আজ চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় দিবস : প্রতিষ্ঠার গোড়ার কথা

ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান | শুক্রবার , ৭ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যার কোনো একাডেমিক ভবন নেই, ক্লাসরুম নেই। পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। নেই কোনো ল্যাবরেটরি। এমন একটি পরিস্থিতিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী আসলেন তা দেখবেন বলে। দীর্ঘ স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির পরে একটি অংশগ্রহণমূলক ভোটে নির্বাচিত দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ক্যাম্পাসের খোলা চত্বরে কাঠের চেয়ারে বসে তিনি শুনলেন ভেটেরিনারি শিক্ষার স্বপ্নের কথা। মন্ত্রী, সচিব, প্রাণিসম্পদের ডিজি প্রত্যেকে এই শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরলেন তাঁর সামনে। প্রধানমন্ত্রী ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজের।

দিনটি ছিল ১৯৯৫ সালের ২৮ শে নভেম্বর। স্বতন্ত্র ও সমন্বিত ‘ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন’ ডিগ্রি প্রদানের লক্ষ্যে সেদিন যে যাত্রার সূচনা করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া তা আজ বিশ্ব দরবার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের কৃষিশিক্ষার সূতিকাগার হলো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। শুরু থেকে সেই বিশ্ববিদ্যালয় হতে ভেটেরিনারি সাইন্স ও এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি বিষয়ে পৃথক ডিগ্রি দেওয়া হতো এবং এখনো তাই দেওয়া হচ্ছে। সেই আদিকাল থেকেই ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি নামে দুটি আলাদা ডিগ্রির যৌক্তিকতা নিয়ে অদ্যাবধি বিতর্ক রয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালে শিক্ষা সম্পর্কিত মূল্যায়ন কমিটি এই দুটি অনুষদকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত অনুষদ চালু করার পরামর্শ দেয়। এরপর নানা পরিস্থিতি শেষে ১৯৮২ সালে এনাম কমিটির রিপোর্টেও সমন্বিত ডিগ্রি প্রদানের সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলনে দুই অনুষদের একত্রীকরণে একটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। প্রেক্ষিতে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মরহুম আবদুল্লাহ আল নোমান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল হাজবেন্ড্রিকে একত্রীকরণে ব্যর্থ হয়ে মন্ত্রী মহোদয় সমন্বিত সিলেবাসে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আলাদা কলেজ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এভাবেই শুরু হলো ভেটেরিনারি সাইন্সের নতুন পথচলা। সমন্বিত ডিগ্রি প্রদানের লক্ষ্যে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান চট্টগ্রাম ও সিলেটে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে দিনাজপুর ও বরিশালে আরও দুটি ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ একেবারে বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ে তিনি এই শিক্ষার বিপ্লব ঘটিয়ে দেন।

শুধু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেই থেমে যাননি আবদুল্লাহ আল নোমান। কলেজটির অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল হাজবেন্ড্রিএই দুটি অনুষদের সমন্বয়ে একটি সময়োপযোগী সিলেবাস তৈরি করা। এই জন্য তিনি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একজন দক্ষ ভেটেরিনারিয়ানকে কলেজের অধ্যক্ষ ও কিছু যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ নতুন প্রণীত সিলেবাসে পাঁচ বছরের ডিভিএম (ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন) কোর্সে এক বছরের ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত করেন। তখনও বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে ডিভিএম কোর্সে ইন্টার্নশিপ চালু হয়নি। ইন্টার্নশিপসহ সমন্বিত সিলেবাস এই প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদেরকে অদ্যাবধি অন্যদের তুলনায় অগ্রসর করে রেখেছে।

তৎকালীন মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের দূরদর্শী চিন্তার ফলে অতি দ্রুত সময়ে চট্টগ্রাম ও সিলেটে স্থাপিত সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ দুটি অভীষ্ট লক্ষ্যপানে এগিয়ে যায়। তবে চট্টগ্রামে ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপনে চট্টগ্রাম ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা ছিল অনন্য। মন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন মহল থেকে চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি উত্থাপিত হয়। ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও দৈনিক পূর্বকোণের তৎকালীন চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ইউসুফ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়’ বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। দলমত নির্বিশেষে চট্টগ্রামের শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী সকলেই বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের দাবি জানান। গণমাধ্যমে লেখালেখি এবং বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি; বিশেষ করে মরহুম ইউসুফ চৌধুরী ও মরহুম সাহেদুল আলম কাদেরীর তৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি আরও জোরদার হয়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে এবং মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের বিশেষ অনুরোধে ২০০৪ সালের ১৯ শে এপ্রিল চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভেটেরিনারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ডিও লেটার দিয়ে তাঁর ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রীকে আরো ডিও লেটার দিয়ে অনুরোধ জানান তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী জনাব মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন।

সাফল্যের ধারাবাহিকতা ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আবারও আসলেন এই কলেজে।

দশ বছর আগে যেই কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, এদিন সেটাকেই পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলক উন্মোচন করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে সেই আনন্দঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলেন তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জনাব আবদুল্লাহ আল নোমান, তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জনাব আ... এহছানুল হক মিলন, আজাদীর সম্পাদক জনাব এম.. মালেক, পূর্বকোণের সম্পাদক আলহাজ্ব ইউসুফ চৌধুরী, জনাব সাহেদ কাদেরীসহ অনেকেই।

প্রধানমন্ত্রী ফলক উন্মোচন করলেও প্রশাসনিক কাজ আরও বাকি ছিল। সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মহান জাতীয় সংসদে ২০০৬ সালের ৭ই আগস্ট আইন পাশের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)-এর যাত্রা শুরু হয়।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে চারটি অনুষদের অধীনে রয়েছে ২৩টি বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ, ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদ, ফিশারিজ অনুষদ এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ থেকে প্রদান করা হচ্ছে স্নাতক, এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রি। আর ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট থেকে দেওয়া হচ্ছে মাস্টার্স ইন পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) ডিগ্রি। হাতে কলমে শিক্ষাদানের মাধ্যমে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ঢাকার পূর্বাচলে স্থাপন করা হয়েছে টিচিং অ্যান্ড ট্রেনিং পেট হসপিটাল ও রিসার্চ সেন্টার; কক্সবাজারে স্থাপন করা হয়েছে কোস্টাল বায়োডাইভার্সিটি, মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চ সেন্টার; চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে স্থাপন করা হয়েছে রিসার্চ অ্যান্ড ফার্ম বেইসড ক্যাম্পাস এবং রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভ্রাম্যমান গবেষণা তরী।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চলমান রয়েছে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম। শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ের লক্ষ্যে দেশিবিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়যার শতভাগ শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ করার সুয়োগ পেয়ে থাকে। মজার বিষয় হলোবিদেশী শিক্ষার্থীরাও সিভাসু’তে ইন্টার্নশিপ করতে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া থেকে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেছে।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সিভাসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অবদান রাখছে দেশের ডেইরি, পোল্ট্রি ও মৎস্যখাতের বিকাশে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সফল মন্ত্রী মরহুম আবদুল্লাহ আল নোমানের হাত ধরে বাংলাদেশে এই তিনটি খাত শিল্পে রূপ নিয়েছে। দুধ, ডিম ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই শিল্প। হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান। আর দেশের ডেইরি, পোল্ট্রি ও মৎস্যখাতের বিকাশে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে এই প্রতিষ্ঠান। ৭ই আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান রয়েছে, আমি সকলের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: উপাচার্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২২শে শ্রাবণ স্মরণে
পরবর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা