সুফী সাধক সৈয়দ দেলওয়ার হোসেন মাইজভাণ্ডারী : জীবন ও কর্ম

নীলুফার শামসুদ্দিন | সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

আজ বহুবছর ধরে লিখছি। কিন্তু কখনও অলি বুজর্গ ও দরবেশ নিয়ে লিখিনি। যদিও ছোটবেলা হতেই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসাবে তাদের প্রতি রয়েছে আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। হঠাৎ সেদিন স্বপ্নে দেখলাম “আমি বড় হুজুর শাহ্‌্‌সুফী হযরত আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর মাজার জিয়ারত করছি। অথচ আমি সৈয়দ ‘দেলওয়ার হোসেনের মাজার খুঁজে পাচ্ছি না।’ এ স্বপ্ন দেখার পর আমার মনে হলো আল্লাহর এ নির্দেশ মান্য করতে আমাকে মাইজভাণ্ডার ফটিকছড়িতে যেতে হবে। চাচাতো ভাই এজাজুলকে মাইজভাণ্ডার যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে সে আমাকে হতবাক করে দিয়ে এক বাক্যে রাজী হয়ে যায়। নির্দিষ্ট দিনে আমার সার্বিক সুবিধার জন্য সে তার স্ত্রী ও ছেলেকে পাঠায়। প্রত্যেক ভাল কাজের পুরস্কার আল্লাহ দিয়ে থাকেন তাদের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হবে না এটাই আমার বিশ্বাস।

স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মাইজভাণ্ডার গেলাম। সত্যি সত্যি বড় হুজুরের মাজার জিয়ারত করার পর সৈয়দ দেলওয়ার হোসেনের মাজার খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একজন ভদ্রলোক হতে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সে এমন এক উদ্ভট কথা বললো তাতে আমি আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না। সে বললো এইতো কিছুদিন আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তার এখনও মাজার হয়নি। আমি তার কথা বিশ্বাস করেছি তেমনটি নয়। সৈয়দ গোলাম রহমানের মাজার জিয়ারতের পর আমরা হযরত জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করি। কিছুদূর যাবার পর তাঁর মাজারের পাশে বিস্তৃত উদ্যানে গিয়ে উপস্থিত হই। আমাদের পাদুকা জমা দিতে গেলে সেখানে দেখতে পেলাম একটি সাইনবোর্ড লিখা রয়েছে “এখানে কোন টাকা পয়সা জমা দেবেন না।” কিছুদূর এগুতেই দেখতে পাই প্রখর সূর্যের আলোর প্রভায় নতুন নির্মিত মাজারটিকে মনে হচ্ছিল অপূর্ব সুন্দর এক দর্শনীয় স্থাপনা। না এলে না দেখলে এই অপার সৌন্দর্য মহিমা দেখা হতে বঞ্চিত হতাম। মাজারের বিরাট বিরাট দেয়ালগুলি সাদা ও সোনালী খোপখোপ কারুকাজের সমন্বয়ে নির্মিত স্থাপত্য শিল্পের যেন এক সূক্ষ্ম নিপুণ প্রকাশ। মনে হলো এটি পৃথিবীর অন্য কোন মাজারের স্থাপত্য শিল্প স্থাপনাকে পেছনে ফেলে দিতে পারবে। আমাকে আশ্চর্য করে দেবার আরও কিছু অপেক্ষা করছিল। জিয়ারত করবার উদ্দেশ্যে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পেলাম আকাশ থেকে যেন এক ঝালর বাতি নেমে এসেছে। কারণ এটি স্থাপন করা হয়েছিল অনেক উপর থেকে যেহেতু এটি একটি লম্বা ঝালর বাতি ছিল। এত লম্বা ঝালর বাতি আমি জীবনে আর কখনও দেখিনি।

আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম সৈয়দ দেলওয়ার হোসেনের মাজার খুঁজে পাচ্ছিলাম না এবং বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলাম “হে আল্লাহ উনার কবরের উপরে যদি কোন সৌধনা থেকে তারপরও আমি খাস মাটিতে বসে বিনয়ের সাথে জিয়ারত করবো। উনার কবরটা আমি দেখতে চাই, উনার নিকট আমি যেতে চাই। তাই আমার ভাইয়ের ছেলেকে উনার মাজার কোথায় জানতে চাইলে সে বললে এই যে আমার ডান পার্শ্বের স্টেটের ভিতেরই উনার মাজার। গেইটের ভেতর দিয়ে ঢুকতেই দেখতে পেলাম বিরাট এক কবরস্থান। যেখানে শায়িত রয়েছেন তিনি। পাশে উনার স্ত্রী এবং উনার ছেলে মেয়েরা। বিভিন্ন রং বাঁধানো পাকা কবরগুলো ফুলে ফুলে শোভিত। উনি সবসময় মানুষের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে ভাবতেন। তাই তাঁর মাজারে জিয়ারত করতে আসা ভক্তদের যাতে কোন অসুবিধা না হয় তার জন্য তিনি একপাশে একটি খোলা পাকা ছাউনী তৈরী করছেন। যার সম্মুখ ভাগ ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। এতে করে বৃষ্টি বাদলে ও রোদে পুড়ে কাউকে কষ্ট পেয়ে আর মাজার জিয়ারত করতে হবে না। আমি খাদেমের নিকট অজিফা চাইলে তিনি আমাকে স্থান দেখিয়ে দেন। দেখতে পাই থরে থরে কোরআন ও অজিফা সাজানো রয়েছে। আমি অজিফা নিতে নিতে দেখতে পাই তিনি ইতোমধ্যে তকতকে ঝকঝকে মেঝের উপর সুন্দর একটি জায়নামাজ পাতিয়ে দিয়েছেন। এই সম্মান প্রদর্শনে মনে হল এটা আল্লাহর মহিমার একটি অংশ। কোথায় আমি ভেবেছিলাম ঘাসের উপর বসে জিয়ারত করবো সেখানে আমাকে দেওয়া হলো ভেলভেটের একটি জায়নামাজ। তিনি আমাকে বললেন “আমার মনে হয় আপনি এনাদেরই বংশধর এই কথা শুনে আমি আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠি। এই সাদর অভ্যর্থনা বাক্যে। খাদেম হুজুর আমার নাম জানে না আমার বাবাকে কেউ চিনেন না। আল্লাহ মানুষের অন্তর্নিহিত মনোভাব জানেন এবং একমাত্র তিনিই মনের আশা পূরণ করেন। ফিরে আসার সময় হুজুর আমার হাতে একটি মাইজভাণ্ডারের ম্যাগাজিন ও কয়েকটি লিফলেট দিলেন। এগুলো পাবার পর মনে হলো এখন আমার দায়িত্ব দেলওয়ার হোসেন মাইজভাণ্ডারীকে নিয়ে কিছু লিখা। এগুলোতে তার জীবন সম্বন্ধে তেমন কোন তথ্য উপাত্ত ছিল না। পাঠক নিম্নোক্ত তথ্যগুলো গুগল হতে সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি।

সৈয়দ দেলওয়ার হোসেনের পূর্ব পুরুষগণ মদিনা হতে বাগদাদ আসেন। পরবর্তীতে মুগল সম্রাটের আমন্ত্রণে তারা ভারতবর্ষে আসেন। কালের প্রবাহে তারা বাস পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের পটিয়ায় স্থান গড়েন। সেখান থেকে তারা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় মাইজভাণ্ডার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত শাহসুফী বড় হুজুর এই মাইজভাণ্ডার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। উনার পিতার নাম মতিউল্লাহ। এবং মাতার নাম সৈয়দুন্নেছা। হযরত আহমদুল্লাহর স্ত্রীর নাম লুৎফুন্নেছা। হযরত শাহ সুফী সৈয়দ ফয়জুল হক হযরত আহমদুল্লাহর পুত্র। সৈয়দ ফয়জুল হকের স্ত্রীর নাম ওয়াজেদা বেগম। তাদের ঘরেই জন্ম নেন সৈয়দ দেলওয়ার হোসেন ২৭ শে ফেব্রুয়ারি ১৮৯০ খৃ. ফটিকছড়ি মাইজভাণ্ডার শরীফে।

হযরত দেলওয়ার হোসেন ছিলেন বড় হুজুর হযরত আহমদুল্লার অত্যন্ত প্রিয় নাতি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দাদার তত্ত্বাবধানে শিক্ষা শুরু করেন। শৈশব পিতা মাতা হারিয়ে দাদার স্নেহে লালিত পালিত হয়ে শৈশবেই তিনি তার জীবনের ভিত গড়েন। তিনি মৌলানা ও হাফেজকারীদের নিকট আরবী ফারসী উর্দ্দু ও ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। তাঁর দাদা তাকে আদর করে দেলা ময়না বলে ডাকতেন। তাঁর দাদা তাঁর আসল নাম রেখেছিলেন দেলওয়ার হোসেন। দেলওয়ারের অর্থ হলো যোদ্ধা বা সেনাপাতি এবং হোসেন শব্দের অর্থ হলো উত্তম। তার নামের সামগ্রিক অর্থটি হলো উত্তম সেনাপতি। তিনি দাদাকে কতটুকু ভালোবাসতেন তা তার নিম্নোক্ত কথা হতেই অনুধাবন করা যায়। তিনি বলতেন আমাদের দুজনকে দুই ভেবো না। আমার নামে কোন ওরছ বা ফাতেহা দিবে না।

তিনি সাজেদা খাতুনকে বিয়ে করেন। সাজেদা খাতুন ছিলেন সুফী সাধক মৌলানা বাবা ভাণ্ডারী গোলাম রহমানের কন্যা। উনার জীবনী সূত্রে জানা যায় তাঁর পাঁচ পুত্র ও ছয় মেয়ে ছিল। তার বড় ছেলে জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারের সুফী সাধক হিসাবে পরিচিত লাভ করেন। সৈয়দ দেলওয়ার হোসেন মাইজভাণ্ডারীর পীর হলেন হযরত সৈয়দ আমিনুল হক ওয়াসেল।

তিনি নিজেকে গরীবের বন্ধু বলে অভিহিত করতেন। যার কারণে তাঁর কবরের উপরে কোন সৌধ নির্মাণ করা হয়নি। এবং তা তিনি করতে নিষেধ করে গেছেন। তিনি এতটাই সহজ সরল জীবন যাপন করতেন যে তিনি কখনও খাটের উপর ঘুমাননি। তিনি কখনও কারও সামনে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি।

সমাজে প্রচলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও সুন্দর সমাজ গঠনে তিনি দুর্দান্ত সাহসী লেখক। রসুলুল্লাহ সঃ এর আদর্শ চরিত্রের সুন্নাহ প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন অকুতোভয়। তিনি মাইজভাণ্ডারী তরিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তৎমধ্যে ‘বেলায়েত মোতালাকা’ গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। সব ধরনের মানুষকে আল্লাহর পথে ধাবিত করতে তিনি সাতটি নির্দেশনা এই বইটিতে সংযোজন করেছেন।

() মহান আল্লাহ ছাড়া কারো নিকট উপকার কামনা না করে আত্মনির্ভরশীল হবার চেষ্টা করা। ফলে নিজ শক্তি ও সামর্থে আস্থা জন্মে। () না হলে চলে সেই ধরনের কাজকর্ম কথাবার্তা আচারআচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। ফলে জীবনযাত্রা ঝামেলা মুক্ত হয়। () ব্যক্তির নিজ ইচ্ছাকে মহান আল্লাহর মর্জির অনুকূলে পরিচালিত হবার মনোবল সৃষ্টি করা। ফলে ধৈর্য ও সবরের গুণ অর্জিত হয়। () সংযম সাধনার মাধ্যমে মনে আলো বা উজ্জ্বলতা আনয়নে সচেষ্ট হওয়া। ফলে মুমিন বান্দা হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। () পরদোষ পরিহারে এবং নিজ দোষ অনুসন্ধানে আত্মশুদ্ধ হবার চেষ্টা করা। () জাগতিক লোভলালসা কামভাবকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মউন্নয়নে সচেষ্ট হওয়া। এতে করে সবার প্রতি সুবিচার করার মনোভাব গড়ে উঠে। () সহজ সরল জীবন যাপনে সচেষ্ট হওয়া। ফলে মানব মনে স্রষ্টার প্রতি প্রেম ভালবাসা ছাড়া অন্য কোন বাসনা অবশিষ্ট থাকবে না।

পরিশেষে বলতে হয় তিনি ছিলেন একাধারে সুফী, কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষা সম্প্রসারক, সমাজ সেবক এবং ধর্মে কর্মে চিন্তা চেতনায় একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। এলাকার উন্নয়নে স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার, রাস্তা নির্মাণ, ডাকঘর নির্মাণসহ অগণিত সমাজ সংস্কারমূলক কাজ তিনি করে গেছেন। পাকভারত উপমহাদেশে তিনি ছিলেন এক আধ্যাত্মিক এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ। মহান আল্লাহর নিকট তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি। সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু আল্লাহ যাতে তাঁকে বেহেশতের উচ্চতম আসনে অধিষ্ঠিত করেন সেই প্রার্থনা করি। আমিন।

আল্লাহর নিকট একটি বিশেষ প্রার্থনা “হে আল্লাহ ক্ষমা কর, দয়া কর দায়লুদিগের মধ্যে তুমিইতো শ্রেষ্ঠ দয়ালু। বড় হুজুরের মাজারের সামনে যে পুকুরটিতে আগত দর্শনার্থী ও ভক্তবৃন্দ যারা ওজু করেন সেই পুকুরটির পানিকে তুমি স্বচ্ছ সুন্দর ঝকঝকে পানিতে পরিণত করে একটি বেহেশতের নহর বানিয়ে দাও। আমীন। লেখক: প্রাবন্ধিক, অনুবাদক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবরেণ্য রাজনীতিবিদ এ. কে. এম. রফিক উল্লাহ চৌধুরী স্মরণে
পরবর্তী নিবন্ধফল-ফসলের আড়ালে অদৃশ্য ঝুঁকি : নিরাপদ খাদ্যের জন্য কৃষিব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে হবে