চোখ বুজলে এখনো দেখতে পাই দৃশ্যটা।
মেলার মাঠ। হ্যাজাক বাতির কাঁপা কাঁপা আলো। বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো একটা পর্দা, তার সামনে গাদাগাদি করে বসে আছি আমরা কয়েকজন– কারও কোলে ছোট ভাইবোন, কারও হাতে মুড়ি–বাদামের ঠোঙা। ঢোল–হারমোনিয়ামের শব্দ শুরু হতেই বুকের ভেতর একটা উত্তেজনা কাজ করত, যেন এখনই কিছু একটা জাদু ঘটতে চলেছে। তারপর সেই জাদুটাই ঘটত–কাঠ আর সোলার একটা পুতুল হঠাৎ প্রাণ পেয়ে যেত, নেচে উঠত, কথা বলত, কাঁদত, হাসাত। আমরা তখন ভুলেই যেতাম ওটা আসলে সুতোয় বাঁধা একটা পুতুল মাত্র।
আজ এই স্মৃতিটা লিখতে গিয়ে বুঝি, কতটা দূরে চলে এসেছি সেই মাঠ থেকে।
একটা সময় ছিল, যখন গ্রামের মেলা মানেই ছিল পুতুল নাচ। উৎসব–পার্বণ, পূজো কিংবা কোনো বিশেষ দিন উপলক্ষে রাত জেগে বসত এই আসর। টেলিভিশন তখনও অনেকের ঘরে পৌঁছায়নি, মোবাইল ফোনের তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই এই পুতুলনাচই ছিল আমাদের প্রজন্মের কাছে বিনোদনের সবচেয়ে বড় জানালা– একমাত্র জায়গা, যেখানে গল্প দেখা যেত, শোনা যেত, একসঙ্গে অনুভব করা যেত।
পালাগুলোয় থাকত রাজা–রানির গল্প, বনবাসের কষ্ট, গরিব ঘরের ছেলে–মেয়ের সংগ্রাম, হিংসার পরিণতি, প্রেমের জয়–পরাজয়। সাপ, নৌকার মাঝি, কুমোর, বাঘ, হরিণ, ঘোড়া– গ্রামীণ জীবনের প্রায় প্রতিটা চেনা চরিত্র উঠে আসত পুতুলের অভিনয়ে, হাসি–ঠাট্টা আর তামাশার মোড়কে। বড়দের কাছে এগুলো ছিল নীতিকথা, ধর্মকথা আর জীবনবোধ শেখানোর এক নীরব মাধ্যম। শিশুদের কাছে ছিল শুধুই আনন্দ, বিস্ময়।
অনুষ্ঠান শেষ হলে হুট করেই যেন একটা ঘোর কেটে যেত। পুতুলগুলো তখন নিথর হয়ে পড়ে থাকত মঞ্চের কোণে, ঠিক আগের মতোই–শুধু প্রাণটা যেন কোথায় হারিয়ে যেত। আমরা হাঁটা দিতাম বাড়ির পথে, টর্চের আলোয় বা জ্যোৎস্নায়, মুখে তখনও লেগে থাকত সেই গল্পের রেশ। পথে হাঁটতে হাঁটতে কেউ একজন নকল করত পুতুলের সংলাপ, কেউ গুনগুন করত সেই গানের সুর। ঘরে ফিরে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও চোখ বুজলে ভেসে উঠত সেই নাচের দৃশ্য–যেন গল্পটা তখনও শেষ হয়নি আমাদের ভেতরে। আজ ভাবলে অবাক লাগে, একটা সন্ধ্যার আনন্দ কীভাবে এতটা দিন, এতটা বছর ধরে বুকের ভেতর জেগে থাকতে পারে।
এই আনন্দটা তৈরি হতো অসংখ্য মানুষের নিঃশব্দ পরিশ্রমে– তা আমরা তখন খুব একটা বুঝতাম না। একদল মানুষ রাতভর সুতো টানত, পুতুলের হাত–পা–মাথা নাড়িয়ে চরিত্রে প্রাণ দিত। আরেকদল বাজাত ঢোল–হারমোনিয়াম–বাঁশি, গলা মেলাত গানে। কেউ কাঠ–সোলা কেটে, রঙতুলি দিয়ে সাজিয়ে বানাত পুতুলগুলো–এক–একটা পুতুল যেন একেকটা শিল্পকর্ম।
অথচ এই পরিশ্রমের বিনিময়ে রোজগার ছিল সামান্যই। চার–পাঁচ দিনের একটা অনুষ্ঠান করে হাতে আসত সামান্য কিছু টাকা, যা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। তবু এই পেশাটাই ছিল অনেক পরিবারের একমাত্র জীবিকা–বাপ–দাদার হাত ধরে ছেলেও শিখে নিত সুতো টানার কৌশল, পুতুল বানানোর কারুকাজ, গানের সুর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই বেঁচে থাকত এই শিল্প, মুখে মুখে, হাতে হাতে।
তারপর একদিন ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ল টেলিভিশন। তারপর এল মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব। যে শিশুটা একসময় রাত জেগে মেলার মাঠে পুতুল নাচ দেখার জন্য বায়না ধরত, সে এখন হাতের মুঠোয় থাকা একটা পর্দাতেই সব পেয়ে যায়– খেলা যায়, গল্প শোনা যায়, নাচ–গান দেখা যায়, তাও একা একা, নিজের ঘরে বসে। মেলার মাঠে জড়ো হয়ে একসঙ্গে কিছু দেখার সেই তাগিদটাই আর নেই।
ফল যা হওয়ার তাই হলো। একে একে অনুষ্ঠানের ডাক কমতে থাকল। যাঁরা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই বাধ্য হলেন অন্য পেশায় চলে যেতে–আয় না থাকলে আর কতদিন টিকে থাকা যায়? নতুন প্রজন্ম তো এই কাজে আসতেই চাইছে না, কারণ তারা দেখছে, এতে পেট চলে না। এক সময়ের যে শিল্পটা ছিল গ্রামের প্রাণ, আজ সেটা টিকে আছে শুধু হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের একগুঁয়ে জেদের ওপর ভর করে–যাঁরা কোনো এক অদ্ভুত মমতায় এখনো পুতুল বানান, সুতো টানেন, গান করেন, যদিও জানেন এতে আর আগের মতো রোজগার হয় না।
মাঝে মাঝে আরেকটা সমস্যাও শোনা যায়–পুতুল নাচের নাম করে কোথাও কোথাও অশ্লীল নাচ–গানের অভিযোগ ওঠায়, প্রকৃত শিল্পীরাও এখন অনুষ্ঠান করার অনুমতি পেতে ঝক্কি পোহান। যে শিল্পটা এমনিতেই ধুঁকছে, তার ওপর এই বাড়তি বাধা যেন লবণ ছিটিয়ে দেয় ক্ষতে।
এখনও, কালেভদ্রে, কোনো মেলায় বা বিশেষ আয়োজনে হঠাৎ দেখা মেলে পুতুল নাচের আসরের। আর সেই আসরে ভিড় জমতে দেখলে বোঝা যায়, এই শিল্পের প্রতি টানটা মানুষের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি–শুধু চাপা পড়ে আছে প্রযুক্তির ভিড়ে। কেউ কেউ এখনো বিশ্বাস করেন, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহ্য আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় এই শিল্পীদের মুখে–যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন এই পুতুলের সঙ্গেই থেকে যাবেন, মানুষের মনে একটু আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে যাবেন। এই কথাটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে গোটা শিল্পটার ভবিষ্যৎ– একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে।
আজ যখন কোনো মেলায় গিয়ে চোখে পড়ে না সেই বাঁশের মঞ্চ, কানে বাজে না ঢোল–হারমোনিয়ামের সেই চেনা সুর, তখন বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাটা শুধু একটা বিনোদনের হারিয়ে যাওয়া নয়–এটা একটা জীবিকার, একটা সংস্কৃতির, একটা প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের যোগসূত্রের হারিয়ে যাওয়া।
হয়তো আমরা কখনোই আর ফিরে পাব না সেই রাত জাগা মেলার মাঠ, সেই হ্যাজাক বাতির আলো, সেই সুতোয় বাঁধা জাদু। কিন্তু স্মৃতিতে অন্তত এটুকু থেকে যাক–একদিন এই দেশের প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা মেলায়, কাঠ আর সোলার তৈরি কিছু পুতুল সত্যিই নেচেছিল আমাদের জন্য, আমাদের সঙ্গে। প্রশ্নটা শুধু এটুকুই থেকে যায়–আমরা কি একবারও ফিরে তাকাব সেই মাঠের দিকে, নাকি স্মৃতিটাও একদিন হারিয়ে যাবে পুতুলগুলোর মতোই?











