বেঞ্চ যখন ভাঙল বিভাজনের দেয়াল

সনেট দেব | সোমবার , ২ নভেম্বর, ২০২৬ at ১১:১০ পূর্বাহ্ণ

ক্লাসঘরে ঢুকেই একটা শিশু কীভাবে বুঝে যায় সে “গুরুত্বপূর্ণ” নাকি “গুরুত্বহীন”? উত্তরটা প্রায়ই লুকিয়ে থাকে তার বসার জায়গায়। সামনের বেঞ্চ মানেই যেন মনোযোগ, ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা–আর পেছনের বেঞ্চ মানেই অবহেলা, উদাসীনতা, ব্যর্থতার পূর্বাভাস। এই বিভাজনরেখাটা এতই পুরোনো আর এতই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে কেউ প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনও বোধ করে না। অথচ কেরালার কিছু স্কুল সম্প্রতি প্রমাণ করে দিয়েছে, এই রেখাটা মুছে ফেলা যায়–আর সেই সাহসের জন্ম হয়েছে একটি সিনেমা হলে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে মুক্তি পায় পরিচালক বিনেশ বিশ্বনাথনের প্রথম চলচ্চিত্র ‘স্থানার্থী শ্রীকুট্টন’। মালয়ালম ভাষার এই শিশুতোষ ছবির গল্প ঘোরে চার স্কুলছাত্রকে কেন্দ্র করে, যারা দুষ্টু, পড়াশোনায় অমনোযোগী আর ক্লাসের পেছনের সারিতে বসে থাকা ‘ব্যাক বেঞ্চার’ হিসেবে পরিচিত। শিক্ষকের চোখে তারা এমন ছাত্র, যাদের পেছনে বাড়তি সময় ব্যয় করার কোনো মানে নেই।

কিন্তু ছবি যতই এগোয়, ততই দর্শকের চোখ খুলে যেতে থাকে। সমস্যাটা আসলে ছাত্রদের নয়–সমস্যা লুকিয়ে আছে শ্রেণিকক্ষের সেই পুরোনো কাঠামোয়, যা প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের ভাগ করে দেয় সামনে–পেছনে, যোগ্য–অযোগ্য এই বিভাজনে। ছবির শেষ দৃশ্যে তাই দেখা যায় এক প্রতীকী মুহূর্ত–দীর্ঘ সারিবদ্ধ বেঞ্চ ভেঙে সাজানো হয় অর্ধবৃত্তাকারে। শিক্ষক দাঁড়ান মাঝখানে, আর প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান দূরত্বে, সমান গুরুত্বে। কে প্রথম সারিতে আর কে পেছনে–এই প্রশ্নটাই আর অবশিষ্ট থাকে না।

বিনেশ বিশ্বনাথনের এই ভাবনার পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। ছোটবেলায় নিজেই পেছনের বেঞ্চে বসে অবহেলিত হওয়ার যে যন্ত্রণা তিনি টের পেয়েছিলেন, সেটাই তাঁকে এই গল্প বানাতে তাড়িত করে। অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল ২০১৪ সালের তামিল ছবি ‘কাক্কা মুট্টাই’–ও, যা দেখিয়ে দিয়েছিল শিশুদের জন্য বানানো সিনেমাতেও গভীর বার্তা রাখা সম্ভব।

সিনেমা মুক্তির পর এক শিক্ষক ছবিটি নিজের ছাত্রদের দেখান–আর সেখান থেকেই শুরু হয় বাস্তব রূপান্তরের গল্প। কেরালার ত্রিশূর, পালাক্কাড়, কোল্লাম ও কন্নুরসহ অন্তত ছয়–আটটি স্কুলে বদলে ফেলা হয় বেঞ্চের চিরাচরিত বিন্যাস। কোথাও বেঞ্চ সাজানো হয়েছে ‘ইউ’ বা ‘ভি’ আকৃতিতে, কোথাও আবার সম্পূর্ণ অর্ধবৃত্তাকারে–যাতে কোনো বেঞ্চ আরেকটির পেছনে না পড়ে, বরং সবাই একে অপরের মুখোমুখি বসতে পারে। এমনকি সুদূর পাঞ্জাবের একটি স্কুলেও পৌঁছে গেছে এই পরিবর্তনের ঢেউ।

ত্রিশূরের আরসিসি এলপিএস ইস্ট মানগাতের শিক্ষক আলবার্ট ক্রিস্টিনের ভাষ্য, তাঁর ক্লাসে মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী থাকায় এই বৃত্তাকার আসনবিন্যাস চালু করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে। একই কথা বলেছেন ত্রিপুরার একজন স্কুলশিক্ষকও–অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রী হওয়ায় নতুন পদ্ধতি প্রয়োগে কোনো সমস্যা হয়নি, বরং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও অংশগ্রহণ দুটোই বেড়েছে। তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, যেসব ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।

এই পরিবর্তনের ফলাফলও স্পষ্ট–শিক্ষক এখন সব শিক্ষার্থীর দিকে সমানভাবে নজর দিতে পারছেন, আর কেউই আর নিজেকে ‘অদৃশ্য’ মনে করছে না। প্রতিটি শিশু চোখে চোখ রেখে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে পারছে, যা তার আত্মবিশ্বাস আর অংশগ্রহণের মানসিকতায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

নিজের সিনেমার এই সামাজিক প্রভাব দেখে স্বাভাবিকভাবেই আপ্লুত বিনেশ বিশ্বনাথন। তিনি বলেছেন, সিনেমা যে সমাজে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে–এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি কাজ করেন। তাঁর মতে, এর আগে ‘ওস্তাদ হোটেল’ বা ‘ট্রাফিক’–এর মতো মালয়ালম ছবিও সমাজকে নাড়া দিয়েছিল, আর এবার তাঁর ছবিও সেই তালিকায় যুক্ত হলো। তবে সবচেয়ে বিনয়ী মন্তব্যটি হয়তো তাঁর এই একটি বাক্যে–তিনি নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি, শুধু একটা ভুলে যাওয়া সত্যকে আবার সবার সামনে এনেছেন মাত্র।

এই কথাটাই আসলে গুরুত্বপূর্ণ। সমতার ধারণা নতুন নয়, তবু বাস্তবায়নের সাহস অনেক সময় আসে না। একটি সিনেমার দৃশ্য যখন শিক্ষকদের ভাবনায় নাড়া দেয়, তখন বোঝা যায় বিনোদনের বাইরেও শিল্পের একটা দায়িত্ব থাকতে পারে–আর সেই দায়িত্ব পালনে সিনেমা কতটা কার্যকর হতে পারে।

এখন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক–আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোর কী অবস্থা? বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলেই এখনো সেই পুরোনো ধাঁচ অটুট। বেঞ্চ সাজানো থাকে দীর্ঘ সারিতে, শিক্ষক দাঁড়ান সামনে, আর পেছনের সারির শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় অনাদরের আড়ালে। শিক্ষক হয়তো নিজের অজান্তেই মনোযোগ দেন সামনের সারির কয়েকজনের দিকে, আর বাকিরা থেকে যায় দৃষ্টির বাইরে। অথচ সেই ‘বাকিদের’ মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোনো কবি, কোনো বিজ্ঞানী কিংবা কোনো শিল্পী।

বাস্তবতা হলো, কেরালার এই মডেল বাংলাদেশে সরাসরি বসিয়ে দেওয়া অতটা সহজ নয়। ত্রিশূরের যে শিক্ষক মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে অনায়াসে বৃত্তাকার আসনবিন্যাস চালু করতে পেরেছেন, বাংলাদেশের বহু সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি শ্রেণিকক্ষে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসে। শ্রেণিকক্ষের আয়তনও অনেক জায়গায় সীমিত, আসবাবপত্র পুরোনো ধাঁচের লম্বা বেঞ্চে বাঁধা, আর শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাতও অনেক স্কুলে আদর্শ মানের চেয়ে অনেক দূরে। ফলে ‘সবাইকে প্রথম সারিতে আনা’র এই ভাবনাকে হুবহু সম্ভব করতে গেলে বাস্তব বাধা অনেক–জায়গার সংকট, আসবাবের সীমাবদ্ধতা, আর একক শিক্ষকের পক্ষে বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর দিকে সমান মনোযোগ দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ।

তবে এই বাধাগুলো থাকা মানেই এই নয় যে কিছুই করার নেই। বদলটা শুরু হতে পারে ছোট পরিসরে–যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা তুলনামূলক কম, বিশেষত গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয় বা প্রি–প্রাইমারি স্তরে, সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে অর্ধবৃত্তাকার বা ইউ–আকৃতির আসনবিন্যাস চালু করে দেখা যেতে পারে। আবার যেসব ক্লাসে শিক্ষার্থী বেশি, সেখানে পুরো বৃত্তাকার বিন্যাস সম্ভব না হলেও অন্তত নিয়মিত বিরতিতে বেঞ্চ বদল বা আসন পরিবর্তনের চর্চা চালু করা যায়, যাতে কোনো একজন শিক্ষার্থী সারা বছর পেছনের বেঞ্চেই আটকে না থাকে। মূল কথা হলো কাঠামো নয়, মানসিকতা–শিক্ষক যদি সচেতনভাবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর দিকে ফিরে তাকান, তাহলে বেঞ্চের অবস্থান না বদলেও অনেকখানি বদল সম্ভব। তারপরও, যেসব সমাজে একটি সিনেমা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আগে শিক্ষকদের হৃদয়ে পৌঁছে যেতে পারে, সেই সমাজে বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজও একদিন এমন উদ্যোগ নিতে পারবেন–এই আশা করাটা অন্তত অযৌক্তিক নয়।

কেরালার এই উদাহরণ তাই আসলে একটা আয়না। এটা মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করার বিষয় নয়–এটা মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা আর সমান সুযোগের ভাষাও বটে। একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস অনেকটাই নির্ভর করে সে কতটা মনোযোগ পাচ্ছে, কতটা ‘দেখা’ যাচ্ছে তাকে–তার ওপর। আর এই ছোট্ট একটা বিষয়, অর্থাৎ বেঞ্চের বিন্যাস বদলানো, বদলে দিতে পারে একটা শিশুর সারা জীবনের আত্মমূল্যায়ন।

সিনেমা প্রায়ই সমালোচিত হয় তার নেতিবাচক প্রভাবের জন্য–সহিংসতা উসকে দেওয়া, ভুল বার্তা ছড়ানো, বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হরহামেশা। এমন সময়ে ‘স্থানার্থী শ্রীকুট্টন’ এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি ছবি সত্যিকার অর্থে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। হয়তো একদিন বাংলাদেশের কোনো স্কুলেও দেখা যাবে অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো বেঞ্চ, যেখানে শিক্ষক থাকবেন সবার মাঝখানে–সমান দৃষ্টিতে, সমান হৃদয়ে। সেদিন হয়তো ‘ব্যাক বেঞ্চার’ শব্দটা শুধু ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে, বাস্তব জীবনে নয়। আর প্রতিটি শিক্ষার্থীই হয়ে উঠবে প্রথম সারির–শুধু আসনসংখ্যায় নয়, সম্ভাবনার বিচারেও।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধসুখের দেশ ভুটান