কাটেনি ঘোর এখনো, আমার! ঐদিকে ড্রাইভিংসিটে মহানন্দে গুন গুন করতে করতে ফাহাদ, আজদাহা সাইজের এস ইউ ভি টিকে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে বাঁয়ে কাটিয়ে, তুলেছে নিয়ে মরু চিঁরে হাইওয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া রাস্তায়।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আছেন দলবলসহ শেখ, এখনো দাঁড়িয়ে। যতোক্ষণ আমাদের গাড়ি না হচ্ছে চোখের আড়াল, ততোক্ষণই কি থাকবেন ওনারা, এভাবে দাঁড়িয়ে? এটাই কি দস্তুর নাকি সৌদি গ্রামের? ‘কী মিঃ সেলিম, চুপচাপ কেন, খবর কী?’ সেটাই তো বুঝতে পারছি না! ‘বল কি? এরকম একটা শাহী রিসেপশন পেলে। খাওয়া দাওয়াও হল জম্পেশ, তারপরও তুমি খুশি হও নি নাকি?’ সমস্যা তো সেটাই। তুমি যখন বললে, গ্রামের ঐ ভদ্রলোক আমাদেরকে তার বাড়ি যেতে বলেছেন, ভেবেছিলাম, যাচ্ছি ওখানেই। কিন্তু তারপর ঘটল যা, তা তো আমার কল্পনারও অতীত। আমাদের ভাষায় একটা কথা আছে, অল্প শোকে কাতর,অধিক শোকে পাথর। আর এখন কী না এ অধম, অভাবিত আনন্দে হয়েছি বেতাল বেভুল।
‘শোন, এটাই সৌদি গ্রামের, দস্তুর। ঐ লোক কিন্তু আমাদের সাথে দেখা হওয়ার আগেই, গ্রামের মুখে পার্ক করে রাখা আমার গাড়িটি দেখেছে। তাতেই সে ধরে নিয়েছিল শহর থেকে নিশ্চয় কোন বড় শেখ এসেছে। তারপর যখন আমার সাথে তোমাকে দেখেছে, আর আমিও যেহেতু বলেছি তুমি হইলা সুইজারল্যান্ডের এক বিরাট কোম্পানির বিশাল বড় বস, বেচারার তখন ওটাই অবশ্য করনীয় দায়িত্ব হয়ে পড়েছিল। ভি আই পিদের শেখের মজলিসে নিয়ে যাওয়া নিয়ম। বিষয়টা গোটা গ্রামের মান সম্মানের সাথে জড়িত।’ হুম, পেছনে তুমি যে আমাকে মিসকিন ডাকো, তা তো জানি। অতএব নিশ্চয় মনে মনেও সর্বক্ষণ আমাকে ঘিরে ওটাই। আবার আজ, এই গ্রামে আসতে আসত বারবারই, নানান শ্রমিকদের দেখিয়ে খোঁচা দিয়েছ। এমতাবস্থায় ঐ লোকের কাছে আমার কি যে পরিচয় দিয়েছ, আরবিতে বকলম আমি বুঝি কী করে? “আচ্ছা, তোমার নামটা যেন কে রেখেছিল, মি সেলিম?” মনের গহীনের ঐ ভাবনার জলে, ফাহাদের এই প্রশ্নের ঢিলটি এসে পড়তেই পড়লো মনে, আমার নামটি বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করে, আমার দিকে বার কয়েক হাসিমুখে মাশাল্লাহ, উচ্চারণ করে, শেখ কী যেন জিজ্ঞেস করেছিল ফাহাদকে। দুজনের ঐ বাৎচিতের মাথামুণ্ডু কিছু না বুঝলেও, মহামান্য শেখের হাসিমুখ, দেহভঙ্গি আর মাশাল্লাহ উচ্চারণের ধরনে ধরে নিয়েছিলাম, নিশ্চয় ভাল কিছু বলেছেন! হড়বড় করে তাই,
শোকারান, জাজাকাল্লাহ, থ্যাংক ইউ তিনটাই বলেছিলাম এ অধমও হাসিমুখে। এখন সে প্রসঙ্গ ফিরে আসতেই বলি, কেন কী হয়েছে আমার নামে ? আমার আব্বার দেয়া নাম ঐটি! “ভীষণ খুশি ও অবাক হয়েছেন শেখ। কী করে এক বাঙালী এরকম কাব্যিক আরবি নাম পেল? তা তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না। বলছিলেন, নিশ্চিত তোমার এই আজনবি অতি উচ্চবংশীয়। তার পরিবারে কেউ না কেউ অবশ্যই কবি আছেন। সেই কবিই রেখেছেন এই মধুর নাম।” নিজের নাম নিয়ে বরাবরে অসচেতন আমি, সৌদিতে আসার পর দ্বিতীয়বারের মতো চমৎকৃত হলাম। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখার মতো আব্বা, অকবি আমার জন্য এরকম একটা কাব্যিক নাম রাখায় জানালাম তাঁকে অসংখ্য সালাম। ভাবলাম বলি, এই একই কথা রিয়াদ অফিসে যোগ দেবার কিছুদিন পরই শুনেছিলাম তোমার বস, তায়সির দাউদের কাছে। নাহ, থাক, কাবাব মে আর হাড্ডি না ঢোকাই। তায়সিরকে যে ফাহাদ মোটেও সহ্য করতে পারে না, তা তো জানি। কী দরকার আর বেহুদা এই হরিষে বিষাদ ডেকে আনার? “তুমি যে গ্রামটির খুব প্রশংসা করেছ, সেটাও ঐ লোক বলেছিল সাথে সাথেই শেখসাহেবকে। শুনে, আহ্লাদে আটখানা উনি। আজ কিন্তু তুমি এক্কেবারে বাজিমাত করে দিয়েছ।” তাই নাকি ? আমি তো সারাক্ষণই চিন্তায় ছিলাম, পড়লাম কিসের পাল্লায়! কী না কী ভুল করে ফেলি। কিছুই তো জানি না সৌদি কায়দাকানুন। তদপুরি আমরা বাঙালিরা খালি হাতে কোন দাওয়াতে যাই না। অথচ এখানে তাই হল!
‘আরে দূর! ঐটা বাদ দাও। তুমি হলে আজনবি মানে গেস্ট। তোমার জন্য ওটার দরকারই নাই কোন। আমি তো নিয়ে গেছি। আমার গাড়ির বুট, যেটিকে তুমি মোবাইল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নাম দিয়েছ, ওখানে সবসময়ই আমাদের বাগানের দুই চার পাঁচ প্যাকেট সুক্কারি থাকে। ঐ গুলো খুব কাজে দিয়েছে। আর গতকালই, কি মনে করে যেন বেশ ভাল এ শিশি আউদ কিনেছিলাম। ওগুলো পেয়েই তো সবাই আনন্দে আটখানা। আচ্ছা, তোমার কি বাড়ি ফেরার খুব তাড়া আছে?’ না তো, কেন? ‘তা হলে, এখন বাজে মাত্র চারটা। যাচ্ছি যে গতিতে রিয়াদ ফিরতে ফিরতে ৬টা বাজবে। এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কী করবো? তাই ভাবছিলাম, সামনে আমার পছন্দের একটা মরুভূমি আছে, ওখানে থামবো। চা টা বানিয়ে খাবো। মাগরিব নামাজ পড়ব। তারপর খোলা আকাশের নীচে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে ফিরবো রাতে রিয়াদে।’ উত্তম প্রস্তাব।‘আচ্ছা, চল গান শুনি। লেবানিজ নেন্সি আজ্রাম এর গান শুনছো? দূর এই বেটারা স্ক্রিনটা দিয়েছে পিছনে। ঠিক আছে আপাতত গলাটাই শোন।” যাক, বড় বাঁচা গেছে। জেনারেল মটরস এই গাড়ির, ডি ভী ডি স্ত্রিনটি বসিয়েছে পেছনে। না হয় গাড়ি চালাতে চালাতে ন্যান্সির ডাকে, কোথায় যে নিয়ে যেত ফাহাদ আমাকে! ভাবতেও শিউরে উঠছে গা। শুনছি ন্যান্সির গান। কী যে বলছে আরবিতে, বোঝার চেষ্টা করছি। হাবিবি শব্দটা ছাড়া কিছুই বুঝতে পারছি না। মাঝে মাঝে মদির তার কণ্ঠে বলছে ‘আখাসমাক আহ’ কী যে অর্থ? নাকি অর্থহীন ধ্বনি ওটা? আচ্ছা, যাহা ঘটিল আজিকে দ্বিপ্রহরে, ঐরকম রকম কিছু যে ঘটিবেই, এ কি জানা ছিল ফাহাদের? ধরেই নিয়েছিল নাকি সে, আজ দুপুরের খাওয়াটা হয়ে যাবে আমাদের মরু আতিথেয়তার জেরেই। হুম, হতেই পারে তা। কিন্তু গোটা বিষয়টাই তো ছিল আমার কাছে একদম আচানক ও অভাবনীয়! বেরসিক আমি তাই ন্যন্সির মদির কণ্ঠের জালের ফাঁক গলে গিয়ে হাজির হলাম সেই মজলিসে, ছিলাম যেখানে ৩০/৪০ মিনিট আগেও। বহিরঙ্গ মাটির তৈরি হলেও, অন্দরে মজলিস ঘরটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিতসহ যাবতীয় আধুনিক উপকরণে সমৃদ্ধ। দেখছি, মেঝেতে পা দেবে যাওয়া রঙিন পুরু কার্পেট বিছানো, মজলিস ঘরের দেয়াল ঘিরে রাখা বেদুঈনদের বোনা রঙ্গিন কাপড় আল সাদুর চমৎকার তাকিয়া ও কুশন গুলো। মেটে রঙ্গয়ের দেয়ালজুড়ে সাদা রঙের জ্যামিতিক কারুকাজ। ছাঁদের কড়ি বর্গাগুলো বানানো হয়েছে সরাসরি গাছের কান্ঠ বসিয়ে। যার উপরে পাটির মতো করে বিছানো দেখছি যা, ওগুলো কী বাঁশ।
আচ্ছা, ঐ কড়িবর্গাগুলো থেকে হারিকেন ঝুলছে কেন? এখানেও কি ঢাকার মতো ঘন ঘন লোড শেডিং হয় নাকি । ওহ হো, ওগুলোতে তো দেখছি বাল্ব বসানো। তার মানে হারিকেনগুলো পরিণত হয়েছে এখানে ল্যাম্পশেইডে। দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা সেলফে ও বেশ বড় সড় আয়তাকার ঘরটির নানান জায়গায় দৃষ্টিনন্দন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরবিয় ঐতিহ্যের কফি পট, কাপ সহ টুক টাক আসবাব ও তৈজসপত্র। যার কোনটা চকচকে সোনালি পিতলের। কোনটা বা তামার। আর কোন কোনটা হল চমৎকার কারুকাজ সমৃদ্ধ চিনামাটির।
আসলে, শুরুতে এসবের কিছুই চোখে পড়েনি। ফাহাদের পিছু পিছু, খোলা দরজা বরাবর উচ্চস্বরে সালাম দিয়ে মজলিসের বাইরে জুতো খুলছি যখন, তখনি হাসিমুখে এক তরুণ এসে দাঁড়িয়েছে দরজায় সুগন্ধি ধোঁয়া উঠা বাখুর হাতে।
আমাদের গ্রামে যেমন দেখেছি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সন্ধ্যায় ধুপদানিতে ধুপ জ্বালিয়ে ঘরে ধূপ ধুনা দেয়, তেমনি এরাও কারুকাজমণ্ডিত পাত্রে সুগন্ধি কাঠ বা আগার যে জ্বালায় দেখেছি তা, এমনকি শপিং মলেও। মজলিসের তরুণ, হাতে ধরা বাখুরের সুগন্ধি ধোঁয়ায় আমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে যখন, তখনই ভেতর থেকে গমগমে গলায়, ওয়া আলাইকুম আসসালাম পিঠাপিঠি আহলান সাহলান বলতে বলতে স্বয়ং শেখ আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন আমাদের মজলিসে ঢুকে নির্দিষ্ট বসার জায়গাটিতে বসার জন্য। ভিরমিই খেয়ে গিয়েছিলাম তাতে। ভাবছিলাম, বিষয় কী? ফাহাদের এই মিসকিনকে দেয়া হচ্ছে কেন এই শাহী সম্মান? ঘটছে কী তাহলে এ স্বপ্নে? দেখবো নাকি চিমটি কেটে?
এরপর, ক্ষনে ক্ষণে শেখের, উপস্থিত তাঁর জনা ছয়েক সাগরেদের, ঐ গ্রামবাসীর ও ফাহাদের কণ্ঠ নিঃসৃত, হালা ওয়াল্লা, হায়াক আল্লাহ, মারহাবা, ইয়াল্লা, ইনশাল্লাহ, খালাস, ওয়াল্লা , শুনতে শুনতে, সামনে পরিবেশিত অতি উত্তম খেজুর ছোট ছোট কামড়ে খেতে, গাওয়া মানে আরবি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে, ভির্মি কাটিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম ঘোরে। এরপর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে, কাপ চার কি পাঁচ কাপ গাওয়া ও আধা ডজন খেজুর শেষ করার পর, কিছুটা ধাতস্থ হতেই, ফিস ফিস করে ফাহাদকে বলেছিলাম, এবার উঠা যাক, কী বল? ‘হায়, আল্লাহ বলছ কী! তীরে এসে তরী ডোবাবে নাকি তুমি? লাঞ্চ না করে উঠবে কিভাবে। শেখ তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন, তাঁকে অপমান করবে নাকি?’ আস্তাগফিরুল্লাহ! আমাকে মাফ করো ফাহাদ। এর আধাঘণ্টা পর গোলকার বিশাল আরবি ট্রে ভর্তি ধোঁয়াউঠা পোলাউয়ের উপর শুয়ে আস্ত দুম্বাটিকে মজলিসে ঢুকতে দেখলাম, বুঝেছিলাম বসেছি সৌদি শেখের সাথে, ক্যাবসা খেতে হবে তাহার সাথে! যদিও পেটে খুব একটা জায়গা নাই। কি ব্যাপার ফাহাদ? গাড়ির হঠাৎ ঝাঁকিতে কোন দিকে না তাকিয়েই বলে উঠি। ‘উই কেইম’ বলেই বাইরের দিকে তাকানো ইশারা দেয়– হুম, হাইওয়ে ছেড়ে মরুতে নেমে পড়েছে গাড়ি। মহানন্দে ঘোরাচ্ছে স্টিয়ারিং ফাহাদ দ্রুত ডানে বাঁয়ে। এভাবে মিনিট দশেক গাড়ি চালিয়ে, মরুর বেশ গভীরে ঢুকে, যুৎ মতো একটা জায়গায় থামাল গাড়ি ফাহাদ। অনেকক্ষণ বসে থেকে জমে যাওয়া শরীরকে চাঙ্গা করতে সাথে সাথে দরজা খুলে মরুতে নামতেই, গেল গা কুঁকড়ে। শেষ বিকেলের দিকে, ডিসেম্বর হিম ক্রমশ ঝাঁকিয়ে বসছে ধূধূ বালিতে। হয়েছে সঙ্গী তার সাথে হুহু বাতাস! উপায় কী এখন? যে জ্যাকেট চাপানো গায়ে, নিতান্তই অপ্রতুল ঠেকছে ওটা। ‘এই নাও, এইটা চড়াও গায়ে’, গাড়ির পেছন থেকে গাঢ় বাদামি রঙয়ের একটা পশমি ওভারকোট গায়ে চড়িয়ে ফাহাদ নিয়ে এসেছে একই রকম আরেকটা আমার জন্য!
বাহ! চমৎকার তো। একেই বলে, যেমন বুনো তেমনি বাঘা তেঁতুল। এই বাতাস ও এরকম ঠাণ্ডায় এটাই তো দরকার। গায়ে দিয়ে ভাবি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।









