মানুষের জীবনকে যথার্থ সৌন্দর্যময় ও সাফল্যমণ্ডিত করে তার নৈতিক মূল্যবোধ। মানুষের জীবনের সাধনা হচ্ছে মনুষ্যত্ব অর্জনের চেষ্টা একটি সমাজে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মূল্যবোধ সৃষ্টিতে, শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজকে যারা শিশু তারাই আগামী দিনের একটি সুন্দর পৃথিবীর কর্ণধার। আর শিক্ষক হচ্ছেন মূল্যবোধ নির্মাণের আদর্শ কারিগর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হল মূল্যবোধ চর্চার একটি কারখানা।
আমরা জানি শিক্ষা একজন মানুষকে ভালো মন্দ বিচার করতে শিখায়। আর এই ভালো মন্দের বিচার মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। মূল্যবোধের অভাবে একটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। আর একজন শিক্ষকই পারেন একজন ছাত্রকে মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে সমাজ তথা রাষ্ট্রকে আলোকিত করতে। আমরা জানি প্রতিটি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার ছাত্রকে বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে তাদের মূল্যবোধের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আর শিক্ষকই শিক্ষার্থীকে তথা জাতিকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে মূল্যবোধের শিক্ষা দিচ্ছেন। আমাদের সমাজে বর্তমানে নৈতিক চরিত্র গঠনের শিক্ষা উপেক্ষিত। তাই সমাজে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে। শিক্ষকের মধ্যেও মূল্যবোধ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়াছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে একজন দক্ষ নাগরিক হয়ে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে তার জন্যও তাদের মধ্যে মূল্যবোধ শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সমাজ বিজ্ঞানী বেসারের মতে, সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সেইসব গুণাবলী যা ব্যক্তি নিজের সহকর্মীদের মধ্যে দেখে খুশি হয়। মানবিক নৈতিকতা ছাড়া শিক্ষা কুশিক্ষার নামান্তর। যা মানুষকে পশুর চেয়েও নিম্নস্তরে নামিয়ে ফেলে। আর মানবিক নৈতিকতাপূর্ণ শিক্ষা মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত রাখে। যে শিক্ষা মানুষকে অন্যের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে না, যে শিক্ষা মানুষকে ভীরু তাকে জয় করতে শিখায় না, যে শিক্ষা মানুষকে জীবনে মরণে আলো দিতে পারে না, যে শিক্ষা ভালোবাসার কবর রচনা করে ঘৃণাকে উস্কে দেয়, যে শিক্ষা নৈতিকতা বিবর্জিত, সে শিক্ষা অবশ্যই বর্জন করা উচিত। ইসলামে মানবিক নৈতিকতা ছড়াা কোনও শিক্ষাই নেই। শিক্ষক ব্যতীত শিক্ষা ও নৈতিকতা উভয় অচল। নৈতিকতা প্রশ্নের শিক্ষকের ভূমিকা মুখ্য। শিক্ষক শিক্ষা নৈতিকতা, এই ত্রিভুজ দিয়েই গড়ে উঠে একটি জাতির সভ্যতার চূড়া। পৃথিবীর সকল সমাজে তিনটি উপাদানই ছিল সভ্যতা গড়ার মূল হাতিয়ার।
এখন আমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে শিক্ষা কী? শিক্ষা বলতে জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা ও প্রয়োগকরণ এই তিনের সমন্বয়কে বুঝায়। একজন মানুষকে বিকশিত করতে সবচেয়ে অপরিহার্য হাতিয়ার হল শিক্ষা। শিক্ষা সৃষ্টিশীল। নতুন নতুন ধারনা ও জ্ঞানের বিকাশে শিক্ষা প্রতিনিয়তই অবদান রেখে যাচ্ছে। মানুষের জীবন ধারণের জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন তেমনি শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষাকে বিশেষণ করলে দেখা যায় জীবনের সুকুমার বৃত্তিগুলিকে স্পর্শ করেছে শিক্ষা।
এখন নৈতিকতা প্রসঙ্গ আমরা বলতে পারি, নৈতিকতা হলো চালক এবং নিয়ন্ত্রক। শিক্ষায় এবং জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নৈতিকতা মানুষের আত্মা বা প্রাণে স্থাপন হয়। আত্মাকে কাজে লাগিয়ে অর্জিত সেই নৈতিকতা মানুষের সব ধরনের সেবা দেয়।
যে নৈতিকতা মানুষকে পশুর চেয়েও নিম্নস্তরের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে সেই নৈতিকতা মানুষের কাম্য হতে পারে না। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে মনুষ্যত্ব ধ্বংসকারী নৈতিকতা সম্বলিত মানুষের প্রাধান্যবিস্তৃত হলে সে সমাজ পশুর সমাজে পরিণত হয়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা রকম বৃত্তিমূলক ও পেশাগত শিক্ষা প্রদান করি বটে কিন্তু ভালো মানুষ হবার যে শিক্ষা, ভালো নাগরিক হবার যে শিক্ষা, তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। অথচ আজকে সমাজে মাদকতা সন্ত্রাস ইত্যাদির কথা চিন্তা করলে এ কথা পরিষ্কার হয়ে উঠে যে, এইসবের বিরুদ্ধে যে অভিযান দরকার তার দায়িত্ব শুধু মা–বাবাকে বা রাষ্ট্রকে দিলেই চলবে না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্ব নিতে হবে এবং নৈতিক শিক্ষাকে আমাদের শিক্ষার একটি অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।












