পুষ্প পথে পথিক : ওসমান গণি মনসুরের নীরব অভিযাত্রা

প্রদীপ খাস্তগীর | মঙ্গলবার , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ

আদিকাল, তারও আগে প্রাগৈতিহাসিক পর্বেযখন মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া তখন থেকেই এক জায়গায় থিতু হতে গিয়ে হিমসিম অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। বৈরী প্রকৃতি ও হিংস্র জন্তুজানোয়ারই হয়ে ওঠে মানুষের প্রবল প্রতিপক্ষ। তাই নিরাপদ ঠিকানা অন্বেষণ ও ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য খাদ্য আহরণের নিমিত্তে মানুষকে দলবদ্ধভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছোটাছুটি করতে হয়েছে। এমনকি পাহাড়পর্বত, নদনদীসাগর, অরণ্য ও মরুভূমি পর্যন্ত পাড়ি দিতে হয়েছে। এভাবেই আদিম মানুষ ধীরে ধীরে সভ্য হয়েছে, আবিস্কারের নেশায় মেতেছে, উত্তরদক্ষিণ, পূর্বপশ্চিম দিকদিগন্ত জুড়ে পৃথিবীব্যাপী প্রাচুর্য্যবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতার ইতিহাসের বীজ বপিত হয়েছে। এই বীজ থেকেই অংকুরোদ্‌গম হয়ে আস্তে আস্তে পরিণত বৃক্ষে পরিণত হবার পর শাখাপ্রশাখার বিস্তার ঘটিয়েছেএভাবেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার আবাস ও উৎপত্তি ঘটেছে।

মূলত অজানা ও অচেনাকে জানাচেনার আগ্রহ থেকেই সভ্যতার সূত্রপাত। মানুষের কর্মজগৎটা বিকশিত হয়েছে ছুটে চলার গতিতে। মানুষের ভ্রমণ বিষয়টার সূত্রপাত ছুটে চলার গতি থেকে। মানুষকে ভ্রমণ পথের সন্ধান দেয়, জ্ঞান দেয়। যদি পথটি কণ্টকাকীর্ণ হয় তাহলে অকারণ রক্তক্ষরণে জীবন নিষ্প্রদীপ অন্ধকারে ডুবে যায়। ভ্রমণসূধা হারিয়ে যায়। তাই ভ্রমণের পথটা পুষ্পাঞ্জলিতে ভরিয়ে দিয়ে লেখক ও পরিব্রাজক ওসমান গনি মনসুর পুষ্প সৌরভে ভর করে পৃথিবী নামক একটি বইয়ের দুই তৃতীয়াংশ পাতা ইতোমধ্যেই উল্টাতে সক্ষম হয়েছেন। লেখক নিজে আপন স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করেছেন ‘পুষ্পের প্রতি আমার দুর্বলতা সে অনেকদিনের। এর সাথে মেলবন্ধন করেছি আজন্ম নেশা দেশভ্রমণ।’ তাই তাঁর পুষ্পিত সৌরভময় ভ্রমণ বৃত্তান্ত গ্রন্থটির নাম ‘পুষ্প পথে পথিক’। ওসমান গনি মনসুরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এত প্রাণপ্রাচুর্য্যের বৈচিত্র্যভরা স্বাদ থরে থরে সাজানো আছে তাতে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, আচারআচরণ, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনধারা, ভাব ও মনোজগতের মিউজিয়াম মূর্ত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির সঞ্চয় সম্ভার সর্বজনীন হয়ে ওঠে। গ্রন্থটির ভূমিকায় একুশে পদকপ্রাপ্ত মঞ্চ, ছোট ও বড় পর্দার দেশবরেণ্য অভিনয় শিল্পী দিলারা জামান যথার্থই লিখেছেন “…..সহজ, সরল সাবলীল ভাষায় রচিত ‘পুষ্প পথে পথিক’ পাঠককে বিশ্বময় উড়তে বসন্ত বাতাসের দোলা দিতে পারে।”

ওসমান গনি মনসুরের সাংবাদিকতা পেশায় সতেজ অবস্থানকাল অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগে থেকেই। তিনি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের সাক্ষী। তাঁর পেশাগত উৎকর্ষের পরিধির পরিসর আন্তর্জাতিক স্তরে উপনীত। তিনি কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট ফোরামের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের শীর্ষপদে আসীন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্র জগতে অদ্যবধি তাঁর বিচরণ ঈর্ষনীয়। সংস্কৃতিচর্চা ও লেখালেখির জগতে বিচরণের মধ্য দিয়ে তাঁর পৃথক স্বাতন্ত্র্য ও সত্তা সুস্পষ্ট। ভ্রমণ তাঁর নেশা এবং এটাই সাহিত্যসাধন ও জ্ঞান অন্বেষণের বাতায়ন। তিনি লেখালেখি করেন তাঁর দেখাদেখির চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে। তাই তাত্ত্বিকতা ও গবেষণার নির্যাসের বাহুল্যতা এড়িয়ে সহজিয়া বোধগম্যতায় নিজেকে প্রকাশ করেছেন অন্তরের উচ্ছ্বসিত আবহে।

তাঁর সহজসরল সাবলীল খোলামেলা কথনটিই লেখ্যভাষ্য; এতে আছে ছুটে চলার গতি ও আকাশে উড়ে চলা পাখির অবলোকন এবং আত্মস্বরের মধুর কলতান। পৃথিবীময় তাঁর এই ভ্রমণ শুধুই পথ বদলের নাম নয়; এটি আত্মার এক নীরব অভিযাত্রা। অচেনা নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে, ভিন্ন ভাষার মানুষের চোখে চোখ রেখে, অজানা সংস্কৃতির স্পর্শে নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক অনির্বচনীয় সুযোগ। প্রতিটি যাত্রা লেখক ওসমান গনি মনসুরকে শিখিয়েছে ক্ষুদ্রতার মাঝেই মহত্ত্ব, আর সীমাবদ্ধতার মাঝেই অসীম সম্ভাবনার পাঠ। লেখক ওসমান গণি মনসুরের এই পথ চলার প্রতিটি ক্ষণ যেনবা একেকটি প্রার্থনার মতো নিঃশব্দ, গভীর ও অশেষ কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ উচ্চারণ। এই মুহূর্তগুলোর কোনোটি উল্লসিত বিস্ময়, কোথাও আছে স্মৃতির পেলব দীর্ঘশ্বাস, বেদনার নীলাভ ছায়াসব মিলিয়ে লেখক একজন বেলা শেষে মায়াময় পুষ্প পথের পথিক।

পুষ্প পথের পথিক’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ৪৬টি গদাংশ ডায়েরীর মতো করে ভিন্ন ভিন্ন পাতায় লিপিবদ্ধ ছিলো। এগুলো কুলোয় তুলে শস্যদানাগুলো আলাদা করে ফসলী জমিতে বপন করার মতই অসাধ্য সাধন করতে হয়েছে ছাপার হরফে প্রকাশ করতে গিয়েএজন্য ওসমান গণি মনসুরের পরিশ্রম অবশ্যই সফল হবে পাঠক যদি নিজেও ‘পুষ্প পথে পথিক’ হয়ে নিজেকে খুঁজে ফিরে পান। ‘পুষ্প পথে পথিক’ গ্রন্থটির প্রচ্ছদকার ধ্রুব এষ নিজেই একজন শিল্পীত ঈশ্বর, অসাধারণ তাঁর শিল্পবুননের কারিকুরী। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ, প্রকাশক : বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম। দাম : ৪৫০ টাকা।

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষায় নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ
পরবর্তী নিবন্ধকীভাবে বইয়ের পাঠক বাড়ানো যায়