বাংলা ঋতুচক্রে শ্রাবণ বর্ষার দ্বিতীয় মাস, প্রকৃতির বিষাদের এক সুর, স্মৃতির এক দীর্ঘ অনুরণন এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক। নীল আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা , বৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন ধারা, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ সব মিলিয়ে শ্রাবণ যেন প্রকৃতির নীরব আত্মকথন। কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় এই মাস আরও গভীর অর্থ বহন করে। কারণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ (৭ আগস্ট ১৯৪১) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপময় কায়ার মৃত্যু হলেও তাঁর অমর সৃষ্টিতে তিনি চিরকাল অম্লান। তাই ২২শে শ্রাবণ কবিগুরুর প্রয়াণদিবস মহাকালের পথে অমৃতলোকে অনন্ত যাত্রা করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে একটি জীবন সমাপ্ত হলেও একটি সৃজনশীল সৃষ্টি ও সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিকাশ আরো দীপ্তমান ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার একজন কবিপ্রাণ, তিনি বাংলা ভাষার স্রষ্টা। তাঁর সাহিত্য বাঙালির মানসগঠনের ভিত্তি, মানবতাবাদের দার্শনিক ব্যাখ্যা এবং সৌন্দর্যবোধের সর্বোচ্চ শিল্পরূপ। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চিত্রকলা কিংবা শিক্ষাচিন্তা, কৃষিবিপ্লব ও সমবায় গঠনে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি এমন এক বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেছেন। যা ভাষা, দেশ ও কালের সীমানা অতিক্রম করে মানবসভ্যতার সাহিত্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, তাঁর অন্তত চব্বিশটি গানে সরাসরি ‘শ্রাবণ’ শব্দের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু সংখ্যার হিসাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রাবণ তাঁর সৃষ্টিতে একটি নান্দনিক ও দার্শনিক রূপক। মেঘ, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ, বাতাস, অন্ধকার, প্রতীক্ষা, বিরহ ও বিচ্ছেদ এসবই তাঁর কাছে জীবনের গভীরতম সত্যের প্রতীক।
তাঁর বিখ্যাত গানের লাইন, “ওগো আমার শ্রাবণ মেঘের খেয়া তরীর মাঝি, অশ্রুভরা পূরব হাওয়ায় পাল তুলে দাও আজি।” শুধু একদিকে যেমন বর্ষার গান অন্যদিকে অস্তিত্বের এক অন্তিম অভিযাত্রার কাব্য। এখানে খেয়াতরী নদী পারাপারের বাহন আবার জীবন থেকে অনন্তের দিকে মানুষের চিরন্তন যাত্রার প্রতীকও। পূরব হাওয়ার অশ্রু সিক্ত মানবজীবনের বিরহের কথা ব্যক্ত করে। তিনি জানতেন, জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্য হলো পরিবর্তন। বৃষ্টি যেমন নেমে আসে আবার থেমে যায়, তেমনি মানুষের জীবনও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ক্ষণস্থায়িত্বের মধ্যেই নিহিত থাকে চিরন্তন সত্য মৃত্যু।
তাই তিনি লিখেছেন, “আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে, দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে, ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে।” এখানে ‘ঘর’ বলতে বাসস্থানকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু মানুষের সকল আসক্তি, অহংকার ও পার্থিব বন্ধনে আবদ্ধ এ ঘর নামক বাসস্থান। শ্রাবণ সেই বন্ধন ভাঙার আহ্বান, আত্মমুক্তির আহ্বান, সীমা অতিক্রম করে অসীমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
এই দার্শনিক উপলব্ধিই রবীন্দ্রনাথকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি প্রকৃতির মধ্যে দেখেছেন মানুষের অন্তর্জগতকে। তাঁর কাছে মেঘ মানে উদ্বেগ, বৃষ্টি মানে অশ্রু, বিদ্যুৎ মানে আকস্মিক বোধোদয়, আর শ্রাবণ মানে চিত্তের গভীরতম অনুরণন। যিনি সারাজীবন শ্রাবণকে বিচ্ছেদ, প্রতীক্ষা ও চিরন্তনের ভাষা করে তুলেছিলেন, তিনিই বিদায় নিয়েছেন ২২শে শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা দিনে। ইতিহাসে এটি হয়তো কাকতালীয়, কিন্তু সংস্কৃতির ইতিহাসে এটি এক অসাধারণ প্রতীক, যা রবীন্দ্র–চেতনাকে আরও গভীর অর্থে ব্যাখ্যা করে।
জীবনের অন্তিম সময়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা, সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুরতা এবং মানবসভ্যতার নৈতিক অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর শেষ রচনাগুলো ছিল আত্মজাগরণের। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই মৃত্যুকে অতিক্রম করে। তাই তাঁর দর্শনে মৃত্যু শুধু রূপকায়ার বিনাশ, আবার নতুন এক উত্তরণ।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে বিভাজন, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণতার বিস্তার ঘটছে, তখন রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীর হয়েছে। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন মানুষকে জাতি, ধর্ম কিংবা ভূখণ্ডের সংকীর্ণ পরিচয়ের উর্ধ্বে মানবিক আচরণে উদ্বুদ্ধ হতে। তিনি শিখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তা, নান্দনিকতা, সহমর্মিতা এবং বিশ্বমানবতার দর্শন।
২২শে শ্রাবণ তাই শোক বা স্মরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মসমালোচনা করার অনন্য দিন। আমরা কতটা রবীন্দ্রনাথকে পড়ছি, কতটা বুঝছি, আর কতটা তাঁর মানবিক আদর্শ যাপিত জীবনে ধারণ করছি, তা জানান দেওয়ার অনুপম দিন মনে করি। আজ তাঁর প্রতি কর্ম ও কীর্তির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা ও সম্মানে আনুষ্ঠানিক স্মরণসভাসহ বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা, মুক্তচিন্তার বিকাশ, সংস্কৃতির চর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করার উৎকৃষ্ট সময়। পরিশেষে, তাঁরই শ্রাবণঘন সৃষ্টিতে, ‘সঘন গহন রাত্রি ঝরিছে শ্রাবণধারা, অন্ধ বিভাবরী সঙ্গপরশহারা।’ কিন্তু সত্য হলো, রবীন্দ্রনাথ কখনো সঙ্গপরশহীন ছিলেন না। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন বৃষ্টিভেজা শ্রাবণের বিকেলে কোনো মানুষ রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করবে, যতদিন মানবতা সৌন্দর্যের সন্ধান করবে– ততদিন রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর নেয়, জীবনের কবি হয়ে আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। আমাদের যাপিত জীবনের সাথে সমান্তরালভাবে চলমান কবিসত্তা বিশ্বগুরু রবি ঠাকুর।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও প্রাক্তন এনজিও কর্মী; লংবীচ, ক্যালিফোর্নিয়া












