গত সংখ্যায় সামরিক বাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরায়ণতার ওপর আলোকপাত করার চেষ্টা করেছিলাম। এরই মাঝে ১ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পবিত্র মদিনা মনোয়ারা থেকে আগত যাত্রীদের ভোগান্তিকে কেন্দ্র করে একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা জাতি হিসেবে কোন পর্যায়ে বা কোন অবস্থানে অবস্থান করছি। এ প্রসঙ্গে ২ অক্টোবর ২৬ রাতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন আমার একটি সাক্ষাৎকারও প্রচার করে। সেই সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি। ঘটনার উৎপত্তি যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত ট্রলি না থাকা, সময়মত লাগেজ না পাওয়া তথা অব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিড়ম্বনা থেকে। এই অব্যবস্থাপনা একটি সামষ্টিক বিষয়। সেদিন মেজর (অবঃ) আখতারুজ্জামান হয়ত রাগের বশবর্তী হয়ে ব্যাপারটাকে ব্যক্তি পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। তবে তার কথায় কিছু বাস্তব অবস্থাও সামনে এসেছে, তা হল আমরা বোয়িং ক্রয় করছি আবার আমাদের ট্রলি নাই, আমরা এয়ার বাস ক্রয় করছি আবার লাগেজ বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহে অপেক্ষারত যাত্রীদের বসার কোনও ব্যবস্থাই নাই। অন্যদিকে আমরা যে কত অসহনশীল হতে পারি তাও আবার মেজর (অবঃ) আখতারুজ্জামান এর মত জাতীয় সংসদে দুই দুই বার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং জ্যেষ্ঠ একজন সামরিক কর্মকর্তার আচরণ থেকে লক্ষ্য করেছি। সব মিলিয়ে এটিও জাতি হিসেবে মানস গঠনে আমাদের অনেক কিছু করার আছে সেই বার্তাই দেয়।
এবার আসি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ভবিষ্যৎকে কীভাবে উচ্ছন্নে যাওয়ার পথে টেনে নিচ্ছে সে বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করব। অপ্রিয় হলেও প্রথমেই বলে রাখি, আমাদের উচ্চ বিত্ত এবং উচ্চ পর্যায়ের পদপদবীর অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের ছেলেমেয়েরা ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করেন। সুতরাং মনে হয় সংগত কারণে তারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে খুব একটা ভাবিত নন।
যদি তাদের ভাবনাতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যথাযথ গুরুত্ব বহন করত তবে অন্তত চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সংকটের উদ্ভব হত বলে আমার মনে হয় না। ২৭ জুলাই ২০২৬ যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এক তুঘলকি আদেশে ২১ সেপ্টেম্বর ২৬ সে–নিয়োগ বাতিল! একই সাথে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শরীফুল আলমকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
অধ্যাপক সায়েম এর নিয়োগ বাতিলকে কেন্দ্র করে ছাত্র–ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেপ্টেম্বর ২১ থেকে আন্দোলনে। ছাত্র–ছাত্রীরা এখন ক্লাস বাদ দিয়ে কোনদিন কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা, কোন দিন পথ নাটক, কোন দিন বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমা দেখায় সময় পার করছে। এখানে লেখাপড়া কোথায়? এখন প্রশ্ন একজন উপাচার্য নিয়োগদানের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক যাচাই বাছাই, বিচার বিবেচনা করেন, অধ্যাপক সায়েমের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই তাই করা হয়েছিল, এই প্রক্রিয়ায় অধ্যাপক সায়েমের কোন দুর্বলতা বা অসংগতি পরিলক্ষিত হলে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কেন? আবার নিয়োগ যখন দেওয়াই হয়েছে তখন একজন শিক্ষককে এভাবে অপদস্থ অপমান করে তার নিয়োগ বাতিলই বা কেন করা হল? নাকি অধ্যাপক সায়েম রাজনৈতিক কোন রশি টানাটানির বলির পাঁঠা হলেন?
এখানে সত্য যেটিই হোক এটি যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে ছেলেখেলা খেলছেন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এ খামখেয়ালিপনা থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত। আর যারা এ ছেলেখেলায় মত্ত তাদের মুখোশ জাতি দেখতে ইচ্ছে করলে দেখতে পারে আবার ইচ্ছে না করলে নাও দেখতে পারে! তবে মুখোশের মাঝে লুকিয়ে থাকাদের মুখোশ উন্মোচনে এ জাতির বিবেক জাগ্রত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
এবার আসি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষা পরিকল্পনা প্রসঙ্গে। আমাদের অলি গলিতে এখন বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের জনসংখ্যার কারণে আমাদের প্রচুর উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। প্রশ্ন হল আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে বর্তমানে যে সব বিষয় বা কারিকুলামে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে তা কি আমাদের জাতীয় জীবনে বা জাতীয় অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় জনবলের যোগান দিচ্ছে না কি এই অপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় জীবনে বোঝা সৃষ্টি করছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের অবিলম্বে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
শিক্ষাঙ্গনে মাস্তানি! আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পূর্বেও শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদের কিছু কিছু দৌরাত্ম্য তথা মাস্তানিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত এবং মহামারীর মত বিস্তার লাভ করে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ফাইনান্সিয়াল টাইমস এর প্রধান বৈদেশিক সংবাদ বিষয়ক মন্তব্যকারী গিডিয়ন র্যাচম্যান কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলে বসেন ছাত্রদেরও একটি রাজনৈতিক দল থাকা উচিত। সেই থেকে আমাদের প্রচুর সংখ্যক মেধাবী ছাত্র–ছাত্রী নিজেদের পড়ালেখা চুলায় যাক এমন মনোভাব নিয়ে, ভবিষ্যতে জাতি গঠনে নেতৃত্ব গ্রহণের পথ পরিহার করে নেমে পড়ে রাজনৈতিক নানা অন্ধি সন্ধি, অলি গলিতে। এমন এক উর্বর ভূমিতে ‘মবোক্রেসি’ নামক নতুন এক শব্দ যোগ হয় বাঙালির অভিধানে। ছাত্ররা পরীক্ষা না দিয়ে ‘অটোপাস’ দাবিতে নেমে পড়ে। ছাত্ররা পৌঁছে যায় সচিবালয়ে ‘তদবিরে’ ‘তদারকিতে’। শিক্ষক হয়ে পড়েন স্বীয় ছাত্রের সামনে নতজানু। উপাচার্যের মুখের ওপর ছাত্ররা বলে বসেন, ‘আপনি কোন যোগ্যতায় উপাচার্য হননি, আমরাই আপনাকে উপাচার্য বানিয়েছি’। দল বেঁধে ছাত্ররা যান খাতুনগঞ্জে ব্যবসা বুঝতে, সীতাকুণ্ডের শীপব্রেকিং ইয়ার্ডে শীপ ব্রেকিং এর তেলেসমাতি বুঝতে, ছাত্ররা ব্যবসায়ীদের ডাকেন চেম্বার অব কমার্সে ব্যবসার পাঠ দিতে। অথচ একটি আন্দোলনের পর তারা নিজেদের পঠনে গঠনে মগ্ন রাখার কথা ছিল। তা হয়নি! আমরা আমাদের অমন তরতাজা প্রাণ, সাহসী তরুণ সমাজকে নিজেকে হারানোর নিজেকে হননে মত্ত হতে দেখলাম! এই যাত্রায় যারা মবোক্রেসির শিকার হয়েছেন তারা আমাদের এই তরুণদের অন্তর থেকে অভিশপ্ত করলেন, আর যারা এদের কাঁধে সওয়ার হয়েছেন তারা নিজেরা দূর থেকে কেবল ক্ষমতায় মদমত্ত থেকে ডুগডুগি বাজিয়েছেন।
আমাদের সেই দিশাহীন নেতৃত্ব আমাদের শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নষ্ট সময়ের মুখোমুখিই করেনি বরং কিশোর গ্যাং নামক সমাজে একটি দুষ্ট ক্ষতও সৃষ্টি করে। সামপ্রতিক পুলিশের অভিযানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক হাজার কিশোর গ্রেফতারের শিকার হয়, এটি কি হওয়ার কথা ছিল? এরা তো এই বয়সে নিজেকে গড়ার কাজে নিমগ্ন থাকার কথা ছিল। তাহলে হচ্ছেটা কী? এ জাতি ভিতর থেকে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, এ জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নষ্ট সময়ের শিকার হচ্ছে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। নিখাদ সত্য এ প্রবাদ এখন মুখ থুবড়ে পড়ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত আমার লেখা ‘আমাদের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাঙ্গন’ এ যা লিখেছিলাম আজকের প্রেক্ষাপটে তা আবারও তুলে ধরছি।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা (UNISA)। ২০০৬ সালে আমি যখন প্রিটোরিয়ায় তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এ মহান বিদ্যাপীঠে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সে দেশের পুলিশ প্রধান। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রবেশদ্বারে উৎকীর্ণ রয়েছে ১৩ মার্চ ২০১৮ সালের নেলসন ম্যান্ডেলার বিখ্যাত উক্তি।
“Destroying any nation does not require the use of atomic bombs or the use of long-range missiles. It only requires lowering the quality of education and allowing cheating in the examinations by the students”. এর মর্মার্থ হল : “একটি জাতিকে ধ্বংসের জন্য পারমাণবিক বোমা বা দূর পাল্লার মিসাইল ব্যবহারের প্রয়োজন নাই। এটা করার জন্য ঐ জাতির শিক্ষার মানে অধোগতি আর ছাত্রদের পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগই যথেষ্ট”। এর সরল সোজা ফলাফল হবে এ শিক্ষা ব্যবস্থা আর পরীক্ষা পাশ করা– শিক্ষকের হাতে গড়ে উঠবে অকর্মণ্য অপদার্থ ছাত্র– ডাক্তারের হাতে অপচিকিৎসায় রোগী মরবে– অদক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের কারণে ইমারত ভেঙে পড়বে– মূর্খ অর্থনীতিবিদের হাতে অর্থনীতি দেউলিয়া হবে– দুর্বল বিচারকের হাতে বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
এভাবেই একটি জাতি তার শিক্ষা ব্যবস্থার গলদের মাশুল দিতে গিয়ে ধ্বংসের প্রান্তে পৌঁছে যাবে। অতএব আমাদের আত্মহনন থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন পরিত্রাণ পায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












