গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনে পাশ্ববর্তী দেশ থেকে ‘উসকানি’ দেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা সবাই যুবলীগ–ছাত্রলীগের নেতা। জগন্নাথ বিশ্ববিদালয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক নিজের ফেসবুকে গর্ব করে স্ট্যাটাস দিয়েছে সে আন্দোলনে আছে। তার মানে এই মদদ আসছে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে। উসকানি আসছে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে। আন্দোলনের নামে উসকানি দিয়ে, গুন্ডা–পান্ডা পাঠিয়ে তারা চেয়েছিল এটাকে ভয়ংকর রূপ দিতে। তারা এই দেশকে শান্তিময় করতে চায় না, স্থিতিশীল করতে চায় না। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরের আলমাস সিনেমা হলের মোড়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি আয়োজিত বর্ণাঢ্য র্যালিপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান রশিদ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, সহ–প্রচার সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন, সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শামসুল আলম, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ–কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু। সঞ্চালনা করেন নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। সমাবেশ শেষে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে র্যালিটি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হয়।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, তারেক রহমান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গরিব মানুষ, হতদরিদ্র মানুষ, প্রান্তিক কৃষক–এদেরকে আমি ভাতা দেব, ফ্যামিলি কার্ড দেব, কৃষক কার্ড দেব’, তিনি ক্ষমতায় আসার একদিন পরই সেই কার্ড দেয়া চালু করলেন। তিনি কথার কোনো বরখেলাপ করেননি। অথচ শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে ২০০৮ সালে বলেছিলেন– ‘ঘরে ঘরে চাকরি দেব, বিনামূল্যে সার দেব’, দিয়েছিলেন? না। শুধু মিথ্যা কথা! শুধু মিথ্যা আশ্বাস! কিন্তু তারেক রহমান এই মিথ্যা আশ্বাস দেয়নি।
তিনি বলেন, দেশ যখন ভালো চলছে, দেশ যখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে উৎপাদন ও উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে, তখন কারা গার্মেন্টসে আন্দোলন করছে? কারা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিচ্ছে? কারা পুলিশের বঙে আগুন দিচ্ছে? কারা আন্দোলনকারীদের ছবি তুলতে গিয়ে পিটিয়ে মেরেছে তৌফিককে? তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে সরকার কথা বলতে প্রস্তুত, কথা বলেছে। তাদের ওয়েজ বোর্ডের ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছে। মূল শ্রমিকরা তো আন্দোলনে নেই! এখন কারা? ঐ যে যারা পলাতক, যারা পার্শ্ববর্তী দেশে গেছে। আর ঐখানেই তাকে বাতাস দেওয়া হচ্ছে। আর সেই বাতাসে বাংলাদেশে তার রেখে যাওয়া গুন্ডাপান্ডা ও সন্ত্রাসীরা গার্মেন্টসে আগুন দিচ্ছে, গার্মেন্টস বন্ধ করছে এবং মানুষ হত্যা করছে। শেখ হাসিনা, এত রক্ত নিয়েছে সে রক্তের স্বাদ সে এখনও ভুলেনি! ভুলেনি বলেই পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়ার পরও তার জিভের মধ্যে রক্তের লালসা।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা দেখেছি, তাদের সেই লুটের শাসন, তাদের সেই দুর্বিনীত দুঃশাসন–বাংলাদেশের ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের টাকা লুট করা, টাকা পাচার করা। চট্টগ্রামেরই একজন এমপি এবং মন্ত্রীর শত মিলিয়ন পাউন্ডের বাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে ইংল্যান্ডের সরকার। সেই লুটের শাসন, ওই যে টাকার মজা–এই মজা পাওয়ার জন্য শেখ হাসিনা আবারও চেষ্টা করছেন সন্ত্রাস করে উসকানি দিয়ে। এইটি আর হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, এদেশের জনগণ আজ ঐক্যবদ্ধ। এদেশের জনগণ আজকে শপথ নিয়েছে–আমরা স্বাধীনতা রক্ষা করব, আমরা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব, আমরা বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে যাত্রা এইটা অব্যাহত রাখব। আর এই চেতনাই হচ্ছে ৭ নভেম্বরের চেতনা। এই চেতনাই আমাদেরকে শক্তি দেয়, আমাদেরকে সাহস দেয়। আমরা যে কোনো আগ্রাসী শক্তি, যেকোনো আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তার স্থানীয় এজেন্টদেরকে প্রতিহত করতে আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাব।
রুহুল কবির রিজভী বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস কী? বিপ্লব ও সংহতি দিবস আপনার গলা ছেড়ে কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। যেকোনো রাজনৈতিক দল করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। এগুলো সেদিন কেন নিশ্চিত হলো? তার আগে একটি সরকার ছিল ৭২–৭৫–এ। তারা একসময় গণতন্ত্রের কথা বলেছে পাকিস্তান আমলে। কথায় বলে, নির্বাচনে জিতেছিল, পাকিস্তান তাদের সেই গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়নি। তারপর সেটি স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ লাভ করে। এদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তারপর তারা ক্ষমতায় আসলো। নাম কী হয়ে গেল? আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের কথা বলে ৭৫–এর ২৫ শে জানুয়ারি গণতন্ত্রকে হত্যা করল, সমস্ত গণতন্ত্রের তথা রাজনীতি করার অধিকার হত্যা করল, কথা বলার স্বাধীনতা হত্যা করল এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হত্যা করল।
তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে সেদিন যারা ক্ষমতায় আসলো তারা কারা? এই আওয়ামী লীগের লোক! এই আওয়ামী লীগের মোশতাক আহমেদ, টাঙ্গাইলের লতিফুর রহমান, মইনুল তালুকদার–এরা সব ৭৫–এর ১৫ আগস্টের আগের রাত্রি পর্যন্ত শেখ মুজিবের ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন। এভাবে ৮৩ দিন চলল। তারপর আবার দেখলাম একটি ক্যু করা হলো ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। একদিকে ক্যু হচ্ছে, অন্যদিকে তার মেয়ে শেখ মুজিবের ছবি নিয়ে মিছিল করছে। জনগণ ভাবল, আবার বোধহয় বাকশাল! আবার বোধহয় একদল! সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে আবারও তিলে তিলে হত্যা করা হবে। মানুষ আতঙ্কের মধ্যে থাকল। জনজীবনে নেমে আসলো এক চরম রুদ্ধকর পরিস্থিতি।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ মানুষ, আর ক্যান্টনমেন্ট থেকে সিপাহীরা বেরিয়ে আসলো রাস্তায়। দু’জনের মিলিত স্রোতে রাজপথে তৈরি হলো এক বিপুল স্রোত। আর সেই স্রোতে আওয়ামী দুঃশাসন এবং তাদের প্রভুদের চক্রান্ত ছিন্ন করে আবার তৈরি হলো গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস। মানুষ তার শ্বাস ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল। রাষ্ট্রক্ষমতার পদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই ঘোষণাদাতা মহানায়ক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, এটাই হচ্ছে ৭ই নভেম্বরের চেতনা।
রিজভী বলেন, যখনই বাংলাদেশের ওপর গণতন্ত্র হত্যা হয়েছে, ছাত্র–জনতা এই ৭ নভেম্বরের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেটিকে পরাজিত করেছে। স্বৈরাচার এরশাদকে পরাজিত করেছে। আবার ঠিক ১৭ বছরের শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনার সেই ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে চব্বিশের জুলাইয়ের বিপ্লব তৈরি করেছে ছাত্র–জনতা। তার পেছনেও ছিল ৭ নভেম্বরের চেতনা।
মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রত্যয়ে দেশপ্রেমিক সৈনিক ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ঐতিহাসিক এই দিবসের চেতনা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, এমনকি দিবসটির সাধারণ ছুটিও বাতিল করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানও প্রমাণ করেছে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে কোনো স্বৈরাচার টিকে থাকতে পারে না।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঘোষিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে তাঁর গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি এখনো অনুসরণযোগ্য। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি–জনতার বিপ্লব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের নতুন বার্তা দিয়েছিল। চার দিন বন্দিদশায় থাকার পর মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর সেই ঐক্যের আহ্বান আজও প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার আন্দোলনও প্রমাণ করেছে, দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় জনগণের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান রশিদ বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ৭ নভেম্বরের চেতনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের আদর্শ ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতির চেতনা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোনো ষড়যন্ত্রই দেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে পারবে না। ভবিষ্যতেও সব ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।











