মজবুত হোক তারুণ্যের অহংকার

রাশেদ রউফ | মঙ্গলবার , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হলো নতুন একটি বছর ১৪৩৩। অতীতের গহ্বরে চলে গেলো গোটা একটি বছর, বারটি মাস, ৩৬৫ দিন। এলো নতুন দিন। বর্ষ বিদায় আর বর্ষ বরণের সন্ধিক্ষণের অনুভূতি মিশ্র, ব্যতিক্রম ও অপূর্ব। বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক সর্বজনীন প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। সামাজিক ও লোক উৎসবের এই দিনটি বর্তমানে একটি সাংস্কৃতিক দিবসে রূপ নিয়েছে। নববর্ষ বাঙালির মননের প্রতীক, বাঙালির চৈতন্যলোকে অনিন্দ্য সত্তার বাতিঘর।

পহেলা জানুয়ারি খ্রিস্টীয় নববর্ষ উদযাপনে আমাদের দেশে সরকারিভাবে কোন কর্মসূচি না থাকলেও সেটিও খুব ধুমধাম ও স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে উদযাপিত হতে দেখি। তবে এ বর্ষ বরণে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো মিল নেই বলে চোখে পড়ে না কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা, প্রত্যক্ষ করা হয় না সুস্থতার চিত্র। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তরুণ অত্যন্ত শোরগোলের মধ্যে খ্রিস্টীয় নববর্ষ উৎসব পালন করে বাঙালির প্রথা ও কৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে। আমেরিকা, ফ্রান্স, স্কটল্যাণ্ড, রাশিয়া, ইটালির মত দেশ নয় আমাদের বাংলাদেশ। ওখানে খুব ঘটা করেই উদযাপন করা হয় খ্রিস্টীয় নববর্ষ উৎসব।

আমেরিকায় পহেলা জানুয়ারিকে ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। একদিন আগে থেকেই প্রস্তুতি চলে সেই উৎসব উদযাপনের। স্কটল্যাণ্ড ও ফ্রান্সে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয় এ উৎসবকে। ইংল্যান্ডেও খুব হৈহুল্লোড় হয়, তবে বড়দিন, গুড ফ্রাইডে’র মত গুরুত্ব পায় না নববর্ষ উৎসব। তবে চমৎকার ও সুশৃংখল উৎসবের আয়োজক হল জাপান। পহেলা জানুয়ারি থেকে তিনদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ উৎসব উদযাপন করা হয়। এটি জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব। জাপানিরা নতুন বছরের নতুন দিনকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে, বিদায়ী বছরকে মনে করে দুর্ভাগ্যের বিদায়।

কিন্তু আমাদের জাতীয় উৎসব হচ্ছে ‘পহেলা বৈশাখ’। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্যেই আছে আমাদের সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশ। তবে আমরা বাঙালি হলেও আমাদের জাতীয় জীবনে ‘ইংরেজি’ এমন ভূমিকা পালন করছে, যাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মাস, সন, তারিখ থেকে শুরু করে সব কিছুই আমরা মিলাই ইংরেজি দিয়ে। বেশিরভাগ শিক্ষিত বাঙালিই বলতে পারেন না, আজ বাঙলা মাসের কত তারিখ। কোনো কোনো সময় চলতি বাঙলা মাস ও বাঙলা সনের কথাও মনে রাখতে পারেন না। এটা দুঃখজনক হলেও সত্যি। তাই ইংরেজি তারিখ, বর্ষ, বর্ষবরণ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা এ উৎসব পালন না করলেও মানসিকভাবে অথবা ‘কাজেকর্মে’ এ উৎসব পালিত হয়ে যায়। সুতরাং খ্রিস্টীয় নববর্ষ উদযাপনের কোনো দ্বিমত বা বিরোধিতার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু আমরা চাই, সেই উৎসবও যেন আমাদের দেশ, দেশের মানুষ তথা দেশীয় ঐতিহ্যের সমান্তরালে চলে।

আমাদের তরুণ সমাজ স্বভাবতই উচ্ছল, উদ্যমী ও সাহসী। যে কোনো কাজে তাদের উচ্ছলতা ও সাহসিকতার প্রমাণ মেলে। এই খ্রিস্টীয় নববর্ষ পালন উপলক্ষ্যে তাদের কেউ কেউ হয়ে পড়ে অধিকতর উদ্দাম ও বেপরোয়া। থার্টি ফার্স্ট নাইটে তাদের উচ্ছ্বাস ও আনন্দের ঢেউ বয়ে যায় ঢাকাচট্টগ্রামের অভিজাত এলাকাসমূহে। আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও শালীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে এসব তরুণ মেতে ওঠে নতুন উল্লাসে। রাত বারোটা অতিক্রান্ত হতে না হতেই রাস্তায় রাস্তায় নেমে পড়ে তারা। উদ্দাম নৃত্য, অশালীন চিৎকার, স্লোগান ও অশ্রাব্য গানের মধ্যে তারা প্রকাশ করে তাদের উল্লাস। এসব সুস্থতার লক্ষণ নয়। আমরা সুস্থতার চিত্র চাই। আমাদের তরুণ সমাজ যেমন উচ্ছল ও সাহসী, তেমনি আত্মপ্রত্যয়ীও। আমরা তারুণ্যের উচ্ছ্বাস চাই, উগ্রতা নয়। বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ কাজ সম্পন্ন করার কারণে আমাদের তরুণ সমাজ সবসময় আমাদের অহংকার হয়ে আছে। এই অহংকারের ভিত আরও মজবুত হোকসেটাই আমরা চাই সবসময়।

এবারের পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপিত হলো সানন্দে। বাঙালির ঘরে ঘরে যেন এ উৎসবের ছোঁয়া লেগেছে। পরস্পরের মঙ্গল কামনা ছিল এ দিনের সামাজিকতার অঙ্গ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে পহেলা বৈশাখের ভোর থেকে নগরজুড়ে আয়োজিত হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার ক্ষুদ্র সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শুভ ও মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো পহেলা বৈশাখের দিন।

.

গত শনিবার অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো চট্টগ্রাম একাডেমি ফয়েজ নুরনাহার মিলনায়তনে। একাডেমির মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর মিঞার সভাপতিত্বে ও বাচিকশিল্পী আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ‘একলা মেয়ের মেঘলা দুপুর’ গ্রন্থের লেখক কথাসাহিত্যিক আকাশ আহমেদ ও ‘মেঘ ভেজা দিন একলা বাড়ি’ গ্রন্থের লেখক কবি সুবর্ণা দাশ মুনমুনকে পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম, কথাসাহিত্যিক দীপক বড়ুয়া, সাপ্তাহিক স্লোগান সম্পাদক মোহাম্মদ জহির, প্রাবন্ধিক আমিনুর রশীদ কাদেরী, প্রাবন্ধিক নেছার আহমদ, শিশুসাহিত্যিক অরুণ শীল, গল্পকার জিন্নাহ চৌধুরী, প্রাবন্ধিক রেজাউল করিম স্বপন, কবি জসিম উদ্দিন খান, গল্পকার বিপুল বড়ুয়া, কবি অমিত বড়ুয়া, অধ্যাপক কাঞ্চনা চক্রবর্তী, কবি কাসেম আলী রানা, বেতার ব্যক্তিত্ব ফজল হোসেন প্রমুখ।

আকাশ আহমেদ ও সুবর্ণা দাশ মুনমুন আমার অনুজপ্রতিম লেখক। আকাশ গল্পউপন্যাস রচনায় নিবেদিত হলেও কিশোরকবিতা রচনাতেও স্বচ্ছন্দ। মুনমুন তো কিশোরকবিতা নিয়েই আছে। বিষয়বৈচিত্র্যের চমৎকার প্রকাশের কারণে তারা সুধী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। কিশোর মনের কল্লোলিত কল্পনা, আবেগ, ও আনন্দকে স্বতন্ত্র মহিমায় উদ্ভাসিত করার প্রয়াস পেয়েছে তারা তাদের রচনায়। নতুন ভাবনা, অপার বিস্ময় ও স্বপ্ন নিয়ে তারা উচ্ছ্বসিত করে তাদের সতীর্থ ও পাঠকদের। আমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই দুই লেখককে অভিনন্দন জানাই।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;

ফেলো, বাংলা একাডেমি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজ্বালানি সংকট : চাই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি