সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গতকাল শনিবার রূপকথার গল্পই লিখেছেন হৃদয়। ব্যাটসম্যানদের আসা–যাওয়ার মিছিলে একপ্রান্ত আগলে রেখে অপরাজিত ২৪২ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছেন ২৬ ছুঁইছুঁই এই ব্যাটসম্যান। তার ব্যাটিংয়েই খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে একপর্যায়ে বাংলাদেশের রান ছিল ৭ উইকেটে ১৮৪। কার্যত যা, ৮ উইকেটে ১৮৪। আগেই নিশ্চিত ছিল চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া সাদমান ইসলাম নামতে পারবেন না ব্যাটিংয়ে। সেখান থেকে প্রতিরোধ আর পাল্টা আক্রমণের মহাকাব্য রচনা করে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হলো ৩৮৬ রানে। রেকর্ডময় ইনিংসে ২২ চার ও ১১ ছক্কায় ৩৫৯ বলে ২৪২ রানে অপরাজিত রয়ে যান হৃদয়।
প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যানও তিনিই। স্রেফ তিন টেস্ট খেলেই হৃদয়ের মতো ডাবল সেঞ্চুরি পাননি আর কেউ। রেকর্ড ও কীর্তি গড়েছেন আরও অনেক। অথচ কিছুই ছিল না হৃদয়ের পক্ষে। মিরপুর টেস্টে দুই ইনিংসেই বাজেভাবে আউট হওয়ায় অঘোষিত খলনায়ক ছিলেন তিনিই। পরে বাকিদের ব্যর্থতায় সিলেটেও দলের পরিস্থিতিও চলে যায় তার প্রতিকূলে। কঠিন চাপের মুখে তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদকে নিয়ে দারুণ দুটি জুটিতে তিনিই দলকে এনে দিয়েছেন লিড। খবর বিডিনিউজের।
দিনের প্রথম সেশনে একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের সবার আসা–যাওয়া দেখেন হৃদয়। অন্য প্রান্তে রানের চাকা সচল রেখেই খেলতে থাকেন তিনি। লাঞ্চের পর পুরো দায়িত্বই তিনি নেন নিজের কাঁধে। একপর্যায়ে ৩ উইকেটে ১২৪ রান নিয়ে মোটামুটি স্বস্তির জায়গায়ই ছিল বাংলাদেশ। তবে মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস, মেহেদী হাসান মিরাজরা হতাশ করলে পরের ৬০ রানের মধ্যে বাংলাদেশ হারায় ৪ উইকেট। ৭ উইকেটে ১৮৪ রানে তখন দলের সামনে বড় লিডের নিচে চাপা পড়ার শঙ্কা।
ততক্ষণে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি করে উইকেটে থিতু হৃদয়। সেটিই তিনি কাজে লাগান তাইজুলের সঙ্গে জুটিতে। নিজের কাছে বেশিরভাগ সময় স্ট্রাইক রেখে সমান তালে রান করতে থাকেন মিডল–অর্ডার এই ব্যাটসম্যান। ১৬৭ বলের জুটিতে তাইজুল মোকাবিলা করেন ৫৬ বল। তাইজুলকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রান যোগ করার পথে কখনোই খোলসে ঢুকে যাননি হৃদয়। বরং সুযোগ পেলেই আদায় করেন বাউন্ডারি। আর ওভারের পঞ্চম বা শেষ ডেলিভারিতে এক রান নিয়ে নিজের কাছে রাখেন স্ট্রাইক।
দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েই দলকে তিনশ পার করান হৃদয় আর নিজে পৌঁছে যান ডাবল সেঞ্চুরির কাছে। পরে তাইজুল ফিরলে তাড়াহুড়ো না করে আরও ধৈর্য ধরে এগিয়ে নেন দলকে। নবম উইকেটে তারা যোগ করেন ১২১ বলে ৮৫ রান। যেখানে তাসকিনের অবদান ২৮ বলে ১২! শেষ পর্যন্ত তাসকিন আউট হওয়ায় আড়াইশ বা আরও বড় ইনিংস খেলা সম্ভব হয়নি হৃদয়ের। লড়াকু ব্যাটিংয়ে ৩৫৯ বলের ইনিংসে ২২ চারের সঙ্গে ১১ ছক্কা মেরে অপরাজিত থেকে যান তিনি। তার বীরোচিত ইনিংসে দলও পৌঁছে যায় নিরাপদ অবস্থানে।
এক ইনিংসে হৃদয়ের যত রেকর্ড : ৩৫৯ বলের ইনিংসে ২২ চারের সঙ্গে তার ছক্কা ১১টি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংসটি এখন হৃদয়ের এই ২৪২। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন মুশফিকুর রহিম। প্রায় ৮ বছর পর তাকে টপকে গেলেন হৃদয়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটি আগে থেকেই হৃদয়ের। গত অগাস্ট–সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে খেলেছিলেন ৩৫০ রানের অপরাজিত ইনিংস।
বাংলাদেশের হয়ে দ্বিশতকের স্বাদ পাওয়া মাত্র চতুর্থ ক্রিকেটার ২৬ ছুঁইছুঁই এই ব্যাটার। তার আগে দুইশছোঁয়া ইনিংস খেলেন মুশফিকুর রহিম (৩), তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। তবে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হৃদয়। সব মিলিয়ে টেস্ট ইতিহাসে প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া ৪৫তম ব্যাটসম্যান তিনি। এর মধ্যে প্রথম সেঞ্চুরিতে তার চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন শুধু ১১ জন।
বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন হৃদয়। সব মিলিয়ে তার ব্যাট থেকে এসেছে ১১টি ছক্কা। বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে এটিই সবচেয়ে বেশি ছয়ের রেকর্ড। বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের মধ্যে একাই ৬২.৬৯ শতাংশ রান করেছেন হৃদয়। টেস্ট ইতিহাসে ডাবল সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দলের ইনিংসে সর্বোচ্চ অবদানের রেকর্ড এটি। এছাড়া সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইনিংসে দলের স্কোরে হৃদয়ের চেয়ে বেশি অবদান রাখার নজির আছে স্রেফ সাতটি।
৩৫৯ বলের ম্যারাথন ইনিংসটি ২২ চারের পাশাপাশি ১১ ছক্কায় সাজিয়েছেন হৃদয়। সব মিলিয়ে বাউন্ডারি থেকে এসেছে ১৫৪ রান। বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটি। ২০১৮ সালে টেস্ট অভিষেকের পর সিলেটের মাঠটিতে ছিল না কোনো ডাবল সেঞ্চুরি। সেই অপেক্ষাও শেষ করলেন হৃদয়। ১৮৪ সপ্তম উইকেট হারানোর পর তাইজুল ইসলামকে নিয়ে ১১৭ রানের জুটি গড়েন হৃদয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অষ্টম উইকেটে এটিই প্রথম শতরানের জুটি।
অষ্টম উইকেটে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি গড়েছেন হৃদয় ও তাইজুল। এখনও শীর্ষে রয়ে গেছে ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজের ১৪৪ রানের অবিচ্চিন্ন জুটি। এর বাইরে অষ্টম উইকেটে বাংলাদেশের শতরানের জুটি আছে আর একটি। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৩ রান যোগ করেন মুশফিক ও নাঈম ইসলাম। তাইজুল ইসলামের বিদায়ের পর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। সিলেটে নবম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড।












