পাঠক মানে যে পাঠ করতে পারে বা পড়তে পারে। সেকালে পুরো গ্রামে দুএকজন পড়তে পারতো; তাঁরা ‘বিষাদসিন্ধু’ কিংবা পুরাণ–পাঁচালী পড়তেন আর বাকিরা তাঁদের পাঠ শুনে সাহিত্যরসে সিক্ত হতেন। এখন শিক্ষার বিস্তারে পাঠক শব্দের সে মানে পাল্টে গেছে। বইয়ের প্রচলন বাড়তে বাড়তে মুখবই বা ফেসবুক ছেয়ে ফেলতে উদ্যত হয়েছে বইয়ের জগত। বাংলা ভাষায় ‘বই’ শব্দটি আরবি শব্দ ‘বহি’ থেকে এসেছে। আরবিতে ‘বহি’ বলতে সাধারণত পাতা, খাতা বা বাঁধাই করা কাগজকে বোঝানো হয়, যা থেকে পরবর্তীকালে বই শব্দটি বাংলায় প্রচলিত হয়েছে। ইংরেজি ‘বুক’ শব্দের উচ্চারণ সাদৃশ্য হেতু এ–দুটি শব্দের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেন অনেকে। ইংরেজি ‘বুক’ শব্দটি মূলত ‘বিচ’–গাছের বাকল বা কাঠের ফলকে লেখার ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বইয়ের সাথে মানব সভ্যতার বিকাশে জ্ঞানচর্চার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
কবি হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘বই’ কিশোর কবিতায় লেখেন: ‘বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে/ বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে। / যে–বই জুড়ে সূর্য ওঠে/ পাতায় পাতায় গোলাপ ফোটে/ সে বই তুমি পড়বে’। অথচ এই একুশ শতকে এসে আমাদের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মনের কথাই যেনো ধ্বনিত হয় ঐ কিশোরকবিতার আরেক স্তবকে-‘যে–বই তোমায় দেখায় ভয়/ সেগুলো কোন বই–ই নয়/ সে–বই তুমি পড়বে না’। আজাদের সে–কবিতাও আজ আর পাঠ্যবইয়ে নেই। এর কারণ যে কেবল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তা নয়; আমাদের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাও এর দায় এড়াতে পারে না। মাত্র পঞ্চান্ন বছর আগে পরাধীন পাকিস্তানে আমাদের স্বপ্ন ছিল: ‘এই দেশেতে জন্ম যেনো এই দেশেতে মরি’। আর অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভাষ্যমতে আজকের তরুণদের স্বপ্ন: এই দেশেতে জন্ম যেনো ঐ দেশেতে মরি। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আক্ষেপ করেন–এখানে শিক্ষার্থী নেই সবাই পরীক্ষার্থী, গবেষক নেই সবাই প্রশাসক। সুতরাং, এখানে বই পড়ার প্রয়োজন নেই কারও। তবে কীভাবে বাড়নো যায় বইয়ের পাঠক?
কবি রাশেদ রউফের এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখি: আন্দরকিল্লার লাইব্রেরিগুলো গাইড বইয়ে সয়লাব। দশম শ্রেণি পর্যস্ত সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিলেও তার চারগুণ বেশি গাইড আর নোটবই কিনতে হয় শিক্ষার্থীদের। তার উপর আছে কোচিং সেন্টার ব্যবসায়ীদের শিক্ষাবাণিজ্য। সুতরাং শিক্ষাজীবনে যেমন শিক্ষার্থীদের আউট বইয়ের পাঠক হবার ফুরসৎ নেই; তেমনি শিক্ষাজীবন শেষেও বিসিএস গাইড আর কোচিংব্যবসায়ীদের কোলে চড়ে কোনো রকমে একটা চাকুরি পেলে আর বইয়ের সাথে মুখ দেখাতে চাই না আমরা। তাইতো চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেট থেকে তিন তিনটি বইয়ের দোকানের একটিও আজ অবশিষ্ট নেই। বাতিঘর লাইব্রেরিটা ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জামালখানে–প্রেসক্লাব বিল্ডিং–এ। বইয়ের পাঠক বাড়ানোর উপায় অন্বেষণে আমরা প্রাজ্ঞজনের পানে তাকাই। প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন যে সাহিত্য বা বই যখন শিক্ষকের হাতে পড়ে তখন তিনি তাকে বধ করেন এবং তার শবচ্ছেদ করে শিক্ষার্থীকে বুঝিয়ে দেন। এতে লেখক পাঠকের মাঝে শিক্ষক দাঁড়িয়ে থাকায় লেখক পাঠকের চারচক্ষুর মিলন ঘটে না। সুতরাং, আমাদের প্রথম প্রস্তাব: লেখক–পাঠকের মিলনের আয়োজন করতে হবে। পাঠক বই পড়ে লেখককে প্রশ্ন করবার (প্রশংসা/ নিন্দ নয়) সুযোগ তৈরি করতে হবে। লেখকদেরও পাঠকের চাহিদা ও প্রশ্ন শোনার প্রস্তুতি নিতে হবে। যেমন: অধ্যাপক বিচিত্রা সেনের ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’গল্পে: ‘বাদল মায়ের অসুখের কথা বলে তাকে ছেড়ে দেবার অনুনয় করলে কুখ্যাত রাজাকার জাকির বলে– ‘অ বাজি, তোরে তো আর ছাড়ন যাইতো ন। আঁরে মেজর সাবে হোইয়ে দে, উগ্গা মুক্তিযোদ্ধা ধরাই দিত ফাইরলে বোত বড় ধরনর ফুরস্কার দিবো। চল বাজি, তুই অইলি যে আজিয়ার মুক্তিযোদ্ধা’ (উদ্ধৃত, দৈনিক আজাদী ২৮শে মার্চ ২০২৬)। এমন বাক্য পাঠের পর পাঠক যেনো জিজ্ঞেস করবার সুযোগ পায় যে পাকিস্তানী এবং তাদের এদেশীয় দোসরেরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কি মুক্তিযোদ্ধা বলত নাকি ভারতের দালাল কিংবা বড় জোর ‘মুক্তি’ বলতো। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখতে গেলে লেখকদেরকে স্বাধীনতা ও মুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করে লেখায় হাত দিতে হবে। তাই আমাদের দ্বিতীয় প্রস্তাব: লেখকগণ আরও বস্তুনিষ্ঠ হয়ে আরও বেশি বই পড়ে বই লিখতে আসবেন।
আমার স্বজেলার সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর কথায় বলি, পাঠক বলে বইয়ের দাম বেশি তাই বই কেনা হয় না আর প্রকাশক বলে বই চলে কম তাই দাম কমানো যায় না। আলীর সে অবস্থা আজ নেই তাঁর গরবিনী সুন্দরী রমণীও আজ বই প্রকাশ করেন নিজের টাকায়। পাঠকের কাছে পুশিংসেলও করেন। পুরুষ লেখকরাও একাজে খুব পিছিয়ে নেই। স্কুল–কলেজের পুরস্কার বিতরণীতে প্রচুর বইও দেওয়া হয়। তবে মানসম্মত বইয়ের বড্ড অভাব। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে বাছাইকৃত কিছু বই পড়িয়ে যাচাই করে পুরস্কৃত করেন। কবছর আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলও বুকরিডিং কম্পিডিশন করেছিল। বর্তমান সমাজের স্বার্থে বইয়ের পাঠক সৃষ্টির উপায় বিষয়ে আরও সামাজিক–সাংস্কৃতিক গবেষণা করে বই প্রকাশ প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। স্বপ্ন দেখতে হলে বইয়ের পাঠক হতে হবে, কেননা ‘বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে’। পাঠক সৃষ্টি আর মানুষের মনের অসুখ সারাতে হাসপাতালের চেয়ে লাইব্রেরি গুরুত্বের কথা সকলেরই জানা আছে আশাকরি।
লেখক: ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রাবন্ধিক।














