প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাতে ভয় করুন, জেনে রাখুন! হযরত মারইয়াম (আ.) গর্ভধারণ, হযরত ঈসা (আ.) এর জন্মগ্রহণ ছিল সম্পূর্ণরূপে অলৌকিক ঘটনা। মানবজাতির সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় আল্লাহ তা’আলা কেবল আদম (আ.) কে পিতামাতা ছাড়া সৃষ্টি করেন। অতঃপর হাওয়া (আ.) কে মাতৃগর্ভ ছাড়া সৃষ্টি করেন। অতঃপর পিতা ছাড়াই কেবল মাতার মাধ্যমে হযরত ঈসা (আ.) কে সৃষ্টি করেন, মহান আল্লাহ সর্বশক্তিমান সর্বনিয়ন্তা।
হযরত ঈসা (আ.) এর জন্ম পরিচয়:
আল্লাহর মনোনীত নবী হযরত ঈসা (আ.) এর জন্ম ছিল আল্লাহর কুদরত। তিনি ছিলেন আসমানী কিতাব প্রাপ্ত নবী। তাঁর পরিচয় প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই মসীহ ঈসা ইবনে মরিয়ম আল্লাহর রাসূল, তাঁর সেই কালিমা যা তিনি মরিয়মের প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিশেষ রূহ।” (আল কুরআন: নিসা, ৪:১৭১), আয়াতে হযরত ঈসা (আ.) কে রুহুল্লাহ বলা হয়েছে, কারণ তিনি পিতা–মাতার শুক্র (বীর্য) থেকে সৃষ্টি হয়নি। তাঁকে “কলেমাতুল্লাহ” এ জন্য বলা হয়েছে যে, তাঁর জন্ম সৃষ্টি কালিমা ই “কুন” দ্বারা হয়েছে। পিতা ও মাতার শুক্র ও ডিম্ব থেকে হয়নি। যেমন আদম (আ.) শুক্র (বীর্য) ব্যতীতই সৃষ্ট হয়েছেন। তেমনিভাবে ঈসা (আ.) এর সৃষ্টিও। আল্লাহ তা’আলা হযরত ঈসা (আ.) এর সৃষ্টি সম্পর্কে অন্য আয়াতে এরশাদ করেছেন, “ঈসার দৃষ্টান্ত আল্লাহর নিকট আদমের ন্যায়, তাকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর বললেন “কুন” হয়ে যাও, তৎক্ষণাৎ সে হয়ে যায়। (সূরা: আলে ইমরান, ৪:৫৯, তাফসীর নূরুল ইরফান, পৃ: ৪৬)। হযরত জিবরীল (আ.) সরাসরি মারইয়াম এর নিকট এসে হযরত ঈসার রূহ ফুঁক দিলেন এই বিশেষত্বের কারণে হযরত ঈসা (আ.) কে রুহুল্লাহ বা আল্লাহর প্রেরিত রূহ বলা হয়।
ঈসা (আ.) কে মাসীহ বলার কারণ: মাসীহ অর্থ স্পর্শিত যিনি মুছেহ দেন তিনি রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ মাত্রই রোগী সুস্থ হয়ে যেতো। মাসীহ এর এক অর্থ অধিক ভ্রমণকারী।
ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ.) কে হত্যা করতে চেয়েছিল: ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ.) কে হত্যা করতে চেয়েছিল মূলত তাঁর নবুওয়াত, তাওহীদের প্রচার ও তাওরাতের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার শুরু করলে তাদের নেতৃত্ব ও স্বার্থের বিরুদ্ধে সংস্কার মূলক আহবানের কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে তারা হযরত ঈসা (আ.) এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলো, তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করলো “তাফসীরে তাবারি” তাফসীর ইবনে কাসীর ও তাফসীর কুরতুবী ও তাফসীরে নূরুল ইরফান এর বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, স্বার্থবাদী ইয়াহুদীরা প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে উঠলো, হযরত ঈসা (আ.) এর অনুসারীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে দেখে অত্যাচারী শাসক কর্তৃক হযরত ঈসা (আ.) কে হত্যার উদ্দেশ্যে একটি ঘরে আবদ্ধ করলো। হযরত ঈসা (আ.) কে শূলে চড়ানোর জন্য ঘরের ভেতরে লোক পাঠানো হলো, আল্লাহ তা’আলা হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের একজনকে ঈসা (আ.) এর অবিকল চেহারা ও আকৃতি সম্পন্ন করে দিলেন, মহান আল্লাহ তাঁর অসীম কুদরতে জিবরাঈল (আ.) কে পাঠিয়ে জীবিতাবস্থায় হযরত ঈসা (আ.) কে আসমানে উঠিয়ে নিলেন। এদিকে তারা অবিকল চেহারা আকৃতি সম্পন্ন হওয়া তাদের লোককে হযরত ঈসা (আ.) মনে করে শূলে চড়িয়ে দিলো। (তাফসীরে নূরুল ইরফান, সূরা: আলে ইমরান এর ১৭ নং আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর) আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “হে ঈসা! আমি তোমাকে উঠিয়ে নেব এবং তোমাকে আমার দিকে উন্নীত করব এবং কাফিরদের (আপমান) থেকে তোমাকে পবিত্র রাখব। (আল কুরআন: আল ইমরান, ৩:৫৫)
আল্লাহ তা’আলা আরো এরশাদ করেন, “তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাঁকে ক্রুশবিদ্ধও করেনি বরং তাদের কাছে বিষয়টি সেরূপ প্রতীয়মান করা হয়েছিল। (আল কুরআন: নিসা, ৪: ১৫৭–১৫৮, তাফসীর কুরতুবী, আল কুরআন: নিসা: ৪.১৫৭–১৫৮)
আল্লাহ তা’আলা ঈসা (আ.) কে আসমানে উঠিয়ে নেন: আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। তাঁর নবী হযরত ঈসা (আ.) কে আসমানে উঠিয়ে নেন এবং অন্য একজনকে ঈসা (আ.) এর সদৃশ্য করে দেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (আল কুরআন: নিসা, ৪ ১৫৮)
হযরত ঈসা (আ.) এর দ্বীনি দাওয়াত: হযরত ঈসা (আ.) বনী ইসরাঈলদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। কুফরি ও শির্ক থেকে সর্তক করে খোদাভীতি ও নবীর আনুগত্যের শিক্ষা দেন, খোদা প্রদত্ত মু’জিযা প্রদর্শনের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা ও নবুওয়তের প্রমাণ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালান এবং সর্বশেষ নবী সৈয়্যদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে শুভাগমনের সুসংবাদ প্রচার করেন। তিনি আল্লাহর দাসত্ব ও বন্দেগী করার আহবান করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহই আমার প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু, অতএব তোমরা তারই ইবাদত কর, এটাই সরল পথ। (আল কুরআন: আলে ইমরান, ৩:৫১)
ঈসা (আ.) এর দ্বীনি দাওয়াতে সর্বশেষ নবীর আগমনের সুসংবাদ: সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী দোজাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনী বার্তা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে ও পূববর্তী আম্বিয়া কেরামের জবানে ঘোষিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে, যখন মারইয়াম তনয় ঈসা বললেন, হে বনী ঈসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আগমন করেছি, আল্লাহর রাসূল হিসেবে আমার পূর্ববর্তী তাওরাত বিতাবের সত্যায়নকারী হিসেবে এবং আমার পরে আগমনকারী রাসূলের সুসংবাদ দানকারী হিসেবে, যার নাম হবে আহমদ। (আল কুরআন: আস সফ, আয়াত:৬)
হযরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহ প্রদত্ত মু’জিযাসমূহ: আল্লাহ তা’আলা নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য প্রামাণ্য দলীল ও যুগোপযোগী মু’জিযা দ্বারা সাহায্য করে থাকেন। ঈসা (আ.) কে অসংখ্য মু’জিযা দান করেছেন, তাঁকে পিতা বিহীন সৃষ্টি করা, শৈশবে দোলনায় কথা বলার শক্তিদান, আটি দিয়ে পাখি তৈরি করা, জন্মান্ধ ও কুষ্টরোগীকে আরোগ্য দান করা, মৃতকে জীবিত করা, আসমান হতে খাদ্য অবতরণ করা (মান্না সালাওয়া) এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আমি তোমদের নিকট পালন কর্তার পক্ষ থেকে নিদর্শন সমূহ নিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখির আকৃতি তৈরি করে দিই। তারপর তাতে যখন ফুৎকার প্রদান করি তখন তা উড়ন্ত পাখিতে পরিণত হয়ে যায় আল্লাহর হুকুমে। আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধকে এবং শ্বেত কুষ্ট রোগীকে। আমি মৃতকে জীবিত করে দিই আল্লাহর হুকুমে, আমি তোমাদেরকে বলে দিই–যা তোমরা খাবার গ্রহণ কর এবং যা তোমাদের গৃহে রেখে আস। এতে সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। (আল কুরআন: আল ইমরান, ৩, ৪৯)
হযরত ঈসা (আ.) কিয়ামতের পূর্বে আসমান থেকে অবতরণ করবেন: হযরত ঈসা (আ.) জীবিত অবস্থায় আসমানে আরোহণ করেন, কিয়ামতের পূর্বে তিনি পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। দীন–ই ইসলামকে প্রসার করবেন, বিবাহ করবেন, চল্লিশ বছর জীবদ্দশায় থাকবেন। অত:পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে রওজা শরীফে দাফন হবেন। (হাকীমূল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (র.) তাফসীর নূরুল ইরফান, পৃ: ১৪৫)
হাদীস শরীফে হযরত ঈসা (আ.) এর বর্ণনা প্রসঙ্গে: হযরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করবেন সারাবিশ্বে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। হাদীসে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, সেই সত্তার শপথ। যার হাতে আমার প্রাণ অচিরেই সৎ ও নিষ্ঠাবান শাসক হয়ে মারইয়াম পুত্র ঈসা আসমান থেকে অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে দেবেন, শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়ার বিধান রহিত করবেন। (বুখারী, হাদীস: ২২২২)
তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের নিকট অবতরণ করবেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের কাছে অবতরণ করবেন, তিনি দুটি হালকা হলুদ রঙ্গের পোশাক পরিহিত থাকবেন এবং তার দু’হাত দুই ফেরেশতার ডানার ওপর থাকবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৯৩৭)। তিনি ইমাম মাহদীর পিছনে নামায আদায় করবেন, অতৎপর ফিলিস্তিনের লুদ নগরের প্রবেশদ্বারে দাজ্জালকে হত্যা করবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৯৩৭)
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে ঈসা (আ.) প্রসঙ্গে সঠিক আকিদা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম, খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












