চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক | শুক্রবার , ৬ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছি সরকারি মহসিন কলেজ থেকে। সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বর ৭৩৩। এরপরেই নতুন যুদ্ধ শুরু। ভর্তি পরীক্ষার তোড়জোড়। তৎকালীন স্বনামধন্য কোচিং সেন্টার রেটিনাতে ভর্তি হয়ে গেলাম ঝটপট। জামালখানস্থ শাহ্‌ ওয়ালিউল্লাহ ইনস্টিটিউশনে রেটিনা কোচিং সেন্টারের ক্লাস করাতেন শিক্ষকেরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সিনিয়র মেধাবী ছাত্ররা ক্লাস নিতেন। তন্মধ্যে ডাঃ আতাউল হক ওসমানী (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) অন্যতম। ওসমানী ভাইয়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে আজ। অত্যন্ত গোছালোভাবে পড়াতেন তিনি। রেটিনা গাইডের পুরোটাই মুখস্ত করতে শুরু করি। এক পর্যায়ে মোটামুটি তা রপ্ত করেই ফেললাম। এলো সেই মাহেদ্রক্ষণ। আমার পাশেই নুরুল আলম (প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ) এর আসন ছিল। লিখিত পরীক্ষাটা কোনমতে সেরে ফেললাম। মোটামুটি ভালোই হল পরীক্ষা। এর কয়েকদিন পরেই মৌখিক পরীক্ষা। চট্টগ্রামের তৎকালীন কয়েকজন প্রথিতযশা শিক্ষক পরীক্ষা নিয়েছিলেন। তন্মধ্যে খুব বেশি মনে পড়ছে প্রফেসর ডাঃ ফজলুল কাদের চৌধুরী স্যারের কথা। তিনি রেটিনা গাইড থেকে সব কিছু প্রশ্ন করলেন এবং আমি তা আল্লাহর অশেষ রহমতে সঠিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। রেজাল্ট প্রকাশ হতে অনেক দেরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম গ্রামের বাড়িতে। যেদিন ভর্তি পরীক্ষা সেদিন সকালে আমাদের মাটির ঘরের ভেতর সোফায় বসে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দুলাভাই আবু বকর চৌধুরী (মানিক) বাড়ির পেছন দিয়ে শোরগোল করতে করতে আমার রুমের দিকে আসতে থাকেন। ফারুক কই? ফারুক কই? এ কথা বলতে বলতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। আর তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আর পড়তে হবে না, হয়ে গেছে, হয়ে গেছে’। হাতে ছিল দৈনিক বাংলা পত্রিকাটি। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় উনি সুদূর চট্টগ্রাম ওনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পেপার আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ছুটে আসলেন আমাদের বাড়িতে। অসম্ভব এক আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরে গেল হৃদয়। সাথে সাথে আমার বৃদ্ধ পিতাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। আমার এই পাশের খবর শুনে বলেছিলেন, ‘আমি না দোয়া করেছি তোমার জন্য’–এ কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমার হৃদয়পটে জড়িয়ে থাকবে। পেছনের পুকুরে আমি লাফ দিলাম আনন্দের আতিশয্যে– এর আগে পদার্থবিদ্যার বইটি একটু অদূরে ছুঁড়ে ফেললাম। মহান রবের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। তিনি আমাকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। বাড়ির আঙ্গিনায় চাচাতো ভাই–বোনদের জটলা, পাড়ার মানুষদের যাতায়াত–আমার এই খুশির খবর শুনে। এ যেন আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতনই। যথারীতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার দূর্নিবার আশায় ছুটে চললাম শহরপানে সেজো ভাই আবুল কাশেম চৌধুরীর সাথে। মেডিকেল প্রধান ফটকে ঢুকতেই দেখা মিললো আমাদের এলাকারই এক বড় ভাই ডাঃ আব্দুল মোত্তালিবের সাথে (যিনি চমেক ছাত্র সংসদের দু’ দু’বার নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন) সেজো ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছো’? তিনি বললেন, আমার ছোট ভাইকে ভর্তি করাতে। তিনি মৃদু হেসে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। ভর্তির কার্যক্রম সম্পন্ন করে আবারও ছুটে চললাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। এখনও মনে পড়ে ১৪০০ টাকার মতন ভর্তি ফি লেগেছিল। বড় ভাই জনাব আবু তাহের চৌধুরীর খুব আশা ছিল ডাক্তার হওয়ার কিন্তু সেই স্বপ্ন তাঁর পূরণ হল না। তিনি যেন আমার মাঝে তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সরেজমিনে দেখতে পেলেন। এরপর শুরু হল মেডিকেলের ছাত্র জীবনের অধ্যায়। সাদা এ্যাপ্রন পরে ক্লাসে ছুটাছুটি। আইটেম দেওয়ার প্রচন্ড প্রতিযোগিতা। পূর্ণেন্দু বিকাশ সাহা স্যার অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের শিক্ষক ছিলেন। সানাউল্লাহ শেলী স্যারও আমাদের এনাটমি পড়াতেন। আমি বি ব্যাচের ছাত্র ছিলাম। রোল নং ছিল ৬৩। বন্ধু সিরাজী আমরা একই রুমে থাকতাম। সিরাজী আবার মাদ্রাসার ব্যাকগ্রাউন্ড। ফিজিওলজি পড়াতেন প্রফেসর জমির উদ্দিন স্যার। চাটগাঁইয়া ভাষায় তিনি ক্লাস নিতেন আর বিভিন্ন হাস্যরসের গল্প–গুজবে মাতিয়ে রাখতেন ক্লাস। ক্লাসে দেরি করে আসলে কিংবা পারস্পরিক কথোপকথনের সময় প্রচন্ড রেগে যেতেন। একাডেমিক কথার চেয়ে অন্য বিষয় নিয়ে বেশি কথা বলতে পছন্দ করতেন স্যার। যদিও আমরা বেশ আনন্দ পেতাম স্যারের কথাবার্তায়। প্রফেসর ফারুক আহমেদ স্যার–তিনি আমাদের এনাটমি টিউটোরিয়াল ও লেকচার নিতেন। স্যারও ভালো পড়াতেন। প্রফেসর মমতাজ ম্যাডাম–তিনিও আমাদের এনাটমি ক্লাস নিতেন। বায়োকেমিস্ট্রি পড়াতেন মোশাররফ স্যার। স্যার ছিলেন খুব গুরুগম্ভীর– খুব ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হই। পরের টার্মে ভালো পড়াশোনা করে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হই। শুরু থেকেই চট্টেশ্বরী রোডস্থ প্রধান ছাত্রাবাসে থাকতাম। যেহেতু হোস্টেল জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতা খুবই পুরানো। মেডিকেল হোস্টেল জীবন খুব সহজেই নিজের সাথে মেনে নিয়েছি। সাজ সাজ রব আমাদের খাবারের মেসে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় হোস্টেল বন্ধ থাকতো। সে ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতাম। দলিলাবাদ গ্রামের পিছিয়ে পড়া কিশোর–যুবাদের নিয়ে গঠন করেছিলাম সূর্যশিখা ক্লাব। বেশকিছু সামাজিক কাজ আমরা সম্পন্ন করেছিলাম কিন্তু বেশিদিন টিকেনি এই সামাজিক সংস্থাটি। এরই মাঝে ১৯৮৭ সালের ৯ আগষ্ট আমরা ক’জনা মিলে গঠন করেছিলাম মার্শাল ড্রাগন–পরবর্তীতে যার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে রাউজান ক্লাব। আলহামদুলিল্লাহ এ ক্লাবের অভিযাত্রা এখনও চলমান। অগুণতি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত আজ এই প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজারও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে আসছে। প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় আবারও ছন্দপতন। এরই মাঝে বিভিন্ন পত্রিকায় ছড়া, কবিতা লেখার নেশায় বুঁদ হয়ে পড়লাম। সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার মানসে এ অদম্য আয়োজন। আঞ্চলিক পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোণের মেডিকেল প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছি অনেক বছর। পাশাপাশি সাপ্তাহিক প্রহর পত্রিকার প্রতিবেদক ছিলাম। নিয়মিত ছড়া, কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণ, নয়াবাংলা, ইনকিলাব, মিল্লাত, সংগ্রাম সহ অনেক সংবাদপত্রে। প্রকাশিত লেখা দেখে উচ্ছ্বসিত হতাম এবং আরও বেশি লেখার আগ্রহ সৃষ্টি হত নিজের মাঝে। মেডিকেল কলেজের সাহিত্য সংগঠন দর্পণ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলাম। আবার মেডিকেল কলেজ সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলাম অনেক বছর। ভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাহিত্য সাময়িকীতে বরাবরই আমার লেখা স্থান পেত। মনে পড়ে সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা। ১৯৮৬ সালের ঘটনা। এরশাদ সরকারের আমলে জাতীয় ছাত্র সমাজের প্রভাব ছিল আমাদের মেডিকেল কলেজে অনেক বেশি। অপরদিকে ছাত্রলীগের দাপট ছিল তুঙ্গে। এ দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অনেক ছাত্র আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ছাত্রাবাস বন্ধ ছিল প্রায় ৩ মাসের অধিক। এভাবে মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল রুটিন মাফিক। তৃতীয় বর্ষে ছাত্র থাকাকালীন আরেকটি ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোন হতাহত হয়নি। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির কারণে একাডেমিক ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়েছিলাম। অবশ্য পরীক্ষা আসলে তৎপর হয়ে তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। প্রিয় বন্ধু ইসমাঈল, মালেক, সিরাজী, রাজ্জাক, কলিমুল্লাহ (আফ্রিকা প্রবাসী), আব্দুল মালেক (লন্ডন প্রবাসী)- ওদের কথা আজ বেশি মনে পড়ছে। মেডিকেল জীবনে অনেক মধুময় স্মৃতি এখনও নিজের অজান্তে নষ্টালজিয়ায় ফেলে দেয়। যেন মনে হয় আবারও ফিরে যাই সেই ছাত্র জীবনে–যেখানে ছিল না কোন সাংসারিক জীবনের ব্যস্ততা। যে হোস্টেল জীবন ছিল চমৎকার এক স্বাচ্ছন্দ্যময়। এক বন্ধু ফয়সাল লন্ডনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর মেহমান হয়েছেন। কুলসুমও চলে গেছে না ফেরার দেশে। প্রথম বর্ষে থাকাবস্থায় রাজু নামের সেই ছেলেটির আর কোন হদিস নেই। জাবিরও চলে গেছে পরপারে। তাদের আত্নার মাগফেরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহতায়ালা তাদের জান্নাতবাসী করুন। আমিন।

লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, অধ্যাপক (ইএনটি)-অবসরপ্রাপ্ত, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ

পূর্ববর্তী নিবন্ধজীবন, দেশ ও সমাজ সবকিছুর মূলে রয়েছে রাজনীতির চরিত্র
পরবর্তী নিবন্ধশৈশবের ভ্রমণ, ভবিষ্যতের পর্যটন : ভ্রমণে গড়ে উঠুক সচেতন, মানবিক ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম