ইসলামি মানবিক সমাজ বিনির্মাণে সুফি চিন্তা

ডা. আল্লামা সৈয়দ মিশকাতুন্‌ নূর মাইজভাণ্ডারী | রবিবার , ১১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

আদি পিতা আদম (আঃ) এর সাথে সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে ইবলিশের দ্বৈরথ হতে জন্ম নেওয়া মানবতাকে পাপের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার শয়তানি প্ররোচনা থেকে নিজকে রক্ষা করার জন্য মানব তার অন্তঃস্থ নফসকে জানা অতি প্রয়োজন। বর্ণিত হয়েছে, ”মান আরাফা নাফসাহু ফাক্বাদ আরাফা রাব্বাহু” অর্থাৎ ”যে নিজেকে জানে সে সৃষ্টিকর্তাকে জানে”। নিজের নফসকে জেনে তাজকিয়ায়ে নফস অর্থাৎ নফসের পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আত্মিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা থেকেই তাসাউফের উৎপত্তি। তাসাউফ চর্চাকারী ব্যক্তিই সুফি। সুফি শব্দটি সউফ অথবা সাফা শব্দ হতে উদ্ভূত । রাসুলে পাকের যুগে কিছু সাহাবা পশমের কাপড় পরিধান করে মসজিদে নববীর বারান্দায় সার্বক্ষণিক আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবিবের অনুগ্রহ লাভের আশায় নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ রেখে এবং উন্নত মানবিকতার চর্চায় সর্বদা নিয়োজিত থাকতেন। এ ধরনের সুফি সাহাবীদের রাসূলে করীম (দঃ) অত্যধিক পছন্দ করতেন। সাফা শব্দের অর্থ পবিত্রতা। সুফিগণ সর্বদা তাজকিয়ায়ে নফস হক্কুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর হক আদায় ইবাদত বন্দেগী এবং হক্কুল এবাদ (বান্দার হক ) অর্থাৎ মানবিক চর্চা ও মানব কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে রবকে রাজি করানোর চেষ্টায় থাকতেন। মূলত আল্লাহকে খুশি করানোর মাধ্যম আল্লাহর এবাদত এবং সৃষ্টি কুলের খেদমত। সুফি ভাবধারা সর্বদা ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর হক ও সৃষ্টি কুলের কল্যাণকর কাজ হক্কুল এবাদ অর্থাৎ সৃষ্টির হক আদায়কে মূলধারা হিসেবে গ্রহণ করে। দয়াল নবী রাহমাতুল্লিল আলামিন শিশুকালে হাজরে আসওয়াদ পাথরকে প্রতিস্থাপনের বিষয় নিয়ে উদ্ভূত আরবের আন্ত:গোত্র কোন্দলকে হেকমতের মাধ্যমে চার গোত্র প্রধানকে চাদরের চার কোনায় ধরিয়ে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের মূল অর্থ শান্তি প্রতিষ্ঠা করে আমাদের সুফি ভাবধারার মর্মার্থ বুঝিয়েছেন। নবীর প্রতি আল্লাহর বাণী ”উদউ ইলা সাবিলে রাব্বিকা বিল হিকমা ওয়া মওজিয়াতুল হাসানা”। অর্থাৎ, আপনি মানুষকে আহ্বান করেন হেকমত (কৌশল) ও সুন্দর আচারের মাধ্যমে। সুফি চিন্তায় সমৃদ্ধ হাদিগণ যুুগে যুগে এ হেকমত ও মানবিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত ব্যবহারকে মানবহৃদয় জয় করে ধর্মপ্রচার করার কাজে ব্যবহার করেছেন। এই বাণীর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি রাসূলকে কষ্ট দেয়ার জন্য কাঁটা দেয়া অসুস্থ বৃদ্ধাকে মানবিক আচারের মাধ্যমে মুগ্ধ করে দ্বীনে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করাকে। ব্যবসায়িক সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে মা খাদিজাতুল কোবরা কে এমনভাবে দ্বীনের কাজে আকৃষ্ট করলেন যার প্রতিফলে মা খাদিজা ইসলামের প্রতিষ্ঠায় ও প্রসারে অতুলনীয় ভূমিকা রেখেছেন। কোরআনে এরশাদ হয়েছে ”লিকুল্লে জা আলনা মিনকুম সিরাআতাও ওয়া মিনহাজ্‌ “ অর্থাৎ ”আমি তোমাদের জন্য প্রেরণ করেছি শরীয়ত ও বিশেষ পথ” অর্থাৎ ত্বরিকত। এ বিশেষ পথের সর্বোত্তম হেকমত কৌশল হল স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি শর্তহীন ভালোবাসার মাধ্যমে ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও মানবিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন। সূরা ফাতাহতে এরশাদ হয়েছে, “ নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি যাতে আপনার উসিলায় আপনার আগের ও পরের সকলের পাপরাশিকে ক্ষমা করতে পারি”। মক্কা বিজয়ের সময় কাফের গনের অন্তরের উপর বিজয় এবং হাজারো কাফেরের স্বতঃস্ফূর্ত ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে রক্তপাতহীন বিজয় পরবর্তী মানবিক সমাজ গঠনে সুফি ধারণার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়। সে সমাজে ইসলামের বাইরে থেকে যাওয়া অমুসলিমদের জিজিয়া বা করের মাধ্যমে ইসলামী সমাজে সকল ধরনের নাগরিক সুযোগ–সুবিধার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। মৃত অমুসলিম ইহুদী লাশের প্রতি দাঁড়িয়ে নবী করীম (দঃ) এর সম্মান প্রদর্শনের হাদিস দ্বারা ইসলামের সুফি ধারণার প্রতি সমর্থন এবং জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানবিক সমাজ গঠনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। রাসূলে করীম (দঃ) এর ধারাবাহিকতায় খোলাফায়ে রাশেদীনের হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান, হযরত আলী, হযরত হাসান এবং সাহাবায়ে কেরামের ও আহলে বায়তে রাসুলের সাদামাটা জীবন যাপন, আত্মত্যাগ এবং দয়ালু আচরণ ইসলামী মানবিক সমাজ গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে সুফি ধারণার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় আল্লাহর অলিগনের জীবনে। গাউছে পাক আব্দুল কাদের জিলানী, নিজাম উদ্দিন মাহবুবে এলাহী, খাজা মইনুদ্দিন চিশতী, হযরত শাহাজালাল, গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদউল্লাহ, গাউসুল আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রমুখ জগৎ বিখ্যাত ওলিগণ তাদের সমগ্র জীবনে শরীয়তকে কায়েম করতে গিয়ে যেমন অজস্র মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা নির্মাণ করেছেন; তেমনি ভাবে, মানবিক কাজ করতে গিয়ে লঙ্গরখানা পরিচালনা, দান–খয়রাত করা, নিজেদের অনুসারীদেরকে যাকাত, দান সদকাতে উদ্বুদ্ধ করে মানবিক সমাজ বিনির্মাণে তাদের সুফি ধারণার সুস্পষ্ট প্রভাব রেখেছেন। রব্বুল আলামীনের প্রেরিত দ্বীনকে মানবহৃদয় জয় করে প্রচারের পরিশুদ্ধ কৌশল (সুফিচিন্তা) অর্জনের জন্য মোরাকাবা মোশাহেদায় (সুফি মেডিটেশন) মগ্ন হয়ে নবী করিম (দঃ) হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন অবস্থান করেন। তার সুন্নত অনুযায়ী তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়ার পূর্ণতাদানকারী গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবাভান্ডারী কেবলা ফকির টিলা, কোদালা পাহাড়, দেয়াঙ পাহাড়সহ বিভিন্ন নির্জন স্থানে মোরাকাবা মোশাহেদার মাধ্যমে খোদায়ী নূর অর্জন করেছেন। তাঁর চেহেরা মোবারক দর্শনে হাজারো পাপী–তাপী বান্দা উশৃঙ্খলতা–উগ্রতা পরিত্যাগ করে সুফি চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে মানব কল্যাণ মূলক কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে মাইজভান্ডারী তরিকার মাধ্যমে দ্বীনে ইসলামের প্রচারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। অসামপ্রদায়িক মানবিক সুফি ধারণা উদ্ভূত আচারে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রথমত লক্ষ লক্ষ দলিত, নিম্ন বর্ণের অমুসলমানগণ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে আজকের এই মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখেন। তাসাউফ চর্চায় সমৃদ্ধ এ মহান অলিগনের পরবর্তী অনুসারীগণ বর্তমানে লঙ্গরখানা পরিচালনা, রক্তদান কর্মসূচি, দারিদ্রতা বিমোচন, জাকাত ফান্ডের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য খাতে অনুদান প্রদান, দরিদ্র বিবাহযোগ্য কন্যাদায় গ্রস্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতার প্রদানের মত কাজ করে মানব হৃদয় জয় করে নিয়েছে। এজন্য প্রত্যেক সুফির দরবারে ধনী–গরিব, শিক্ষিত–অশিক্ষিত, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধরনের মানবের পদচারনায় সদা মুখরিত। মহান গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভান্ডারীর মহান খোশরোজ শরীফ ২৯ শে আশ্বিন, ১৪ই অক্টোবরের প্রাক্কালে মহান সুফিগণের মানবিক কর্মময় জীবনী আলোচনা ও তাঁদের প্রদর্শিত পথে আমরা যেন ইসলামী মানবিক সমাজ বিনির্মাণে সমর্থ হই। আমীন।

লেখক: আওলাদে রসুল (দ🙂 আওলাদে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী ও সহকারী অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ,

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ