বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২ আসনের নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান বিষয়টির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেন ‘বিষয়টি আমাদের মুসলিম পরিবারের’। বিষয়টি আসলে অত সহজভাবে দেখার এবং সরলভাবে গ্রহণ করার অবকাশ আছে বলে আমার কাছে মোটেও প্রতীয়মান নয়।
মূলত মক্কা চুক্তির মত এরকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে আমার কাছে প্রতীয়মান। এর মাঝে ভূ–রাজনীতি, ভূ–অর্থনীতি অন্যতম। ‘বিষয়টি আমাদের মুসলিম পরিবারের’ বলে এমন একটি স্পর্শকাতর ধর্মীয় বক্তব্যের আবরণে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি গৃহীত হতে পারে না। কূটনীতি সব সময় ধর্মীয় ভাবাবেগে পরিচালিত হয় না। এটা যদি হত তাহলে গাজায় যখন লক্ষ ফিলিস্তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকারে তখন সৌদি আরব, মিশর, জর্দান, তুরস্ক, পাকিস্তান নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করত না। যদি ধর্মই কূটনীতির একমাত্র চালিকা শক্তি হত তবে আরব বসন্তের সূত্রে সৃষ্ট ইয়েমেনের গৃহবিবাদে আমেরিকার সাথে সৌদি আরব আর আরব আমিরাত সম্মিলিতভাবে ইয়েমেনের লক্ষ ইয়েমেনী মুসলমানকে হত্যা করত না। সুতরাং পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে কৌশল প্রণেতাদের ধর্মীয় ভাবাবেগের ঊধে থেকে কূটনীতির কঠিন বাস্তবতায় স্বীয় অভিষ্ট অর্জনে সচেষ্ট হওয়াই শ্রেয়।
‘আরব বসন্ত’ কথাটি আলোচনা সূত্রে এসে গেল। আসলে ‘আরব বসন্ত’ বিষয়টি পাঠকদের স্মরণে আনার জন্য এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনার অবতারনা করছি। ‘আরব বসন্ত’ পুরা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে মরুঝড় বইয়ে দিয়েছিল তাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি একে একে লণ্ডভণ্ড হয়। ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বুয়াজিজি তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে রাস্তার পাশে ফল বিক্রি করছিলেন। পুলিশ অনুমতি না থাকার অভিযোগে তার ফলভর্তি ভ্যান আটক করে। পুলিশি এই ব্যবস্থার প্রতিবাদে বুয়াজিজি তার গায়ে কেরোসিন ডেলে আগুন দেয়, এতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ বিক্ষোভে রাস্তায় নামে। বিক্ষোভের তোড়ে তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক জয়নুল আবেদিন বেন আলি পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন।
তিউনিসিয়ার প্রতিবাদের সেই মরুঝড় সেখানে থেমে থাকেনি। এটি আরো প্রচণ্ড রূপ ধারণ করে মিশরের রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে আঘাত হানে। সেই আঘাতে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ফেব্রুয়ারি ২০১১ প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন।
একই মরু ঝড় লিবিয়াকে একেবারে তছনছ করে ছাড়ে। নানা বিদেশী শক্তির উপস্থিতিতে এবং হস্তক্ষেপে লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক কর্নেল মোয়াম্মার গাদ্দাফির শাসন অক্টোবর ২০১১ সালে অবসান ঘটে। গাদ্দাফি নিহত হন। শুরু হয় লিবিয় গৃহ যুদ্ধ।
আরব বসন্তের কবলে পড়ে সিরিয়ায়ও শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সিরিয় প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের শক্তহাতে দমন করতে গেলে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। সিরিয়া সেই মরুঝড় তথা ‘আরব বসন্ত’ এর কবলে পড়ে তার হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক মহা মূল্যবান স্মৃতিসৌধ গুলি হারানোর মুখামুখি হয়।
১৭ ডিসেম্বর ২০১০ শুরু হওয়া মরু ঝড় এবার এসে পৌঁছে ইয়েমেনে। ইয়েমেনও তছনছ হয়। ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের শাসক আলি আবদুল্লাহ সালেহ ২০১২ সালের শুরুতেই ক্ষমতা ছেড়ে দেন। আরব বসন্তের কবলে পড়া কোন দেশই তার ইপ্সিত লক্ষ্য তথা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে সক্ষম হয়নি বরং ক্ষতবিক্ষত হয়েছে গৃহযুদ্ধের নির্মমতায়।
তবে মনে হয় ইতিহাসের এ এক অমোঘ নিয়তি। ইয়েমেনে মরু ঝড়ের কবলে পড়ে ক্ষমতার যে পালাবদল হয় তার মাঝেই মনে হয় সুপ্ত ছিল আজকের ভূ–রাজনীতির এক খেলা। ইয়েমেনের হুতিরা জ্বালানী তেলের মূল্য কমানো এবং নতুন সরকার গঠনের দাবিতে জানুয়ারী ২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদি পালিয়ে এডেনে আশ্রয় নিলে, বিদ্রোহীরা তার পিছু নেয়। হুতি বিদ্রোহী বাহিনী এডেনের উপকণ্ঠে পৌঁছাতে মনসুর হাদি পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। ২০১৫ মার্চ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত আমেরিকার সহায়তায় হুতিদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালনা শুরু করে। এই আক্রমণ ক্রমান্বয়ে সৌদি এবং ইরানের প্রঙি ওয়ার তথা অপ্রত্যক্ষ যুদ্ধে পরিনত হয়। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনে প্রবেশে ইরানী জাহাজ চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আমেরিকাও এরই মাঝে হুতিদের জন্য ইরান কর্তৃক প্রেরিত অস্ত্রের বিভিন্ন চালান আটকে তৎপরতা চালাতে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী হুতিদের দমনে ইয়েমেনের উপর সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৫০০০ (পঁিচশ হাজার) এর বেশি বার বিমান আক্রমণ পরিচালনা করে। নৌ অবরোধ, বিমান আক্রমন ইত্যাদির ফলে ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হয়, লক্ষ লক্ষ ইয়েমেনি দুর্ভিক্ষের শিকারে পরিণত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
উল্লেখ্য ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাশে ইরান তার সম্ভব সব ধরনের সাহায্য নিয়ে দাঁড়ায়। এই সূত্রে হুতিরা ক্রমে এই অঞ্চলে ইরানের শক্তিশালী প্রক্সিতে পরিনত হয়। শুধু প্রক্সি নয় তারা ‘হামাস’ ‘হিজবুল্লাহ’ সহ মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত ‘নন স্টেট এক্টর’ সামরিক গোষ্ঠিগুলির কার্যকর সহযোদ্ধা হিসাবে আবির্ভূত হয়। প্রয়োজনের সময় হুতিরা সব সময় ‘হামাস’ এবং ‘হিজবুল্লাহ’ পাশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ইসরাইলীদের বর্বর আক্রমণে গাজা যখন প্রায় মৃত্যুপুরিতে তখন হুতিরা ইসরাইলের উপর দুঃসাহসিক আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের শক্তিমত্তার পরিচয় দেয়। ৭ অক্টোবর ২০২৩ হামাস কর্তৃক ইসরাইলে হামলা পরিচালনা করার পর সে সংঘাতে না জড়াতে হুতিরা আমেরিকার প্রতি হুশিয়ারী উচ্চারণ করে। ইতিমধ্যে গাজায় প্যালেস্টাইনীদের সমর্থনে হুতিরা ইসরাইলের উপর ড্রোন এবং মিসাইল হামলা পরিচালনা করলে তার বেশ কিছু আমেরিকানরা প্রতিহত করে। প্রতিবাদে হুতিরা ৩১ অক্টোবর ২০২৩ সরাসরি গাজা যুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। এরই অংশ হিসাবে হুতিরা ১৯ নভেম্বর ২০২৩ লোহিত সাগরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হাইজ্যাক করে তাদের দখলে নেয়। এর বাইরে হুতিরা লোহিত সাগর মুখি প্রায় ৩১ টি জাহাজের উপর তাদের ড্রোন এবং মিসাইল আক্রমণ পরিচালনা করে। এই সমস্ত আক্রমণে বাব আল মান্দেব হয়ে লোহিত সাগর মুখি জাহাজ চলাচল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এখানে উল্লেখ্য বিশ্ব বাণিজ্যের ১৫% এর ও অধিক এ পথ ধরে পরিবাহিত হয়। উপায়ান্তর বিহীন বাণিজ্য জাহাজ সমূহ হুতিদের আক্রমণ থেকে পরিত্রাণে লোহিত সাগর বাদ দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার, আমাদের ছোট কালের ভূগোল’এ পড়া ভাস্কোডা গামা’র ‘উত্তমাশা অন্তরীপ’ (ক্যাপ অব গুড হোপ) ঘুরে বাণিজ্য পথ খুলে রাখতে গিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য বিপুল ব্যয়ের মুখে পড়ে।
এ ক্ষতিতে বিশেষ করে আমেরিকা, ইউরোপের টনক নড়ে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তাদের বাণিজ্যের সহজ পথ বাব আল মান্দেব – লোহিত সাগর হয়ে। ‘উত্তমাশা অন্তরীপ’ তথা ক্যাপ অব গুড হোপ হয়ে বাণিজ্য করতে গেলে তাদের পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এ ব্যয় পরিহার করতে ১১ থেকে ২২ জানুয়ারি ২০২৪ আমেরিকা এবং যুক্তরাজ্য যৌথভাবে ইয়েমেনে হুতি লক্ষ্যবস্ত্তুতে বিমান আক্রমণ পরিচালনা করে। এসব আক্রমণও হুতিদের দমাতে তেমন ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়নি।
এরই মাঝে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইসরাইল দ্বারা প্ররোচিত হয়ে, ইসরাইলের সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করে। দীর্ঘ ছয় মাসের ও অধিক সময় চলমান এ যুদ্ধে আমেরিকা অনেকটা পর্যুদস্ত্ত। আমেরিকা এবং তার শরীকদের দ্বারা ইরানের উপর ক্রমবর্ধমান অন্যায় অর্থনৈতিক অবরোধের পাল্টা হিসাবে ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে অবরোধ করে। উল্লেখ্য এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানী তেলের প্রায় ২৫% পরিবাহিত হয়।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে স্বভাবতই বাব আল মান্দেব প্রণালী’র উপর চাপ বাড়ে। এদিকে ইরানকে সামরিকভাবে কাবু করতে ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা ইরানের উপর নৌ অবরোধ সৃষ্টি করে একই সাথে অর্থনৈতিক অবরোধও। এমনকি ইরানী তেল রপ্তানীর লেনদেনে জড়িত সন্দেহে তুর্কি বেশ কয়টি ব্যাংকের উপরও আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসবের প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিরা ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ‘আবাহা’ ‘জিজান’ ‘খামিস মুশায়েত” এবং ‘নাজরান’এ আক্রমণ চালায়।
হুতিরা ১০ সেপ্টেম্বর ‘দুবাব’ এবং লোহিত সাগর মুখি বন্দর নগরী ‘মক্কা’ (পবিত্র মক্কাশরীফ নয়) দখল করে নেয়।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর হাত থেকে হুতিরা বাব আল মান্দেবের “মাইয়ূন আইল্যান্ড’ দখল করে নেয়। সব মিলিয়ে বাব আল মান্দেব উপকূলের প্রায় ৯০% এখন হুতিদের দখলে।
উল্লেখ্য ইরাক থেকে ড্রোন আক্রমণের মাধ্যমে সৌদি আরবের ‘ইস্ট ওয়েস্ট তেল পাইপ লাইন’ ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত’ হলে সৌদি কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দিয়েছে।
হুতিদের আক্রমণ এবং অগ্রাভিযান নিশ্চিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভূ–রাজনৈতিক প্রভাবকে যেমন বিস্তৃত করছে তেমনি ইরানের উপর আমেরিকার নৌ–অবরোধ চলমান থাকলে ইরান বাব আল মান্দেব এ হস্তক্ষেপে তার হাত প্রসারিত করবে। এটি হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেল সরবরাহ যেমন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে তেমনি তা দামেও চড়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মত জ্বালানী তেল আমদানি নির্ভর দেশগুলির অর্থনীতি দারুণ এক সংকটের মুখোমুখি হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।













