জ্বালানি সংকট : চাই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অতর্কিতে বিনা নোটিশে ইরানে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তখন থেকে যতই দিন যাচ্ছে, দেশে জ্বালনি তেলের সংকট তীব্র হচ্ছে। এ সংকট দূর হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধের ডামাঢোলে আর জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দেশ এখন স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

দেশের অন্তত ১০টি খাতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, গৃহস্থালি, সেবা, নির্মাণ শিল্প, পর্যটন ও বিনোদন, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি, বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি তেলের ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। এর আবার ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। হরমুজ নিয়ে এখন চলছে গভীর টানাপোড়নের সংকট। মধ্যপ্রাচ্য সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা বলা কঠিন। স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘস্থায়ী প্রস্তুতি থাকা জরুরি বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ নির্ভর ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ না থাকায় কলকারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কৃষিখাতে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় ফসল উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে স্পষ্ট সংকটে দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) আমদানি কার্যত থমকে গেছে, এর সরাসরি প্রভাবে পড়েছে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআর এল) ওপর। কাঁচামালের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ইউনিট ‘ক্রুড অয়েল ডিষ্টিলেশন’ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কোন মতে ট্যাংকারে জমে থাকা তলানির তেল বা ডেডষ্ট দিয়ে কোনো মতে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

টানা তিনবছর মন্থর প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেল, গ্যাস ও কয়লার প্রয়োজন। জ্বালানির অভাবে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় ঘটেছে। জ্বালানির অভাবে অন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও ভালো নেই। দেশে লোডশেডিং বেড়ে গেছে। তেলের সংকটে পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কৃষি ও শিল্প খাতে ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ যাচ্ছে না। ব্যাহত হচ্ছে সেচ, ট্রাক্টর চালনা, পণ্য পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্য, নির্মাণ শিল্প, সেবা, গৃহস্থালি, পর্যটন, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের অবস্থাও তথৈবচ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতির ভিত্তি যতই শক্তিশালী মনে হোক, যদি তা একমুখী ও সীমিত বৈচিত্র্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সামান্য ধাক্কাতেই নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে। ব্যবসা ও রপ্তানি পণ্য এ দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ধরণের সংকট ফিরে আসবে।

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি আর শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন সামান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতে ও তেল গ্যাসের বাজারকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সংঘাত বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর। এ বাস্তবতার প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বাংলাদেশ। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে আমদানি নির্ভর জ্বালানি তেল গ্যাস ও কয়লার উপর। জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

জীবাস্ম জ্বালানি দিয়ে গোটা বিশ্বই আজ বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। দেশে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়ণযোগ্য জ্বালানি অনেকটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তেল গ্যাসের ওপর নির্ভরতা, মোটা অঙ্কের বাণিজ্য: বিশ্বরাজনীতি সহ নানা বিষয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি, জল বিদ্যুৎ, সমুদ্র শক্তি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ সব উৎসকে একত্রে ব্যবহার করার একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা জরুরি কোন একক উৎস নয়। বরং একটি বহুমুখী জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

দেশে শিল্প উৎপাদন ক্রমাগত হারে বন্ধ হওয়ায় উপক্রম হয়ে পড়েছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় এবং বর্তমানে তেল সংকটের কারণে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিল্প উৎপাদন হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে যাবে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছে সমাজবিজ্ঞানীরা।

গ্যাস সেক্টরে শৃঙ্খলা আনা জরুরি। আমলাদের খপ্পর হতে এ সেক্টরকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথা দেশের চলমান জ্বালানি সংকটে তা আরো ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

মাত্র দেড় মাসে নতুন রাজনৈতিক সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। কিন্তু ঋণের অভাবে হাহাকার চলছে বেসরকারি খাতে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময় থেকেই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে। দীর্ঘ সময় বেসরকারি ঋণ এবং বিনিয়োগ খরার ফলে জাতীয় সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সেই আশঙ্কাই হলো বেকারত্ব বৃদ্ধি। বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে রয়েছে।

এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। চলমান এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে পরিকল্পনানুযায়ী কাজ করতে হবে। বেসরকারি হাতকে শক্তিশালী করে বন্ধ কারখানা চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে অর্থনীতিকে গতিশীল করা এখন খুবই প্রয়োজন।

২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর বন্ধ হওয়া দেশের সকল শিল্প কারখানা চালুর কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যা একটি বাস্তবসম্মত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে মনে করেছে সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে শিল্প খাতের অবদান অপরিসীম। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং শিল্প খাতের বিকাশে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, সরকার বিভিন্ন ধরনের শিল্পনীতি প্রণয়ন করছে যা উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করছে। এসব নীতির লক্ষ্য হলো শিল্প খাতের প্রসার ঘটানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে শিল্পখাতের বিকাশে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে দেশে সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতের আরেকটি বড় সংকট। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং ঔষুধ শিল্পে এর প্রভাব গভীর।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধুমাত্র উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ডলার সংকট ও শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তরা তাঁদের প্রয়োজনীয় উপকরণ আনতে না পেরে উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চালাচ্ছেন। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থায় ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। গ্যাস সেক্টরে আমলাদের প্রভাব খুবই বেশি। ফলে অনভিজ্ঞ অদক্ষ আমলাদের প্রতিবন্ধকতায় শিল্প উৎপাদনে এবং শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বার বার বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছে। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়, এখন সময় গ্যাস সেক্টরকে আমলাদের প্রভাব হতে মুক্ত করে সময়োপযোগী শিল্প বিনিয়োগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সংকট গভীর এর সমাধান ও সুচিন্তিত ও কার্যকর হওয়া জরুরি। তাই সঠিক পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের শিল্প খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এই খাতের উন্নয়ন শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকীভাবে বইয়ের পাঠক বাড়ানো যায়
পরবর্তী নিবন্ধমজবুত হোক তারুণ্যের অহংকার