ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে কাপড়ের রোলের দোকান, মার্কেটের ফ্লোরে গুদাম

টেরীবাজারের মার্কেটগুলোতে অগ্নিঝুঁকি । সমিতির নেতা বললেন অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম আছে, ফায়ার সার্ভিস বলছে নেই । অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে নোটিশ, প্রয়োজনে অভিযানের পরিকল্পনা

জাহেদুল কবির | শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

বৈদ্যুতিক খুঁটিতে নানা ধরনের তারের জঞ্জাল। অনেক সময় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুনের ফুলকি এসে পড়ে এসব তারে। ফলে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। এই আগুনের শিখা মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। নগরীর টেরীবাজারের আওতাধীন বেশির ভাগ মার্কেটের প্রবেশমুখগুলো সরু। এছাড়া মার্কেটের ভবনগুলোতে জরুরি বের হওয়ার সিঁড়ি নেই। ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে গড়ে তোলা হয়েছে কাপড়ের রোলের দোকান। এছাড়া মার্কেটের বিভিন্ন ফ্লোরে রয়েছে কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যের গুদাম।

২০১৯ সালে চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস নগরীর ২৯টি মার্কেটকে অগ্নিঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে মার্কেটের প্রবেশমুখে ‘অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট’ লেখা ব্যানার সাঁটিয়েছিল। সেই তালিকায় রয়েছে টেরীবাজারও। তবে এত বছর পেরিয়ে গেলেও টেরীবাজারের অধীন বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীত মৌসুম আসছে। সাধারণত শীতে আবহাওয়া শুষ্ক থাকার কারণে আগুনের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস বলছে, দেশে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে অগ্নিদুর্ঘটনার হার বাড়ে। ফলে টেরীবাজারের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বড়সড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।

জানা গেছে, বর্তমানে টেরীবাজারে মার্কেট রয়েছে ৯৩টি। এসব মার্কেটের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী রয়েছেন ২ হাজার ৩৮৫ জন। মার্কেটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তাবাচ্ছুম ম্যানসন, দিলোয়ারা ম্যানসন, বিজলী ম্যানসন, রহমান ম্যানসন, হাজী প্লাজা, বদরউদ্দিন মার্কেট, হাজী দুদু মিয়া মর্কেট, ও আর প্লাজা, চট্টল শপিং, সখিরন প্লাজা, এসবি ঘোষ মার্কেট, মাস্টার মার্কেট, ইমাম ম্যানসন, বিচিত্রা বিপণী, জহুর ম্যানসন, জেমা শপিং, জেএস প্লাজা, সিটি টাওয়ার, শুভ্রা টাওয়ার, জহুর আর্কেড, হোসাইন ম্যানসন, জিলানী কমপ্লেক্স, নতুন মার্কেট (কাটা পাহাড়), কালামিয়া ম্যানসন, খদিজা ম্যানসন, এমদাদ ম্যানসন, হাজী রমজু মিয়া ম্যানসন, আরব শপিং, আব্দুল্লাহ ম্যানসন, ইব্রাহিম ম্যানসন, এএইচ ম্যানসন, পরিচয় শপিং সেন্টার, কাজী ম্যানসন, মোহাদ্দেস মার্কেট, হাজী ছালেহ আহমদ কমপ্লেক্স, টেরীবাজার বিপণী, আলিফ শপিং সেন্টার, আমিন ম্যানসন, মেইন রোড, আফিমের গলি, এসকে টাওয়ার, সরকার বিতান, রয়েল প্লাজা, ইসলাম সুপার মার্কেট, ছোবহানিয়া মার্কেট, মমতাজ ছফুরা মার্কেট, গুলফাম টাওয়ার, জেসি প্লাজা, বিএম প্লাজা, শাহ আমানত টাওয়ার, মল্লিকা শপিং, চেয়ারম্যান ম্যানসন, ছমদিয়া মার্কেট, জনতা মার্কেট (বদর পুকুরপাড়), জনতা মার্কেট বাইলেন, শাহবাগ মার্কেট/এনএস ম্যানসন, জনতা মার্কেট, গাউছিয়া ম্যানসন, মক্কা প্লাজা/আক্তার প্লাজা, আমিন ম্যানসন, হালিমা সুপার মার্কেট, সওদাগর টাওয়ার, শাহ আমানত মার্কেট, এ কবির মার্কেট, খাজা মার্কেট, আঞ্জুমান চেম্বার, দোস্ত মো. মার্কেট, জিএম প্লাজা, ইকবাল মার্কেট, সিয়াম ম্যানসন, নুর মো. মার্কেট, দিলারা ম্যানসন, মোস্তাফিজ প্লাজা, হাজী ম্যানসন, নাহার ম্যানসন, নতুন রাস্তা, মা ম্যানসন, ডিডি আর্কেড (নালার পাড়), জেকে টাওয়ার, কুঞ্জু ম্যানসন, আনোয়ারা ম্যানসন, থ্রি স্টার মার্কেট, কেবি সরকার বিতান, রঘুনাথ বাড়ি বাই লেন, মদিনা ম্যানসন, সৈয়দ আহমদ মার্কেট, বিসমিল্লাহ মার্কেট, আরএফ প্লাজা, এএন টাওয়ার, হোসাইন প্লাজা, নিউ ইকবাল মার্কেট, কুঞ্জুমোহন লাল মার্কেট, আরএন প্লাজা, আমান আলী টাওয়ার, ওরিয়েন্ট টাওয়ার, ফয়েজ আলী সিটি সেন্টার, সুপার মার্কেট, অর্কিড প্লাজা ও কেএমসি টাওয়ার।

এসব মার্কেটের মধ্যে হাজী প্লাজার আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে কাপড়ের রোলের দোকান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব দোকানে অগ্নিকাণ্ড হলে অগ্নিনির্বাপণে বেগ পেতে হবে। এছাড়া মার্কেটের বিভিন্ন ফ্লোরে রয়েছে পণ্যের গুদাম। এসব গুদামের প্রবেশমুখও সরু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিনিরাপত্তায় দেশের নাগরিকরা বেশি সচেতন নন। ফলে অগ্নিদুর্ঘটনায় আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও খুব বেশি হয়। প্রায় আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক ভবন আইন মেনে নির্মিত হচ্ছে না। গলিগুলো সরু। এসব সরু গলিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ অসম্ভব। এছাড়া পুকুর কিংবা জলাধার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড হলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে কিছু করার থাকবে না। তাই অগ্নিনিরাপত্তা আইন মেনে প্রত্যেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখতে হবে। পাশাপাশি আগুন নেভাতে শপিং সেন্টারগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকা, জরুরি প্রস্থানের সিঁড়ির সংখ্যা ও ছয়তলার ওপরে প্রতি তলায় সেফটি লবির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে বৈদ্যুতিক তারে কনসিল ওয়্যারিং থাকা, বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ বক্স ও ডিমান্ড বক্স নিরাপদ অবস্থানে থাকা এবং স্মোক ও হিট ডিটেক্টর রাখা এবং অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে হবে।

টেরীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান আজাদীকে বলেন, আমাদের মার্কেটগুলোর সামনে, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্যাবলের জঞ্জাল রয়েছে। সেইসব ক্যাবল সুশৃক্সখলভাবে এটি কাভারের মাধ্যমে নিয়ে আসব। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং ক্যাবল অপারেটরদের সাথে কথা বলব। তবে আমাদের মার্কেটগুলো সেই অর্থে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ বলে আমি মনে করি না। মার্কেটের আশপাশে সড়ক থাকার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে প্রবেশ করতে পারবে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের কাছে অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামও রয়েছে।

তবে নন্দনকানন ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. মাসুদ রানা আজাদীকে বলেন, টেরীবাজারের বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর কাছে ফায়ার লাইসেন্স ও ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মতো অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। টেরীবাজার আমাদের তালিকাভুক্ত অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট। এক সপ্তাহ আগে ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নেওয়া ও অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনার জন্য নোটিশের মাধ্যমে জানিয়েছি। সামনে আবারও তাদের নোটিশ করব। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযানের চিন্তাভাবনা আছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআজ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস