জায়গা। কত দেশের কত রঙের মানুষ যে ঘুরছেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। নানা বয়সের মানুষ। আবাল–বৃদ্ধ–বনিতা। সিডনি অপেরা দেখার জন্য বিশ্বের কত দেশ থেকে যে মানুষ আসেন! সাদা চামড়ার মানুষ, কালো চামড়ার মানুষ। অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় লোকজন কেমন আছে বুঝতে পারছিলাম না, তবে ভারতীয় চেহারার পাশাপাশি চীন জাপান এবং সন্নিহিত দেশগুলোর বহু নারী পুরুষের দেখা মিললো। একটু খোঁজাখুঁজি করে তথ্য পেলাম যে, বছরে এক কোটি দশ লাখের মতো মানুষ এই অপেরা হাউজ দেখতে আসেন। এতো পর্যটক! এদের মধ্যে বহু মানুষই আসেন বিশ্বের নানাদেশ থেকে। অস্ট্রেলিয়ায় বেড়াতে এসে অপেরা হাউজ না দেখে ফিরে যান এমন মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। একটি অপেরা হাউজ দিয়েই তাবত দুনিয়ার পর্যটকদের সিডনিতে টেনে আনা হচ্ছে। শুধুমাত্র অপেরা হাউজ দিয়ে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে তার একটি মোটামুটি হিসেব দাঁড় করালাম। একজন পর্যটক সিডনিতে পাঁচশ’ ডলার খরচ করলেও বছর শেষে অংকটা কোথায় গিয়ে ঠেকে তার হিসেব কষতে গিয়ে মাথায় চক্কর দিচ্ছিলো। আহা, আমাদের কিছু নেই, কিচ্ছু নেই!
অপেরা হাউজের বাইরে মানুষের পায়ে পায়ে ঘুরছে হাঁস–শীতের পাখী। এক একটা হাঁসের ওজন মনে হয় পাঁচ সাত কেজি হবে, কিন্তু কেউ তাদের বিরক্ত করছে না, তাদের ডর ভয়ও নেই। কী মায়াবী ভঙ্গিতে যে হাঁসগুলো ঘুরছে, হেলেদুলে। ইচ্ছে করলে উড়ে যাচ্ছে সাগরে, টুপটুপ করে মাথা ডোবাচ্ছে পানিতে। নিশ্চয় খাবার পাচ্ছে। হাঁসগুলোর গতর দেখে মনে হচ্ছিলো কোনকালেই এগুলো খাবারের কষ্টে ছিলো না। শুধু শীতের তাড়ায় কী এগুলো হাজার হাজার মাইল উড়ে উড়ে উঞ্চতা খোঁজে!
অপেরা হাউজ ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করছিলো না। চারদিকের স্কাইলাইন এতো টানছিল যে, মনে হচ্ছিলো আরো কিছুক্ষণ বসে থাকি। হাত বাড়ালেই সাগর, পা বাড়ালেই সাগরের ঢেউ! অপেরা হাউজের রিটেইনিং ওয়ালের দেয়ালে বসে সাগরের নীল জলে স্বপ্নের চাষাবাদ করছিলাম।
ট্যুর অপারেটর তাড়া দিলেন, বললেন–এবার ফিরতে হবে। অনেকক্ষণ হয়ে গেলো। বাসচালকের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। পরে কষ্টে পড়ে যাবো।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। অপেরা হাউজকে পেছনে ফেলে আসতে মনে হচ্ছিল, ঘোরলাগা একটি আবহ থেকে যেনো বাস্তবে ফিরে যাচ্ছি। সাদা পালকের মতো স্থাপনাটির দিকে আরো একবার তাকালাম, মনে হলো আর কী কখনো দেখা হবে, শেষবারের মতো মনের ভিতরে ছবিটা গেঁথে রাখি।
আমরা কিছুপথ হেঁটে বাসে চড়লাম। একে একে সবার মাথা গুনে মিলিয়ে নেয়া হলো। কাউকে ফেলে গেলে নয়া ভোগান্তির সৃষ্টি হবে।
আমরা হোটেলের পথ ধরলাম। অপেরা হাউজ এবং হারবার ব্রিজ পেছনে ফেলে ছুটছিল আমাদের বাস। জানালার পাশে বসে আমি তাকিয়ে রইলাম সিডনি হারবারের দিকে। অনেক শান্ত লাগছে সাগরটাকে। আকাশের সব নীল যেনো বুকে আগলে রেখেছে সিডনি হারবার। স্বচ্ছ এবং নীলাভ পানিতে দুর্দান্ত লাগছিল। সূর্যের নরম আলো জলের উপর পড়ে সোনালি ঝিলিক দিচ্ছিল।
বাস চলছে। প্রচুর গাড়ি ছুটছে রাস্তায়। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছে মানুষ, কেউ ছবি তুলছে, কেউ বা গল্পে মশগুল।
বাসটি যখন শহরের প্রাণকেন্দ্রের দিকে ঢুকতে শুরু করল, তখন পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলে গেল। নিরিবিলি সমুদ্রতীরের বদলে দেখা দিল ব্যস্ত রাস্তা, উঁচু অট্টালিকা আর দ্রুতগতির জীবন।
আমি দেখলাম সার্কুলার কোয়ের পাশ দিয়ে বাস এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বাস বা গাড়ি থেকে নেমে মানুষজন ছুটছে। কেউ কেউ ফেরি ধরে হয়তো ঘরে ফিরবেন।
আমাদের হোটেলে পৌঁছে গেলাম। কিছুটা পাহাড়ী ঢালুতে আমাদের হোটেল। বাস থেকে নেমেই লায়ন ফজলে করিম ভাই, ডালিয়া ভাবী এবং বিজয় দা’সহ আমরা লবিতে বসে পড়লাম। রুমে যেতে ইচ্ছে করছিল না। হোটেলের কাচঘেরা লবি থেকে বাইরের রাস্তা পুরোপুরি দেখা যায়। মানুষ পথ চলছে, বাস, ট্রাম ছুটছে। বৈকালিক ব্যস্ততা পুরো এলাকা জুড়ে। শত শত পর্যটক দলবেধে হাঁটছে। কোথায় যাচ্ছে কে জানে!
বসে বসে গল্প করছিলাম আমরা। সারাদিনের ট্যুর নিয়ে কথা বলছিলাম। আমরা সকলেই মুগ্ধ। সিডনি ভ্রমণ আমাদের মন ভরিয়ে দিয়েছে।
ফোন বাজছিল। স্ক্রিনে আমার বন্ধুর মেয়ে ডা. তামান্না আজিম নিশার নাম। পাগলী মেয়েটি তার বাসায় যাওয়ার জন্য কতবার যে ফোন করেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি সময় পাচ্ছি না বলার পরও তার জোরাজুরিতে কোন পরিবর্তন আসলো না। বেশ বুঝতে পারছিলাম যে নিশার বাসায় যেতেই হবে। নাহয় তার বাবা, আমার বন্ধু আজিম ভাই শুনলেও মন খারাপ করবে। নিশা বললো, সে আমাকে হোটেল থেকে তুলে নেয়ার জন্য তার ননাসের স্বামীকে দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি সন্ধ্যার সময় আমাকে হোটেল থেকে তুলে নেবেন, রাতে আবার হোটেলে নামিয়ে দিয়ে যাবেন। এমন করে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধলে কী আর না বলার সুযোগ থাকে!
নিশাকে বললাম, আমি হোটেলেই আছি মা। তোমার ননাসের স্বামীকে আমার নম্বর দিয়ে দিও। এখানে এসে কল করলে আমি ওনার সাথে চলে আসবো।
নিশার ফোন রাখার পর আমার সাথীদের বিষয়টি জানালাম এবং আমার সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং ডালিয়া ভাবী অসহায়ভাবে বললেন, সারাদিনের ধকল সামলে এখন আর কোথাও গেলে বাঁচবো না। আমরা রাতে ডিনারও করবো না। ঘুমিয়ে যাবো। আমার চাপাচাপিতে না করতে পারলেন না লায়ন বিজয় শেখর দাস। বিজয় দাকে বললাম, মেয়ের আবদার রক্ষা করতে এটুকুতো করতেই হবে। চলেন, একসাথে যাবো,আর চলে আসবো।
আমরা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম, কফি নিলাম। সন্ধ্যা নেমে আসছে, চারদিকের সুউচ্চ ভবনগুলো হয়ে উঠছে আলোকোজ্জ্বল। আমি জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে যতটুকু দৃষ্টি যায় উদাস হয়ে তা দেখতে লাগলাম। আহা, দেশ থেকে কত দূরে! বুকের ভিতরটা কেমন যেনো একটু হাহাকার করে উঠলো।
অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসলো। বুঝতে পারলাম যে, নিশার আত্মীয়ই ফোন করেছেন। তিনি বললেন, পাঁচ মিনিটের দূরত্বে আছেন, আমি হোটেলের সামনে দাঁড়ালে তিনি তুলে নেবেন। পার্কিংয়ের অসুবিধার জন্যই মনে হয় তিনি আগেভাগে আমাকে জানিয়ে দিলেন। বিজয় দা’সহ আমি দ্রুত নিচে নেমে আসলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটি গাড়ি এসে থামলো। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন, আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম।
ভদ্রলোকের নাম মারুফ। বয়স আমাদের কাছাকাছি। তিনি নিশার হাজবেন্ড মাইনুল ইসলাম জনির বড়বোনের স্বামী। একেবারে চকচকে গাড়ি, নতুন। ভিতরে পারফিউমের দারুন গন্ধ। গাড়িতে চড়ে আরামে আমার চোখ বুজে আসছিল। নখের পিঠের মতো রাস্তায় নতুন গাড়িতে চড়ার মজাই আলাদা।
গাড়ি চলছিল, প্রচুর ট্রাফিক রাস্তায়, তবে কোন জ্যাম নেই। ট্রাফিক সিগন্যালে কোন পুলিশ নেই। অটো সিগন্যালিং সিস্টেম। লাল সবুজ হলুদ আলো জ্বলছে, আর এই আলোর সিগন্যালে চলছে যান চলাচল। ডিজিটাল কাউন্ট–ডাউনে রাস্তায় মানুষ পারাপারও করছে। সবকিছু চলছে একটি সিস্টেমে। রাস্তার মাঝ দিয়ে হাত উচিয়ে পারাপারের কোন সুযোগ নেই, কেউ সেটি করেও না।
রাস্তার পাশে প্রচুর উঁচু উঁচু ভবন। নানা রঙের আলো জ্বলছে। পুরো শহরজুড়ে যেনো শুরু হয়েছে বাহারী সব আলোর উৎসব। ক্যাফেগুলো ভরে উঠছে মানুষের কোলাহলে। বারগুলোর লাইটিং বলে দিচ্ছিলো ভিতরে হুল্লোড় চলছে।
মারুফ সাহেব আমাকে ‘আংকেল’ সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। জানতে চাইলাম, বাসা কতদূর, কতক্ষণ লাগবে? ভদ্রলোক বললেন, ৭০ কিলোমিটারের মতো দূরে, চল্লিশ মিনিটের মতো লাগবে! ৭০ কিলোমিটার! ভিতরে চমকে উঠলাম। এতো দূর! তিনি হাসলেন, বললেন–এখানে এটা কোন দূরত্বই নয়। মারুফ সাহেব বেশ কয়েকবছর আগেই লেখাপড়া করতে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন, আর ফিরেন নি। এখন সিটিজেন। অনেক ভালো করেছেন বলেও জানালেন। পরিবার পরিজন সবাইকে নিয়ে বসবাস করেন। ব্যবসা বাণিজ্য করেন। নিজের জীবনের নানা গল্প করছিলেন তিনি। আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, ঠিক চল্লিশ মিনিটেই আমরা নিশার বাসায় পৌঁছে গেলাম। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।














