খাবারের অপচয় এড়াতে সচেতনতার বিকল্প নেই

| শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

খাদ্য অপচয় রোধে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি বলেছেন, এ ক্ষেত্রে কোনো একক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, শিল্প ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সমন্বয় যত শক্তিশালী হবে, ফলাফল তত কার্যকর হবে।

গত ৪ নভেম্বর ঢাকার হোটেল শেরাটনে ‘সেইভ ফুড, সিকিউর বাংলাদেশ্‌স ফুড ফিউচার: ন্যাশনাল ডায়ালগ অন লস অ্যান্ড ওয়েস্ট’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিট (এফপিএমইউ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ কার্যালয় যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, সংলাপ শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর সিদ্ধান্ত ও বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যার সুফল মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হবে। খাদ্য অপচয় রোধ মানে শুধু খাদ্য সাশ্রয় নয়; বরং কৃষকের শ্রমের মর্যাদা, জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়িয়ে উৎপাদিত খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে খাদ্য অপচয় রোধে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, উৎপাদক ও ভোক্তাদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।

বিভিন্ন পরিসংখানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাবার উৎপাদন হয়, তার একটি বড় অংশ মাঠ থেকে আর খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছায় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘ফুড ওয়েস্টেজ ফুটপ্রিন্ট : ইমপ্যাক্টস অন ন্যাচারাল রিসোর্সেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টন খাদ্য নষ্ট হয়, যা বিশ্বের মোট উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ। খাদ্যের এ অপচয়ে উন্নত দেশ আর উন্নয়নশীল দেশ কেউই বাদ যায় না। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ‘ইউনেপ’ ২০২১ সালে ‘ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স’ নামে রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ১ কোটি ৬ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত আর পাকিস্তানের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ খাদ্য অপচয় হয় বাংলাদেশে। শুধু খাবার টেবিলের অপচয় রোধ হলেই ৪২ লাখ ৬২ হাজার মানুষের সারা বছরের ভাতের চাহিদা মিটত। আজ দুনিয়াব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ছে, অথচ অপচয় কমছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, খাবারের অপচয় করতে নেই– খুবই সহজ সরল, সাদামাটা এই কথা সবাই জানে। তবে বাস্তবতা হলো, নামীদামি বুফে রেস্তোরাঁর টেবিল থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবারের ডাইনিং টেবিল– সব জায়গাতেই খাবার–দাবারের ব্যাপক অপচয় হয়। শুধু এই দিকটা খেয়াল না রাখার জন্য কতটা বাড়তি খরচ যে আপনার হচ্ছে, সে হিসাব হয়তো আপনি নিজেও রাখছেন না। খাবারের অপচয় কিন্তু শুধু অর্থের অপব্যয়ই নয়; বরং নষ্ট করা খাবার প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপরও ফেলে নেতিবাচক প্রভাব। বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের ৮ শতাংশের জন্য দায়ী শুধু খাবারের অপচয়। খাবারের অপচয় এড়াতে এবং খাবারের ব্যয় কমাতে মিতব্যয় ও সচেতনতার বিকল্প নেই।

পচনশীল খাদ্য কিংবা ফল ও সবজি পরিবহনের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বে ‘রেফ্রিজারেটেড ভেহিক্যাল’ বা বলা যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। সেগুলো আমাদেরও প্রয়োজন। তা ছাড়া খাদ্যপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ‘কোল্ডস্টোরেজ‘ প্রয়োজন। আবার অনেক ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা যায়। ফুড ওয়েস্ট বা টেবিলে খাবার অপচয় রোধে সচেতনতাই সবার আগে জরুরি। আপনি কতটুকু খাবেন ঠিক সে পরিমাণ খাবার নিন। পরিমাণমতো রান্না করুন। বাড়ি, অনুষ্ঠান কিংবা রেস্টুরেন্ট যেখানেই যান, খাবারের ক্ষেত্রে একই নীতি মানলে অপচয় হওয়ার কথা নয়। চিন্তা করে দেখুন, যে চাল ভাত হিসেবে আমরা খাচ্ছি, সেটা প্রস্তুত হতে কতটা পথ ঘুরে এসেছে। এর পেছনে কৃষকের কতটা ঘাম ঝরেছে। আবার যে খাবার আমরা ফেলে দিচ্ছি, সেটাই ভুখা মানুষ খেতে পারছে না– এসব চিন্তা করলে খাবার অপচয়ের প্রশ্নই আসে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে