ভবঘুরে অসহায় মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা

আ ব ম খোরশিদ আলম খান | সোমবার , ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৪৭ পূর্বাহ্ণ

শহর–নগরের সবখানে দিন দিন ভবঘুরে দরিদ্র ভাসমান অসহায় মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, পথে–ঘাটে কিংবা কোনো ভবনের স্থাপনা বা খোলা চত্বরে ভবঘুরে ভাসমান মানুষের নিত্য আনাগোনা পদচারণা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসা এই দরিদ্র নারী–পুরুষ–পথশিশুরা নগরীতে খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই নিচ্ছে। বিশেষ করে নদী ভাঙনে, বন্যা ঝড় তুফানে ঘরবাড়িহারা হয়ে এসব অসহায় মানুষ গ্রাম থেকে ছুটে আসে শহরের দিকে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। তারা চরম দরিদ্র ও ভবঘুরে। এই শহরে নগরে তাদের অনেকে কোনো কাজ জোগাড় করতে না পেরে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায়। তাদের ছেলে–মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। পড়াশোনার সুযোগ পায় না। দরিদ্র দুস্থ অসহায় বলেই এই গরিব পরিবারের ছেলে–মেয়েরা শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে যুগ–যুগ ধরে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। তাদের মা–বাবারা তাদের মুখে দুই বেলা খাবার তুলে দিতে পারে না চরম আর্থিক অভাব অনটনের কারণে। ফলে তাদের দিন–রাত কাটে প্রচন্ড ক্ষুধা ও জঠর জ্বালায়। শহুরে বিত্তবান ধনী মানুষেরা এই গরিবদের নিত্য জীবন যন্ত্রণা, ক্ষুধা ও জঠর জ্বালা দেখেও না দেখার ভান করে দিব্যি আরাম আয়েশে দিন পার করছে। গরিব দুস্থ অসহায় মানুষের জন্য আমাদের অনেকের মায়া জন্মে না। ধনীরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত পরিবার, ছেলে সন্তান, আত্মীয় স্বজনের জন্য কতো টাকাই না কতোভাবে খরচ করেন। হোটেল–রেস্তোরাঁয় বসে বন্ধু বান্ধবরা খানাপিনায়–চা নাশতায় শত শত হাজার হাজার টাকা খরচ করতে মোটেই দ্বিধা করেন না। অথচ এই ধনীদের চারপাশেই কান পাতলে শোনা যাবে গরিব মানুষের নিত্য আর্তনাদ–আহাজারি। ধনীরা সামান্য খরচ কমিয়ে চারপাশে থাকা অভাবী দরিদ্র লোকগুলোর দিকে মানবিক দৃষ্টি দিতে পারেন। একেকজন ধনী একেকটি দরিদ্র অসহায় পরিবারের দায়িত্ব নিলে তাঁর চারপাশে থাকা দরিদ্র মানুষগুলো কোনো মতে জীবনতরী চালিয়ে নিতে পারে। প্রতিদিন কিছু টাকা সাশ্রয় করে কিংবা বাহুল্য খরচ কমিয়ে ধনীরা গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ালে এদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি অনেকটা লাঘব হতো। কিন্তু না, ধনীরা এই মানবিক দায়িত্ব পালনে অনেকটা বেখেয়াল ও অমনোযোগী। চারপাশে থাকা গরিব মানুষের আর্তনাদ–আহাজারি তাদের অনেকের কর্ণকুহরে কিছুতেই পৌঁছে না। ভাবখানা এমন যে, গরিবরা যে যেভাবে আছে থাকুক, তাতে আমাদের কী করার আছে! মূলত, ধনীদের এই আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে এদেশে এখনো দারিদ্র্য পরিস্থিতি জিইয়ে রয়েছে। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরে এসেও এদেশে গরিব মানুষের হাহাকার ধ্বনি বা আর্ত বিলাপ দেখেও আমাদের ঘুমন্ত চেতনা কেন জাগে না? ভবঘুরে আশ্রয়হীন ঠিকানাহীন মানুষের জন্য আমাদের মন কেন কাঁদে না! এরাও যে মানুষ, এদেরও যে সুখানুভূতি দুঃখানুভূতি আছে তা আমাদের অনেকই লক্ষ্য করি না। ফলে, গরিব মানুষেরা আমাদের চোখের সামনেই মানবেতর জীবন কাটায়। রাতে তারা শহরের ফুটপাতে কাঁথা–বালিশ–মশারি ছাড়া ইট পাথরের ওপর ঘুমায়। তা দেখেও আমরা না দেখার ভান করি। আমাদের বিবেক উপলব্ধি মানবিক চেতনা তবুও জেগে ওঠে না। আমাদের সরকারগুলোও ফুটপাতে থাকা ঘরদোরহীন ভবঘুরে এই অসহায় মানুষগুলোর দিকে খুব একটা মানবিক দৃষ্টি দেয় না। বড় পরিসরে নেয় না কোনো মানবিক পদক্ষেপ। তাদের পুনর্বাসনের দাবি কেউ আমলে নেয় না। সীমাহীন দুঃখ–কষ্ট সয়ে চলাই যেন এই গরিব ভবঘুরে মানুষগুলোর নিয়তি। আর কতোকাল চলবে গরিব মানুষের প্রতি অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা?

ঢাকা শহরে এখন প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের লোকসংখ্যা এখন এক কোটির কাছাকাছি। এর বাইরে আরো অনেক শহর–নগর আছে। যেখানে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। এই শহর–নগরে থাকা কয়েক লাখ ভবঘুরে আশ্রয়হীন ঠিকানাহীন মানুষের জন্য পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া বড় কঠিন কোনো কাজ নয়। দরকার শুধু একটু দরদ ও মানবিক উদ্যোগ। সরকার চাইলে ভবঘুরে নারী–পুরুষ–পথশিশুদের তালিকা করে তাদের জন্য ন্যূনতম খরচে ঘরদোর বানিয়ে দিতে পারে। এই অসহায় গরিব পরিবারগুলোর ছেলে–মেয়েদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এটা তো সরকারের কাজের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকতে পারতো। কিন্তু এখনো এদিকে সরকারের দৃষ্টি পড়ছে না এটাই দুঃখজনক। সরকার পর্যায়ক্রমে কয়েক বছরের মধ্যে পাঁচ কোটি দরিদ্র পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি সুদূরপ্রসারী ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সারা দেশে থাকা বিশেষ করে শহরে–নগরে থাকা ভাসমান ভবঘুরে নারী–পুরুষ–পথশিশুদের তালিকা তৈরি করে তাদের জন্য ঘরদোর বানিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেওয়া যে জরুরি তাও সরকারকে বিবেচনায় আনতে হবে। এজন্য যে হাজার হাজার কোটি টাকা দরকার তেমন তো নয়। বরং খুব বেশি আর্থিক বরাদ্দ না করেই এই গরিব ভবঘুরে লোকগুলোর কার্যকর পুনর্বাসন করা সম্ভব–তা সরকার বিবেচনায় রাখতে পারে। ভবঘুরে দুস্থ অসহায় মানুষেরা কোনো ফ্ল্যাট–ভবন বা মার্কেটের খোলা চত্বরে রাতে একটু ঘুমাতে চাইলে মানবিক কারণে তাদের এই সুযোগ দিতে হবে।

অন্যদিকে, শহর–নগরে পর্যাপ্ত গণশৌচাগার নেই। আর যা শৌচাগার আছে তা ভবঘুরে অসহায় দরিদ্র মানুষেরা ব্যবহার করতে পারে না। অনেক গণশৌচাগার ব্যবহারে ভাসমান–ভবঘুরে মানুষদের বাধা দেওয়া হয়। যেহেতু তারা টাকা দিতে পারে না, এজন্য গণশৌচাগারগুলোতে তাদের অবাধ প্রবেশাধিকারও নেই। এটি বড় অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা। অথচ যারা এ শৌচাগার পরিচালনা করেন বা লিজ নেন তাদেরকে এ সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, গরিব দুস্থ ভবঘুরে ভাসমান মানুষদেরকে বিনা পয়সায় তারা শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ দেবেন। তা ব্যবহারের পর কেউ টাকা দিতে না পারলে জোর করে টাকা নেবেন না–এই মানবিক সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। প্রস্রাব–পায়খানার প্রয়োজন হলে তখন হাতের কাছে শৌচাগার না থাকলে কী বিড়ম্বনা–কষ্ট–দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় তা একমাত্র ভুক্তিভোগীই জানেন। শহরে–নগরে সব ব্যস্ততম এলাকায় পর্যাপ্ত গণশৌচাগার নির্মাণ করা এবং সবার জন্য তা চব্বিশ ঘণ্টা ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা বর্তমান সময়ে বড় জরুরি। বেসরকারি উদ্যোগেও তা নির্মাণ করা যায়। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ধরনের মানবিক পদক্ষেপ নিয়ে গণশৌচাগার নির্মাণে এগিয়ে আসতে পারে। লক্ষণীয় যে, শহরের মসজিদগুলোতে থাকা টয়লেট শুধুমাত্র নামাজের সময় ব্যবহার করা যায়। নামাজের পর তা তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ভবঘুরে ভাসমান মানুষসহ সকলের জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য অন্তত একটি টয়লেট দিনে–রাতে সব সময় খোলা রাখতে মসজিদগুলোর কর্তৃপক্ষের সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুখের দেশ ভুটান
পরবর্তী নিবন্ধকমিউনিটি ক্লিনিকের তালা ভেঙে দানবাক্সের টাকা ও ওষুধ চুরি