
আজ ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ও আলোচিত দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জাতীয় সংকটের মুহূর্তে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় সিপাহী–জনতার ঐক্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘ ১৭ বছর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ৭ই নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি এবং দিবসটির সরকারি ছুটিও বাতিল ছিল। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাংলাদেশের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সরকারি ছুটি পুনর্বহাল হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
আমাদের দায়িত্ব হলো, ৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিপাহী–জনতার ভূমিকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে সত্যনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিবসটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সরকারি ছুটি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেশকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। দেশে চরম এক অনিশ্চয়তার ও সংকটময় প্রেক্ষাপটে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এ দিনের অন্যতম তাৎপর্য ছিল সিপাহী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এবং জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা। জাতীয় সংহতির যে চেতনা এ দিনের সঙ্গে যুক্ত, তা আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক এবং একজন সম্মুখযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং সম্মুখযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের পরিসর সমপ্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর অর্থনীতির ধারণাকে গুরুত্ব দেন। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা বিকাশে তাঁর উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে উভয় ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জনগণের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে দলীয় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্লেষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্যনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।
২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং জনগণের রায়ের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের কাছে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।
কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তামূলক কর্মসূচি, পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারি সেবাকে জনবান্ধব করার উদ্যোগ ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।
তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেগুলোর স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর বাস্তবায়ন। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই হবে নতুন সরকারের সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি।
৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জাতীয় সংকটে বিভাজন নয়, প্রয়োজন ঐক্য ও সংহতি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে আমাদের অভিন্ন অবস্থান থাকা প্রয়োজন।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, স্বাধীন গণমাধ্যম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজনৈতিক দল, সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জাতীয় সংহতি মানে কেবল একটি রাজনৈতিক আদর্শে সবাইকে একমত হওয়া নয়, বরং ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষের পারস্পরিক অধিকারকে সম্মান জানানো। দেশপ্রেমের জায়গায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে, মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং জাতীয় স্বার্থ সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান পাবে।
যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য, শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা, নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিকাশ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও জাতীয় মূল্যবোধের বিকাশে সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
৭ই নভেম্বর কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মৃতিচারণের দিন নয়, এটি জাতীয় সংহতি, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে উপলব্ধি করার দিন।
স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান এবং রাষ্ট্রগঠনের উদ্যোগ স্মরণ করার পাশাপাশি আমাদের দায়িত্ব হলো ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। বিভেদ নয়, জাতীয় ঐক্যই হোক আমাদের অগ্রযাত্রার শক্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এই ঐতিহাসিক দিনে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আসুন, দেশপ্রেম, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সবার আগে বাংলাদেশ।
লেখক : সাংস্কৃতিক সংগঠক; সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর, জাসাস।










