পেয়ারা নিয়ে সামপ্রতিক একটি গবেষণায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। কিন্তু বিষয়টি শুধু পেয়ারা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। আম, কলা, কাঁঠাল, লিচু, লেবু, পেঁপে কিংবা পেয়ারা শুধু ফল নয়; ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যশস্যও একই মাটি, একই পানি এবং অনেক সময় একই কৃষি–উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো একটি ফলে দূষণ ধরা পড়লে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়। বরং প্রশ্ন ওঠে আমাদের কৃষিজমি থেকে মানুষের খাবারের থালা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটি কতটা নিরাপদ?
বাংলাদেশে এ প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষি এখানে শুধু অর্থনীতির অংশ নয়; এটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যের ভিত্তি। অথচ উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যদি মাটি, পানি, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি–উপকরণের মান যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে উৎপাদনের সাফল্যের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তার একটি অদৃশ্য ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পেয়ারার ঘটনা যে বড় প্রশ্নটি সামনে এনেছে
২০২৬ সালে রাজশাহী বিভাগের বাণিজ্যিক ও বাড়ির বাগানের পেয়ারা নিয়ে একটি গবেষণায় বাণিজ্যিক পেয়ারায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে একটি অঞ্চলের সীমিত নমুনার গবেষণা দিয়ে বাংলাদেশের সব বাণিজ্যিক পেয়ারা দূষিত এমন সিদ্ধান্ত অবশ্যই দেওয়া যায় না।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশে ফল নিয়ে করা ২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাও বিষয়টিকে বৃহত্তর পরিসরে দেখেছে। এতে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ফল বিশেষত কলা, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, জাম, লেবু ও তেঁতুলে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সিসা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা, পারদসহ বিভিন্ন ধাতুর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা অতিক্রমের তথ্যও ছিল। গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
অতএব, সমস্যাটি ‘পেয়ারায় ভারী ধাতু’ নয়; বরং কৃষি–ব্যবস্থার মাধ্যমে দূষক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে কি না সেই বৃহত্তর প্রশ্ন।
ফলের সঙ্গে ধান–সবজিকেও একই প্রশ্নের আওতায় আনতে হবে। ফলগাছের মতো ধান বা সবজিও মাটি ও পানি থেকেই প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে। তাই দূষিত মাটি কিংবা সেচের পানি থাকলে শুধু ফল নয়, খাদ্যশস্য ও সবজিও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে আর্সেনিকের বিষয়টি এর সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ। ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক শুধু পানীয় জলের সমস্যা নয়; আর্সেনিকযুক্ত পানি দিয়ে দীর্ঘদিন সেচ দিলে তা কৃষিজমিতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ফসলে সঞ্চিত হতে পারে। বাংলাদেশের গবেষণাগুলোতে বিশেষ করে ধান ও সবজিতে এই পথটি নথিবদ্ধ হয়েছে।
ধানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে ধান ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আর্সেনিকযুক্ত পানি দিয়ে বারবার সেচ দিলে মাটি–পানি–ধান–খাদ্য এই ধারাবাহিকতায় আর্সেনিক প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
একইভাবে শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন কৃষিজমিতে উৎপাদিত ধান ও বিভিন্ন সবজি নিয়ে বাংলাদেশের গবেষণাতেও আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সিসা, ক্রোমিয়াম ও নিকেলসহ বিভিন্ন ধাতু পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অর্থাৎ ফলের ঝুঁকি আলাদা, ধানের ঝুঁকি আলাদা এভাবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
কৃষকের দায় কতটা, আর ব্যবস্থার দায় কতটা?
কৃষককে সহজেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় বেশি সার দিয়েছেন, বেশি কীটনাশক দিয়েছেন, ফল বড় করতে রাসায়নিক ব্যবহার করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।
কৃষক যে সার বা কৃষি–রাসায়নিক বাজার থেকে কিনছেন, সেটির ভেতরে অনাকাঙ্ক্ষিত ভারী ধাতু আছে কি না, তা জানার উপায় তাঁর কতটুকু? মাটি পরীক্ষা করার সুযোগই বা কতজনের আছে? সেচের পানিতে আর্সেনিক আছে কি না, সেটি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা কতটা সহজলভ্য?
বাংলাদেশের কৃষি–উপকরণ নিয়ে সামপ্রতিক গবেষণায় এই প্রশ্নটির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। বাজারজাত বিভিন্ন কৃষি–রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ক্যাডমিয়াম, সিসা, ক্রোমিয়াম ও নিকেল পেয়েছেন; বিশেষ করে কিছু ফসফেট সারে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ছিল।
এখানে তাই শুধু কৃষককে সচেতন করলেই হবে না। কৃষি–উপকরণের উৎপাদক, আমদানিকারক, সরবরাহকারী, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং পরীক্ষাগার পুরো শৃঙ্খলকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।
হাইব্রিড ফসল কি সমস্যার মূল?
এখানে একটি প্রচলিত ধারণা নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। হাইব্রিড বা উচ্চফলনশীল জাত নিজে ভারী ধাতুর উৎস নয়। কোনো জাতের হাইব্রিড হওয়া এবং তার ফলে ভারী ধাতু জমা হওয়ার মধ্যে সরাসরি কারণ–ফল সম্পর্ক ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন বাণিজ্যিক কৃষির লক্ষ্য হয়ে ওঠে দ্রুত বৃদ্ধি, বড় আকার, বেশি ফলন, অভিন্ন আকৃতি এবং বাজারে দ্রুত সরবরাহ। তখন কখনো কখনো মাটি পরীক্ষা না করে অতিরিক্ত সার, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সেচ কিংবা অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
তাই ‘হাইব্রিড বনাম দেশি’ এটি মূল বিতর্ক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো:
কোন জাতকে কোন মাটিতে, কতটুকু পুষ্টি দিয়ে, কী ধরনের বালাই ব্যবস্থাপনায় এবং কী মানের পানি ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে?
একটি দেশি জাতও দূষিত মাটি বা পানিতে চাষ হলে নিরাপদ থাকব্তেএমন নিশ্চয়তা নেই। আবার একটি হাইব্রিড জাতও সঠিক মাটি–পানি ব্যবস্থাপনা ও সুষম কৃষি–প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদভাবে উৎপাদন করা সম্ভব।
শুধু ভারী ধাতু নয়, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশও দেখতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু ভারী ধাতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, নাইট্রেট, মাইকোটক্সিন, শিল্পদূষকসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, খাদ্যে আর্সেনিক, সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু বিভিন্ন গুরুতর অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো মাটি ও পানির প্রাকৃতিক উপস্থিতি, পরিবেশদূষণ, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন পর্যায় থেকে খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।
আর্সেনিক নিয়ে FAO/WHO–এর যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি JECFA ২০২৫ সালে নতুন তথ্য পর্যালোচনা করে ২০২৬ সালে তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। এতে খাদ্যে আর্সেনিকের উপস্থিতি, খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে এক্সপোজার, বিষক্রিয়াগত তথ্য এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলো নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অর্থাৎ খাদ্যে রাসায়নিক দূষণের প্রশ্নটি এখন আর কেবল স্থানীয় কৃষির সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘মাটি থেকে থালা’ পর্যন্ত নজরদারি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। এখনো অনেক ক্ষেত্রে আমরা বাজারে পৌঁছানোর পর খাদ্য পরীক্ষা করার কথা ভাবি। কিন্তু দূষণ যদি মাটি বা পানিতে শুরু হয়, তাহলে শুধু বাজারে নমুনা পরীক্ষা করে সমস্যার পুরো সমাধান করা কঠিন।
প্রয়োজন একটি ‘farm-to-fork’ বা ‘মাটি থেকে থালা’ নিরাপত্তাব্যবস্থা।
প্রথম ধাপে কৃষিজমির মাটি পরীক্ষা করতে হবে শুধু ঘচক (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম) নয়, ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও অন্যান্য দূষকও।
দ্বিতীয় ধাপে সেচের পানির মান পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ সেচের উৎস নির্ধারণ করা জরুরি।
তৃতীয় ধাপে সার ও কৃষি–রাসায়নিকের মাননিয়ন্ত্রণ কঠোর করতে হবে। কোনো কৃষি–উপকরণ বাজারে ছাড়ার আগে তার কার্যকারিতার পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত ভারী ধাতুর মাত্রাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চতুর্থ ধাপে কৃষকদের মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। ‘বেশি সার মানেই বেশি ফলন’ এই ধারণার পরিবর্তে হতে হবে ‘সঠিক পুষ্টি, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়’। পঞ্চম ধাপে বাজারে ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা বাড়াতে হবে। শুধু পেয়ারা নয় ধান, চাল, গম, ডাল, শাকসবজি, ফল, মসলা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
গবেষণার ফল মানেই আতঙ্ক নয় : এখানে ভারসাম্যটিও জরুরি। কোনো গবেষণায় কোনো খাদ্যে ভারী ধাতু পাওয়া গেছে মানেই সেই খাদ্য খাওয়া মাত্রই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে এমন কথা বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায় না। ঝুঁকি নির্ভর করে দূষকের মাত্রা, খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ, গ্রহণের সময়কাল, ব্যক্তির বয়স ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যসহ নানা বিষয়ের ওপর। কিন্তু বিপরীত কথাটিও সত্য ঝুঁকি অনিশ্চিত বলে তাকে উপেক্ষা করা যায় না। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে সতর্কতার নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘদিন একই খাদ্যপণ্যের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কৃষির সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা : আমাদের কৃষি উৎপাদন অনেক বেড়েছে এটি নিঃসন্দেহে সাফল্য। কিন্তু আগামী দিনের কৃষিকে আরও একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমরা কত খাদ্য উৎপাদন করছি তার পাশাপাশি, কতটা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করছি? একটি বড় পেয়ারা, চকচকে আপেল, সুন্দর আম কিংবা অধিক ফলনশীল ধানের জাত আমাদের চোখকে আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু কৃষির প্রকৃত সাফল্য বাহ্যিক সৌন্দর্য বা উৎপাদনের পরিমাণে শেষ হয় না। সেই সাফল্যের পূর্ণতা তখনই, যখন উৎপাদনের সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য, পানির নিরাপত্তা, কৃষকের আয় এবং ভোক্তার স্বাস্থ্য সবকিছুর মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য তৈরি হয়।
তাই আজ প্রয়োজন ‘বেশি উৎপাদন’ থেকে ‘নিরাপদ উৎপাদন’–এর দিকে কৃষির দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার। হাইব্রিডকে দোষ দিয়ে, কৃষককে দায়ী করে কিংবা কোনো একটি ফলকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন মাটি, পানি, সার, কীটনাশক, বীজ, উৎপাদনপদ্ধতি, বাজার ও খাদ্য সবকিছুকে একই নিরাপত্তা–শৃঙ্খলের অংশ হিসেবে দেখা।
আমাদের কৃষিজমি শুধু ফসলের জন্মস্থান নয়; সেখান থেকেই মানুষের শরীরের খাদ্য তৈরি হয়। মাটি যদি অসুস্থ হয়, তার ছায়া একদিন না একদিন খাদ্যের ওপর পড়বেই।
তাই এখনই সময় কৃষির সাফল্যের মাপকাঠিতে একটি নতুন শব্দ যুক্ত করার নিরাপত্তা। ফলন চাই, কিন্তু বিষমুক্ত ফলন। বাণিজ্যিক কৃষি চাই, কিন্তু দায়িত্বশীল কৃষি। বড় ফল চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই–নিরাপদ খাদ্য।
লেখক: প্রফেসর, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।













