বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়া গ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম এ. কে. এম. হালিম উল্লাহ চৌধুরী ও মাতার নাম নজিমুন্নেসা। তার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় কাঠগড় গোলাম নবী বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪১ সালে উক্ত বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। তিনি ১৯৪৩ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.কম এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বি.কম পাশ করেন। কর্মজীবনে তিনি কিছুদিন বীমা কোম্পানীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন।
জনাব এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ সমাজকর্মী। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন সমাজকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। পরবর্তীতে তিনি সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম এর সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমৃত্যু তিনি এই এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সন্দ্বীপ এডুকেশন সোসাইটি চট্টগ্রাম এরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি সন্দ্বীপ এডুকেশন সোসাইটি চট্টগ্রাম এর প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫–১৯৬৬ সালে তিনি সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন সংগঠন মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির সাথে তিনি ১৯৪৮ সাল থেকে আমৃত্যু সম্পৃক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সহ–সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির মাধ্যমে চট্টগ্রামে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় মসজিদ জমিয়তুল ফালাহ কমপ্লেক্সের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। জমিয়তুল ফালাহ ট্রাস্টের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সরকার থেকে প্রদত্ত জমির দলিলটিও তার নামে সম্পাদিত। জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্স স্থাপন ও এর উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
জনাব এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাব পাস হওয়ার পর থেকে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ১৯৫২ সালে তমুদ্দুন মসলিশের নেতা হিসেবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি খেলাফতে রব্বানি পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৫৩–১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি খেলাফতে রব্বানি পার্টির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রিয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ১৯৫৮–১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি খেলাফতে রব্বানি পার্টির কেন্দ্রিয় সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগের কেন্দ্রিয় সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ইসলামী ঐক্যজোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
জনাব এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সন্দ্বীপে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সন্দ্বীপ ও সন্দ্বীপের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বিএনপি’র তুমুল জোয়ারের সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপি’র প্রভাবশালী প্রার্থী জনাব এডভোকেট এ. কে. এম. শামসুল হুদা সাহেবকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদ গঠন হওয়ার পর তিনি সন্দ্বীপের প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।
সামাজিক কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে বিভিন্ন সময়ে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তমুদ্দুন মজলিশ এর পক্ষ থেকে তাকে ২০০৬ সালে মাতৃভাষা পদক, চট্টগ্রাম সমিতির পক্ষ থেকে ২০১১ সালে ভাষা সৈনিক হিসেবে সম্মাননা, সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম এর পক্ষ থেকে ১৯৯৯ সালে গুণীজন সংবর্ধনা প্রদান, জমিয়তুল ফালাহ মসল্লি পরিষদের পক্ষ থেকে গুণীজন সংবর্ধনা প্রদান, কার্গিল হাইস্কুল প্রাক্তন ছাত্র–ছাত্রী পরিষদের পক্ষ থেকে গুণীজন সংবর্ধনা –২০০৮ প্রদান, সন্দ্বীপ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম ঢাকা এর পক্ষ থেকে গুণীজন সংবর্ধনা–২০০৯ প্রদান, চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গুণীজন সংবর্ধনা– ২০১১ প্রদান, অধ্যক্ষ আবুল কাশেম সম্মাননা পদক ২০১০, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর পক্ষ থেকে ভাষা সৈনিক হিসেবে একুশে পদক – ২০১১ ও সন্দ্বীপ এডুকেশন সোসাইটি চট্টগ্রাম তাকে ২০১২ সালে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করেন।
জনাব এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী সমসাময়িক বিষয়ের উপরে স্থানীয় জাতীয় পত্র–পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। তিনি মোট ৪টি গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলো হলো– বাংলাদেশের ভাবী অর্থনীতির রূপরেখা (১৯৭২), ভারত বিভক্তি ও বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা (১৯৯৬), সন্দ্বীপ– নোয়াখালী ক্রসবাঁধ প্রকল্প (২০০৫), ইতিহাস সঠিক কথা বলে (২০০৮)।
ব্যক্তিগত জীবনে জনাব এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী এক পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক। তার স্ত্রী জুলেখা খাতুন ১৯৯৫ সালে ইন্তেকাল করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও সুলেখিকা ছিলেন। জনাব এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী ২০১১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ৯:০০ ঘটিকায় চট্টগ্রাম সার্জিস্কোপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। পরদিন জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা শেষে তাকে খান বাহাদুর মাহিদুল্লাহ খাঁর, পাঁচলাইশ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
লেখক: উপ–পরিচালক (প্রশাসন), চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি চট্টগ্রাম।











