জনির কাছে ছিল ৩২টি সরকারি সিল

কোর্ট হিলে টাউট আটক ৫০ টিরও বেশি বিভিন্ন খতিয়ানের জাল কপি ও দুষ্প্রাপ্য সব সরকারি নথিপত্র উদ্ধার

হাবীবুর রহমান | শুক্রবার , ৫ জুন, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

নগরীর কোর্ট হিলের আইনজীবী এনেক্স ভবন১। দিনভর এখানে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের সরগরম ভিড় থাকলেও, ভবনটির ৭২৫ নম্বর চেম্বারটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতের মতো। এখানে আইনজীবীদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন জাহিদুল হাসান জনি নামের এক যুবক। লোকজনের কাছে এই যুবক পরিচিত ছিল ‘পীতাম্বর শাহ’র দোকান’ হিসেবে।

যখন কোনো কিছুর খুব দুর্লভ সংস্করণ বা হারানো জিনিসের খোঁজে মানুষ দিশেহারা হয়, তখন চট্টগ্রামের মানুষ বলে উঠে– ‘বকসিরহাটের পীতম্বর শাহ’র দোকানে গিয়ে দেখো, ওখানে পাওয়া যেতে পারে।’ এই জনিকে নিয়ে লোকমুখে জনশ্রুতি ছিল-‘তার কাছে না পাওয়ার কিছু নেই’। তার কাছে গেলেই জমিজমা সংক্রান্ত যাবতীয় সমাধান নিমিষেই পাওয়া সম্ভব। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির টাউট উচ্ছেদ কমিটি চেম্বারটিতে অভিযান চালিয়ে “পীতাম্বর শাহ’র দোকান” খ্যাত জনিকে আটক করেছে। সেই সাথে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আসামির তালিকায় অজ্ঞাত ৪/৫ জন ব্যক্তিকেও রাখা হয়। সমিতির এক নেতা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম আইন কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জনি আইনজীবী না হয়েও দীর্ঘ এক বছর ধরে ল্যাপটপ ও সিল ব্যবহার করে সরকারি খতিয়ান ও দলিল তৈরির কাজ চালিয়ে আসছিল। চেম্বারটি মূলত যার তিনি নিয়মিত কোর্টে আসেন না। তবে অপর একজন আইনজীবী নিয়মিত চেম্বারটিতে বসেন। সেখানে দু’জন শিক্ষানবীশ আইনজীবীও বসেন। তাদের দু’জনেরই শিক্ষানবীশ আইডি কার্ডের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সমিতির একজন নেতা বলেছেন, এ দু’জন শিক্ষানবীশ আইনজীবীসহ অপর কেউ আটক জনির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন কিনা সেটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পুলিশ।

সমিতির সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ যখন ৭২৫ নম্বর চেম্বারটিতে আকস্মিক হানা দেন, তখন জনি ব্যস্ত ছিল জাল দলিল তৈরিতে। তখন তাকে তাৎক্ষণিক তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে তার কাছ থেকে ৩২ টিরও বেশি সরকারি সিল, ৫০ টিরও বেশি বিভিন্ন খতিয়ানের জাল কপি এবং দুষ্প্রাপ্য সব সরকারি নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পরবর্তীতে সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক ও টাউট উচ্ছেদ কমিটির সদস্য মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে জনিসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। নজরুল ইসলাম জানান, গোপন খবরের ভিত্তিতেই জালিয়াতির এই বিশাল নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যায়।

সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, জনি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। জাল খতিয়ান ও দলিল তৈরির মাধ্যমে তারা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পাশাপাশি শত শত সাধারণ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী আইনি ও আর্থিক জটিলতায় ফেলেছে। জনির এই ‘দোকান’ পরিচালনার পেছনে আরও প্রভাবশালী কোনো অসাধু চক্র কাজ করছে, যাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। আদালত পাড়ার মতো সুরক্ষিত ভবনে বসে দীর্ঘ সময় ধরে জালজালিয়াতি, প্রতারণার মতো অপকর্ম চলায় ক্ষুব্ধ সাধারণ আইনজীবীরা। একজন ‘টাউট’ কীভাবে দিনের পর দিন এই জালিয়াতি চালিয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ঘটনার পরপরই আদালত পাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছেজালিয়াতি চক্রের সদস্য আটক হওয়ায় অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, আবার জনির বিশাল নেটওয়ার্ক থাকার কথা শুনে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আইনজীবীদের দাবি, এই চক্রের শিকড় যত গভীরে থাকুক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সমিতির সদস্য আলী আকবর দৈনিক আজাদীকে বলেন, জনি একজন ‘সিল বাবা’। ডিসি থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ, ইউএনওসহ অনেকের সিল তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নকল শাখার সব রকম সিলও তার কাছে পাওয়া গেছে। খতিয়ান পাওয়া গেছে অনেকগুলো। তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডকুমেন্টের মধ্যে রয়েছে পুরানো অনেকগুলো দলিলও।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইকবাল হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে একজনকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একটি মামলাও হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরামিসা হত্যার রায় ৭ জুন
পরবর্তী নিবন্ধবাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ মামলার চার্জশিট